Featuredফিচার

সাংবাদিক আব্দুল বাসিত: নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধায় স্মরণ

তাইসির মাহমুদ: দিন তারিখ মনে নেই। সম্ভবত ১৯৯৫ সালের কোনো এক সন্ধ্যা। শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেটগামী জয়েন্তিকা এক্সপ্রেসে উঠেছি। পরবর্তী স্টেশন ভানুগাছ নামবো। সঙ্গে ক’জন সহপাঠীও। ট্রেনে উঠে সীট খুঁজছি। হঠাৎ শুনলাম কেউ একজন ডাকছেন ‘ও বেটা, কই যাস’। ঘাঢ় ফিরিয়ে চেয়ে দেখি বিশিষ্ট সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল বাসিত। সম্পর্কে মামা তাই প্রায়ই ‘ও বেটা’ বলেই সম্বোধন করতেন। সীট খুঁজছি বুঝতে পেরে পাশের সীটের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বস।

তিনি ঢাকা থেকে আসছেন। যাবেন সিলেট। আমি পরবর্তী স্টেশনে নেমে যাবো। জানতে চাইলেন কী করছি? পড়াশোনার কী অবস্থা।

এ-কথা, ও-কথা বলতে বলতে আমার ট্রেনযাত্রার সময় ফুরিয়ে এলো। ভানুগাছ পৌঁছলে সীট ছেড়ে উঠার সময় বললেন, “আমি দৈনিক জালালাবাদ-এ নিয়মিত লিখছি। বললাম, পড়বো।

পরীক্ষার জন্য মাসদিন ভানুগাছ ছিলাম। যেদিন পরীক্ষা থাকতো না সহপাঠীরা মিলে দিনের বেলা শ্রীমঙ্গল বেড়াতে যেতাম। ওইদিন ফিরে আসার সময়ই তাঁর সাথে আকস্মিক সাক্ষাৎ। আর এই সাক্ষাতটাই ছিলো আমার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা।

দিন পনেরো পর পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরলাম। স্থানীয় শাহবাজপুর বাজারের অনেক দোকানেই তখন সিলেটের বহুল প্রচারিত দৈনিক জালালাবাদ যেতো । অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি সংখ্যা পেয়ে গেলাম। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে তাঁর কলামটিই খুঁজতে থাকলাম। হঠাৎ দৃষ্টি পড়লো পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় । দুই কলামজুড়ে একটি সচিত্র নিবন্ধ। নাম ‘তিন্তিড়ি পলাণ্ডু লংকা শর্করা’ (তেতুল, পেঁয়াজ, মরিচ, চিনি)। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পড়তে থাকলাম। দীর্ঘ কলাম। কিন্তু শেষ করে ফেললাম খুব দ্রুতই।

কলামটি পড়ে তাৎক্ষনিক যেটা ভালো লাগলো, তা হলো তাঁর লেখার ভঙ্গিমায় আমার প্রিয় সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর কিছুটা ছোঁয়া পেলাম। গেলুম, আসলুম, খেলুম, বললুম ইত্যাদি স্টাইল ও তাঁর নিজস্ব একটি মুন্সিয়ানা । কলামটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো যেনো সৈয়দ মুজবা আলীরই কোনো লেখা পড়ছি। এরপর নিয়মিতই পড়তে থাকি। একদিন কলামের একটি প্রতিক্রিয়া লিখে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিই দৈনিক জালালাবাদ-এর ঠিকানায়। সেটি মতামত বিভাগে ছাপাও হয়। আর এরই সুত্র ধরে তাঁর সাথে গড়ে ওঠে ঘনিষ্টতা। দৈনিক জালালাবাদ এর সাথে গড়ে ওঠে সম্পর্ক, আর লেখালেখিরও সূচনা ঘটে।

এক সন্ধ্যায় দৈনিক জালালাবাদ অফিসে নিয়ে গিয়ে তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক (বর্তমানে দৈনিক সিলেটের ডাক-এর নির্বাহী সম্পাদক) প্রতিথযশা সাংবাদিক আব্দুল হামিদ মানিক এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয়পর্বে শুধু বললেন- ‘ও লেখালেখি করতে চায়, একটু খেয়াল রাখবেন।’ সেই থেকে সাংবাদিক আব্দুল হামিদ মানিক লেখালেখির ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা করেছিলেন তা না পেলে আজ হয়তো বর্তমান পর্যায়ে আসতে পারতাম না। তাই আব্দুল হামিদ মানিক-এর প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকতে চাই। অবশ্য পরবর্তীতে দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক জনাব মুকতাবিস উন নূর, সহকারী সম্পাদক আব্দুল কাদের তাপাদারসহ জালালাবাদ পরিবারের সকলের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সকলের কাছ থেকে লেখালেখিতে উৎসাহ ও সহযোগিতা পাই।

আরো একদিন সন্ধ্যায় নিয়ে যান আম্বরখানাস্থ দৈনিক যুগভেরী অফিসে। তখন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন আজিজ আহমদ সেলিম। তাঁর সাথেও পরিচয় করিয়ে দেন। একে একে পরিচয় ঘটে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার তৎকালীন সিলেট ব্যুারো চীফ বিশিষ্ট সাংবাদিক অজয় পাল, প্রথম আলোর ব্যুারো চীফ আহমেদ নূরসহ সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে। সাংবাদিক আব্দুল বাসিত এর ভাগিনা হিসেবে বড়রা বেশ স্নেহ করতেন। সিলেট শহরে একই রিক্সায় করে রাত-বিরাতে তাঁর সাথে ঘুরে বেড়াতাম। এক পত্রিকা অফিস থেকে অন্য অফিসে যাতায়াত, সর্বোপরি তাঁর উপশহরের এ ব্লকের বাসায় যেতাম নিয়মিতই।

প্রথম সাক্ষাত থেকে আজ প্রায় ২২ বছর পর তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলাম। যেহেতু সাংবাদিকতা পেশায় আছি এবং তাঁর হাত ধরেই এই পেশায় আসা তাই তিনি আমার কাছে প্রাতস্মরনীয় ব্যক্তিদের একজন। সবসময়ই তাঁর অবদানের কথা মনে পড়ে। তবে মৃত্যুবার্ষিকী এলে একটু বেশিই মনে পড়ে। তাঁর রচনাবলী নিয়ে প্রকাশিত ‘সহস্র বিস্মৃতিরাশি’ গ্রন্থটি মাঝে মধ্যে বুক-সেলফ থেকে বের করি । দু’চার পাতা পড়ি। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করি।

২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি পরপারে পাড়ি জমান। সেই হিসেবে এ বছর তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনটি এলে সংবাদপত্রে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর সংবাদ দেয়া, একটু-আধটু লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর ঋণশোধের চেষ্টা করি। কিন্তু এই ঋণতো আর শোধ করার মতো নয়। কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিলে তা শোধ করা যায়, কিন্তু জ্ঞান শোধ করা যায় না। তাই তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করা ছাড়া আসলে আর করার কিছু নেই।
তাঁর ছোট ছেলে অপু কয়েকদিন আগে ফেসবুক ইনবক্সে মৃত্যুবার্ষিকীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলো। বলেছিলাম, মনে করিয়ে দিতে হবেনা। মনে আছে, মনে থাকবে। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিনই।

সাংবাদিক আব্দুল বাসিতের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ছোটদেশ (টাইটিকর) গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা মরহুম আইয়ব আলী, মাতা মরহুমা আমিনা খাতুন।

ছোটকালে লেখাপড়ায় খুবই মেধাবী ছিলেন। কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারেননি। কারণ ১৯৫৭ সালে স্থানীয় পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাইস্কুলে নবম শ্রেনীতে অধ্যয়নকালে টাইফয়েড আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বাকশক্তিও হারিয়ে ফেলেন অনেকাংশে। এরপর থেকেই লেখালেখি শুরু। ১৯৬৬ সালে পুরোদমে জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকতা পেশায়। সিলেটের প্রাচীনতম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক যুগভেরী, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ছিলো তাঁর প্রথমদিকের সাংবাদিকতা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চলে যান ভারতের করিমগঞ্জে। সেখান থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘জয়বাংলা’র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায়ও। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশে ফিরলে সাপ্তাহিক যুগভেরীর সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর একসময় বেরিয়ে পড়েন ইউরোপ আমেরিকার উদ্দেশে। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে কাজ করেন ‘সাপ্তাহিক সুরমা’য়। যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা, সাপ্তাহিক বাঙালি ও সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’র সহকারী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কলাম লেখায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত । কাগজ-কলম, এক কাপ চা আর একটি ব্যানসন সিগারেট নিয়ে বসলে অনায়াসেই হয়ে যেতো একটি সাবলীল কলাম। এককথায় দুহাতেই লিখতেন। স্মরণশক্তি ছিলো প্রখর। বাংলা ভাষার উপর ছিলো পাণ্ডিত্য। একদিন সিলেট শহরের রাজা ম্যানশনে একটি লাইব্রেরীতে ঢুকলেন। বললেন, একটি ডিকশনারী কিনবেন। দু-তিনটে বাংলা ডিকশনারী বের করে তাঁর সামনে ধরতেই বলে ওঠলেন, “বাংলা ডিকশনারী তো আমি নিজেই। ইংলিশ ডিকশনারী কিনতে এসেছি।” বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। সংবাদপত্রে বানানভুল একদমই সহ্য করতে পারতেন না।

তাঁর লেখা কলামগুলোর মধ্যে সাড়াজাগানো কলাম ছিলো সাপ্তাহিক যুগভেরীতে “সিলেটের পাঁচালী”। কলামটি লিখতেন ‘সোজন বাদিয়া’ ছদ্ম নামে। দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকায় লিখতেন ‘রাজনীতির রঙ্গ কথা’ ও ‘টক ফ্রম দ্যা জাঙ্গল’। দৈনিক জালালাবাদ-এ লিখতেন তিন্তিড়ি পলাণ্ডু লংকা শর্করা। এছাড়া বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক গ্রাম সুরমা, দৈনিক সিলেটের ডাক, দৈনিক আজকের সিলেট, সাপ্তাহিক দেশবার্তা, সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন নিয়মিত।

শুধু যে তিনি নিজেই লিখতেন তা নয়। তরুণদের লেখালেখিতে উদ্ধুদ্ধ করতেন। হাতে-কলমে লেখা শিখিয়ে দিতেন। সংবাদপত্র অফিসে নিয়ে গিয়ে সম্পাদকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তাঁর হাত ধরে বিয়ানীবাজার তথা উত্তর সিলেটের একঝাঁক তরুণ সাংবাদিকতায় পেশায় জড়িয়ে পড়েন। এখন সিলেটের আঞ্চলিক পত্রিকাসহ ঢাকার শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে শীর্ষপদে সাংবাদিকতা করেন অনেকেই। তাঁর হাত দিয়েই যাঁদের সাংবাদিকতায় প্রবেশ ঘটে।

তাঁর গ্রাম ও শহরের বাড়িতে তরুণ লেখিয়েদের আনাগোনা থাকতো হরহামেশা। বাড়িতে গেলে এক টুকরো কাগজ নিয়ে এসে টেবিলে বসতেন। একদিকে চা চলতো, অন্যদিকে দেশ-বিদেশের লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের বিভিন্ন বিষয়-আশয় নিয়ে গল্প চলতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সাংবাদিক ও লেখকদের বাজারে আড্ডা দিতে তিনি ভালোবাসতেন।

শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলায় তাঁর সাথে কথা বলতে হতো কাগজে-কলমে। তবে কাগজ কলম না থাকলে টেবিল বা হাতের তালুতে আঙ্গুল দিয়ে আঁকি-বুকি করলেও তিনি সহজেই বুঝে নিতে পারতেন।
তাঁর বোধশক্তি ছিলো প্রখর। সাংবাদিকতা পেশায় ধৈর্য্য ও শ্রবণশক্তি খুবই গুরুত্বপুর্ণ দুটো বিষয়। লিখতে হলে জানতে হয়। জানতে হলে পড়তে হয়, শুনতে হয়। কিন্তু তিনি শ্রবণশক্তিহীন অবস্থায়ও সাংবাদিকতা করেছেন বীরদর্পে। সৎ সাংবাদিক হিসেবেই সমাদৃত ছিলেন সর্বমহলে ।

মৃত্যুকালে রেখে গেছেন প্রিয়তমা স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম। যিনি তাঁর শারিরীক প্রতিবন্ধকতায় ও মৃত্যুপুর্ববর্তী দীর্ঘ অসুস্থ জীবনে নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন ছাঁয়ার মতো।

বড় মেয়ে হাফসা জাহাবী সিমি অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে এখন সিলেটেই বৈবাহিক জীবনযাপন করছেন । পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরেন দ্বিতীয় সন্তান আহমদ আফজাল সাদেকীন আপলু। বিএ অধ্যনয়কালে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যে। এখন বিদেশে একজন সফল ব্যবসায়ী । তৃতীয় সন্তান নুসরাত জাহাবী লাভলী মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রী করেছেন। আর ছোট ছেলে আহমদ সাফায়াত সাদেকীন অপু বিএ পড়ছেন। পাশাপাশি টুকটাক লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত থেকে পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে চলেছেন ।

লেখক: তাইসির মাহমুদ: সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ, লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close