আফ্রিকা জুড়ে

মুগাবের প্রস্থান: কি ঘটেছিল পর্দার আড়ালে

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: সাঁইত্রিশ বছরের স্বৈরশাসক রবার্ট মুগাবেকে বন্দুকের নল কাবু করতে পারে নি। চারদিকে বন্দুক তাক করা, রাস্তায় নিজ দলের নেতাকর্মীদের উত্তাল বিক্ষোভ মিছিল, পার্লামেন্টে অভিশংসন সামনে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি দেশবাসীর কাছে দেয়া বক্তব্যে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

তাহলে কি ঘটেছিল পর্দার অন্তর্রালে! কি সেই ঘটনা যার কারণে তিনি পদত্যাগ করতে রাজি হলেন! এসব বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করেছে অনলাইন দ্য জিম্বাবুয়ে মেইল। এতে উঠে এসেছে সেদেশের একজন বর্ষীয়ান ও প্রবীণ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় খ্রিস্টান পুরোহিতের কথা। তার বয়স ৭০ বছর।

জেনারেলদের চাপে মুগাবে পদত্যাগ না করলেও এই পুরোহিতের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত মসনদ হারান রবার্ট মুগাবে। এ বিষয়ে দ্য জিম্বাবুয়ে মেইল লিখেছে, ফিদেলিস মুকনরি জিম্বাবুয়ের একজন বরেণ্য খ্রিষ্টান পুরোহিত। বর্তমানে ৭০ বছর বয়সী এই পুরোহিত জিম্বাবুয়ের গৃহযুদ্ধকালীন নানা বিষয়ে প্রামাণ্য তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করেন। সেখানে রবার্ট মুগাবের ভূমিকার কথাও উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। এরপর থেকে রবার্ট মুগাবের সঙ্গে মুকনরির সুস¤পর্কের সুচনা।

এই মুকনরিই চার দশক পরে এসে মুগাবেকে পদত্যাগ করতে রাজি করানোর মতো ¯পর্শকাতর বিষয়ে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মুগাবের প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দেবার পরে যখন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মনাঙ্গগয়া ক্ষমতা গ্রহণ করলেন, তার কয়েক ঘণ্টা পরে মুকনরি দ্য জিম্বাবুয়ে মেইলকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ওই সাক্ষাৎকারে খুলে বলেন, কিভাবে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুগাবে, সেনাবাহিনী এবং বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত মুগাবেকে পদত্যাগে রাজি করান। তিনি বলেন, এ সময়ে আমি প্রতিদিন মুগাবের সঙ্গে দেখা করেছি। তাকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তিনি চার দশক ধরে জিম্বাবুয়ের শাসক। তাকে বুঝতে এবং বোঝাতে পারার কাজে ধৈর্য এবং সাবধানতার দরকার ছিলো।

যেহেতু আমি এর পূর্বেও রাজনৈতিক সমঝোতার কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেছি, এ জন্য আমার ওপর আস্থা ছিলো সেনাবাহিনীরও। মুগাবের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে মুকনরি বলেন, আমি কখনোই তার (মুগাবে) সঙ্গে তর্কে যাই নি। আমি তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে তার অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেছি। এরপর বর্তমান পরিস্থিতি তার কাছে তুলে ধরে এতে তার করণীয় স¤পর্কে আলোকপাত করেছি। তিনি একজন অত্যন্ত যুক্তিবাদী এবং বিচক্ষণ নেতা। তিনি তত্ত্ববিদ্যার নিরিখে সব কিছু বিবেচনা করেন। আমি শুধু তাকে বুঝিয়েছি যে, কিভাবে তিনি সম্মানের সঙ্গে প্রস্থান করতে পারেন।

মুগাবেকে রাজি করানোর কৌশল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্টকে (মুগাবে) আমি বার বার জিম্বাবুয়ের বিদ্যমান সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা স¤পর্কে বলেছি। পরিস্থিতির আলোকে সার্বিক মঙ্গলের জন্যে তার কি করণীয় সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। মুকনরি আরো বলেন, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে মুগাবে কিছুটা অবাক হয়েছেন।

জিম্বাবুয়েতে কিছু চলমান সঙ্কট আছে, এ ব্যাপারে মুগাবে নিজেও একমত ছিলেন। তবে সেনাবাহিনী হঠাৎ করে যে ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে, তাতে মুগাবে কিছুটা অবাক হন। মুগাবের মতে, চলমান সঙ্কটের সমাধান দরকার ছিলো। তবে সেনাবাহিনী যেভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করে সমাধান খুঁজে বের করতে চেয়েছে, তাতে তার আপত্তি ছিলো।

অন্যদিকে, যেহেতু সেনাবাহিনীর ক্ষমতা অধিগ্রহণকে তারা সামরিক অভ্যুথান না বলে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে, জিম্বাবুয়ের জনগণও এই অভিযানকে স্বত্বঃস্ফুর্তভাবে সমর্থন করেছে; মুগাবের সামনে খুব বেশি বিকল্প পথও খোলা ছিলো না। সেনাবাহিনী সংবিধান মেনেই মুগাবেকে পদত্যাগ করানোর কথা বিবেচনা করছিলো। নিজ দল জানু-পিএফ থেকে বহিষ্কৃত হবার পরে, ক্ষমতা না ছাড়লে অভিশংসনের মুখে পড়ে পদচ্যুত হতে হতো মুগাবেকে।

যদিও হঠাৎ ঘনিয়ে আসা এমন দুর্যোগে মুগাবে চাপে পড়েন, বাস্তবতা হলো তিনি জিম্বাবুয়েতে এখনো একজন অত্যন্ত সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই, সেনাবাহিনীর জেনারেলরা বারা বার মুকনরিকে চাপ দিচ্ছিলেন একটি ত্বরিত শান্তিপূর্ণ সমাধানের। এ প্রসঙ্গে মুকনরি বলেন, যদিও সেনাবাহিনী মুগাবেকে কার্যত গৃহবন্দি করে রেখেছিলো, কিন্তু তারা মুগাবের সঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেছে। এ সময় জেনারেলরা মুগাবের সঙ্গে আলোচনা কিংবা সাক্ষাতের সময়ে তাকে স্যালুটও প্রদান করেছে ।

কারণ তারা জানতেন, মুগাবে সম্মানের সঙ্গেই প্রস্থান করতে চাইবেন। তবে, একটা পর্যায় পর্যন্ত মুগাবে ক্ষমতা ছাড়ার ব্যাপারে একদমই রাজি ছিলেন না। তিনি- যা হয় হোক- এমন একটি জেদে চেপে বসে গত রোববারে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাত্রা চরমে পৌছায়।

শেষপর্যন্ত অবশ্য পদত্যাগে রাজি হন মুগাবে। তাকে এ সিদ্ধান্তে আসতে প্রভাবিত করার স¤পর্কে মুকনরি বলেন, ৯৩ বছর বয়সী একজন প্রাজ্ঞ মানুষকে বুঝানো খুব সহজ না। জিম্বাবুয়ের নাগরিকদের মুগাবের পতনের দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনই মুগাবেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।

যখন লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে তার (মুগাবে) বিরুদ্ধে মিছিল করেন, পদত্যাগ দাবি করেন, তখন তিনি অনুধাবন করতে পারেন যে, তার এখন প্রস্থান করা উচিত। মূলত, জনগণের তার ক্ষমতা ছাড়ার পক্ষে অভূতপূর্ব সমর্থন দেখেই টলে যান মুগাবে। তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেন। সমাপ্ত হয় জিম্বাবুয়েতে তার চার দশকের সুদীর্ঘ শাসনকাল।

অবশ্য, পদত্যাগের পরেও মুগাবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মনাঙ্গগয়াকে দেশ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে উল্লেখ করেন মুকনরি। তিনি বলেন, মুগাবে এখনো ফুরিয়ে যান নি। যান নি হারিয়েও। তিনি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close