অন্য পত্রিকা থেকে

রিকশা হারিয়েই যাবে একদিন…

অনুপম মাহমুদ: পালকি এখন বিদায়ের পথে, হারিয়েই গেছে এক প্রকার। জাদুঘরে শোভা পাবে কিছুকালের মধ্যে নিশ্চিত। পালকি তার আবেদন হারিয়েছে কালের বিবর্তন ও প্রযুক্তির আবির্ভাবে। এটাকে মেনে নিতেই হবে। চার থেকে ছয়জন বেহারা অমানুষিক পরিশ্রম করে সওয়ারিকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। দলিত সম্প্রদায়ের কেউ কেউ এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন এই প্রথা। এখনও গ্রামে দেখা যায় কালে-ভদ্রে পালকির ব্যবহার।

মার্কিনিরা দাবি করেন, অ্যালবার্ট টোলম্যান, যিনি পেশায় ছিলেন একজন কামার, তিনি মিশনারিদের ব্যবহারের জন্য ১৮৪৮ সালে প্রথম রিকশা তৈরি করেন আমেরিকার বোস্টনে। আবার কেউ কেউ বলেন জোনাথন স্কোবি নামে একজন মার্কিন মিশনারি ১৮৬৯ সালে রিকশা তৈরি করেন জাপানে। স্কোবির স্ত্রী ছিলেন চলৎশক্তিহীন, তাই ইয়াকোহামার রাস্তায় স্ত্রীর চলাচলের সুবিধার্থে নাকি স্কোবি রিকশা বানিয়ে ফেলেন!

অন্যরা আবার বলেন, ইজুমি ইয়োসুকি নামে আরেকজন জাপানিজ রিকশার আবিষ্কারক। অর্থাৎ এটা নিয়ে বিস্তর ভিন্ন মত আছে, তবে রিকশা একটা খাঁটি জাপানিজ শব্দ, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মানবশক্তির শকট বা man-power carriage এর জাপানি রূপ হচ্ছে nj jin-riki-sha, আমরা বলি রিকশা…

অটোরিকশা এখন সর্বত্রই দেখা যায়…

অটোরিকশা নামে এক ধরনের বাহন এখন গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলে সয়লাব। এটাও ব্যাটারিচালিত। এই অটোরিকশা হচ্ছে রিকশার আধুনিক সংস্করণ। প্রশাসনের বক্তব্য হচ্ছে, বিদ্যমান আইনানু্যায়ী এই ধরনের যানবাহনের কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় না, তাই এসব যানের রেজিস্ট্রেশন দেয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ এইসব ব্যাটারিচালিত বাহনগুলো সবই অবৈধ। আবার আরেকটা সমস্যা আছে, এই ধরুন ব্যাটারি চার্জের জন্য প্রয়োজন হয় বিদ্যুৎ।

ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি…

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের ঘোড়ার গাড়ি এখনও টিকে আছে পরম্পরায়, যদিও আগের মতো জৌলুশ নেই। শৌখিনতায় ভর করে এখনও ঢাকায় কেউ কেউ টমটম গাড়ি বরযাত্রায় নিয়ে যাচ্ছেন। গুলিস্থান থেকে সদরঘাট যেতে এখনও এই টমটম গাড়ির খোঁজ মেলে। চাইলে শেয়ারে যাওয়া যায়, এককভাবে এর ব্যবহারে খরচটা একটু বেশি কিনা…

রিকশা আর্ট; শিল্পের অনবদ্য মাধ্যম…

রিকশার পেছনে একটা ল্যান্ডস্কেপের মতো টিনের সিট লাগানো থাকে, যেখানে শোভা পেত একসময় বোরাক কিংবা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের ছবি। একেই এখন বলা হয় “রিকশা আর্ট”। এই শিল্প এখন বেশ সুনাম অর্জন করেছে। এক সময় এই চিত্রকর্ম এঁকেই অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কিন্তু এখন ডিজিটাল যুগ, অল্প খরচেই তা মেশিনে ছাপানো সম্ভব, তাই অবহেলা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিলীন হয়ে গেছে একটি চমৎকার শিল্প। এখন কেবল আর্ট গ্যালারিতেই তা শোভা পায়।

ঢাকা শহরে রিকশার নিবন্ধন দেয়া হয় না দুই দশক যাবৎ। কিন্তু রিকশার সংখ্যা কিন্তু কমছে না, বরং বাড়ছে দিন কে দিন। রিকশার পেছনে আগে দেখা যেত সিটি কর্পোরেশনের নাম্বার প্লেট, এখন কেউ কি দেখছেন সেই প্লেট? একবার খেয়াল করে দেখলেই বুঝবেন, কী হচ্ছে আজকাল! সমিতি ও কমিটির নামে দেয়া হচ্ছে নম্বর প্লেট, এখানেও আছে প্রভাবশালীদের কালো হাতের থাবা…

আন্তর্জাতিক ইভেন্টে স্থান পেয়েছে রিকশা…

রিকশা চালিয়ে বড়লোক হয়েছেন কেবল বাংলা ছবির নায়করা, সেই ছবিই ছিল রিকশাচালকদের জন্য অনেক বড় মাপের বিনোদন। শিস বাজিয়ে, করতালি দিয়ে পুরো হল তারা মাতিয়ে রাখতেন এক সময়। বাংলা ছবির প্রাণ ছিলেন এসব খেটে খাওয়া মানুষ। এখন বিনোদন গ্যারেজের টিভিতে, এমন কি মোবাইল ফোনেও। তার পরেও একটু বেশি ভাড়া চাইলে আমরা তাদের গালি দেই, পিটাই কখনও কখনও। একবার প্যাডেল চেপে দেখেছেন, কাজটা সহজ কি না?

রিকশা একদিন নিশ্চিতভাবেই বিদায় নেবে। আমাদের চলচ্চিত্র, নাটক, গল্প, উপন্যাসেই থাকবে কেবল তার উপস্থিতি। বান্ধবীকে নিয়ে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হাওয়া খেতে রিকশার কোনো তুলনা নেই। তার পরেও মধ্যবিত্তের বিলাসিতা আর রোমান্টিকতার অন্যতম বাহন রিকশা বেঁচে থাকবে আমাদের প্রজন্মের স্মৃতিতে…

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close