অন্য পত্রিকা থেকে

শি জিন পিংকে ট্রাম্পের চাটুকারিতা: বৈশ্বিক রাজনীতি কি শক্তিধরদের খেলায় পরিণত হচ্ছে?

উইল হ্যাট: এটি ছিলো একটি বিস্ময়কর মূহুর্ত। যখন ডনাল্ড ট্রাম্প চীনের বেইজিং শহরের গ্রেট হলে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির শাসকদের উপস্থিতিতে তিনি বলে বসলেন কিছু অভাবনীয় কথা! এর ফলে, পিনপতন নিরবতায় আচ্ছন্ন ওই সমাবেশে হতবিহবল হয়ে পড়া মানুষের অবাক শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিলো যেনো! চীনের সাড়ম্বর আর জাঁকজমকপূর্ণ আতিথিয়তায় মুগ্ধ ট্রাম্প তার গুরুত্ববহ বক্তৃতার এক পর্যায়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাণিজ্যিক আগ্রাসনের জন্য তিনি চীনকে দায়ী করেন না!

জি ঠিক শুনছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নিজের মুখে বলা কথা! অথচ, নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক নাম্বার শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি তখন বার বার দাবি করেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ‘ধর্ষণ’ করে আসছে। তিনি চীনকে অর্থনৈতিক কারসাজির মূল ষড়যন্ত্রকারী ঘোষণা দিয়ে বলেন, ক্ষমতায় এলে প্রথম দিন থেকেই চীনকে থামাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নেয়া হবে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক কাঠামো রক্ষা করতে- চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বড় হারের শুল্ক আরোপ করার প্রাথমিক পরিকল্পপনার কথাও বলেন তিনি।

এরপর নির্বাচিত হবার এক বছর হয়েছে ট্রাম্পের। এ সময়ে বাস্তবে চীন ইস্যুতে কিছু পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়া আর কি কিছু করেছেন তিনি? উত্তরটি হচ্ছে, তেমন কিছুই নয়।

এখন এসে, এই মূহুর্তে বিশ্বের শক্তিধর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি- চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর গুণকীর্তন করছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট শি তার একরোখা স্বভাব এবং স্বৈরাচারী আচরণের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নিজের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে তিনি নিয়মনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র কোন কিছুর-ই তোয়াক্কা করেন না। সেই শি জিন পিংয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার আচ্ছাদনে ¯পষ্ট চাটুকারিতা করে ট্রাম্প বস্তুত অবাক করেছেন সবাইকে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে শি জিন পিং’কে তার উষ্ণতা, বিচক্ষণতা এবং করে দেখানোর ক্ষমতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি এ বক্তব্যের পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোন প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ না করার নিমিত্তে চীনের দেয়া প্রস্তাবেও রাজি হন। স্বাভাবিকভাবেই, প্রশ্নোত্তর পর্বে ট্রাম্পকে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। প্রশ্ন করা হতো চীন বিষয়ে ট্রাম্পের দেয়া পূর্বের আগ্রাসী মন্তব্যের অবস্থান থেকে ‘ইউটার্ন’ নিয়ে বর্তমান স্তূতিমূলক অবস্থানে আসার কারণও। তাই চীন প্রশ্নোত্তরের সেই সুযোগটাই রাখতে চায় নি। ট্রাম্পও সানন্দচিত্তে তা এড়িয়ে গিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন তার সম্মানে চীনের আয়োজন করা রাষ্ট্রীয় ভোজে!

চীনের দৃষ্টি এখন বিশ্বমঞ্চের সিংহাসনের দিকে। ২০৫০ সালের ভেতর সম্পূর্ণ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবার পরিকল্পনায় আঁটসাঁট বেঁধেই নেমেছে দেশটি। লক্ষ্য- এই শতাব্দীর ভেতরে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিতে পরিণত হওয়া। এরই মধ্যে এ ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছেন শি জিনপিং। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসে তিনি চীনকে বিশ্বের এক নম্বর দেশ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। নিজেদের সমাজতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বকে শাসন করার স্বপ্ন নিয়ে একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে চীন। শুরু করেছে দ্রুতগতিতে বাস্তবায়নের কাজও। শুধু সিল্করোড প্রকল্পের মাধ্যমেই ৬০টি দেশের সঙ্গে মহাসড়ক গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে চীন। এটি বাস্তবায়ন হলে বিশ্বে চীনের প্রভাব হবে অভাবনীয়।

কৌশলী চীনারা জানে যে, অল্পখানি স্তূতি দিয়ে অনেকদূর এগোনো যায়। তাই চাটুকারিতায় তুষ্ট স্বভাবের ট্রাম্পকে তারা চটুল আয়োজনে বিমোহিত করার সব প্রস্তুতিই নিয়েছে। আর এতে গলে গিয়ে ট্রাম্প বলছেন, চাইনিজ পণ্যের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত বাণিজ্যিক আগ্রাসনে চীনের কোনো দায় নেই! এ দায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজের। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সে দেশের বাণিজ্যনীতিকে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারে নি। যেমনটি পেরেছে চীন। একপেশে বাণিজ্যিক সুবিধার যে পন্থা অবলম্বন করে লাভবান হয়েছে চীন, ভবিষ্যতে একই ধরণের পন্থা নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র- এমনটিও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। ক্ষমতাধর দেশগুলোর একপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা আদায় করে নেবার এই প্রয়াস বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি নতুন পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়ে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ডনাল্ড ট্রাম্পের চীনের গ্রেট হলে দাঁড়িয়ে দেয়া বক্তব্যে বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি রয়েছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যা নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close