Featuredদুনিয়া জুড়ে

গুটিকয়েকের জঙ্গিপনায় বিপদে লাখো প্রবাসী

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: জঙ্গিপনার নামে ক্ষুদ্র দুটি অবিবেচক কাজ অনেক বড় বিপদে ফেলতে পারে পুরো জাতিকে।

গত ১২ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে আকায়েদ নামে এক বাংলাদেশির বোমা হামলার চেষ্টা, আবার গত ১০ ফেব্রুয়ারি অষ্ট্রেলিয়ায় মোমেনা সোমা নামে এক বাংলাদেশি নারীর ছুরি হামলার ঘটনা বিদেশ বিভূঁইয়ে বাংলাদেশকে আবারও নেতিবাচক পরিচয়ে পরিচিত করিয়েছে।

দুঃখজনক হলে সত্য, যে দুটো দেশে এ ঘটনা ঘটেছে সে দেশগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি ঘটনায় ওই দেশগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসিরা নানা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন। চাকুরি থেকে শুরু করে সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছেন। শিক্ষা ভিসা ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

‘জঙ্গিবাদের সঙ্গে দারিদ্র নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।’ কথাটি শুনেছিলাম বেঞ্জামিন কলিন্স শেফার্ড নামে এক ফ্রেঞ্চ গবেষকের কাছে। গত ডিসেম্বরে প্যারিস থেকে ব্রাসেলস যাওয়ার পথে ইউরো বাসে পাশের যাত্রী ছিলেন কলিন্স; একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টটাইম লেকচারার। গবেষণা করছেন সমসাময়িক অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যের সংঘাত ও সম্পর্ক নিয়ে।

কথা প্রসঙ্গেই তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কোন দেশের নাগরিক আমি। বিদেশে খুব অল্পই গেছি। এমনিতেই ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুল আবার সেখান থেকে প্যারিস। প্যারিসে নেমে কিছু কাজ সেরে আবার বেলজিয়ামের এন্টারপেন শহরে যাবো। প্রায় সাতাশ ঘণ্টার টানা যাত্রা। ভিষণ ক্লান্ত। ঠিকমত চোখও খোলা রাখতে পারছিলাম না।

বিদেশে যেটুকু অল্প অভিজ্ঞতা হয়েছে তা থেকে দেখেছি যখনই বলি, বাংলাদেশ থেকে এসেছি তখন পরের প্রশ্ন থাকে কোথায় সেটা? আমাকে বলতে হয় ইন্ডিয়ার পাশে। ইন্ডিয়ার কোন পাশে ? তারপর অনেক বুঝিয়ে বা ম্যাপে দেখিয়ে দিতে হয়। কিন্তু বেঞ্জামিনের ব্যাপারটা সেরকম কিছু হলো না।

তিনি এক নামেই বাংলাদেশকে চিনলেন। হলিআর্টিজেনের ঘটনাও তিনি জানেন। এমনকি ঘটনাটি সম্পর্কে নিখুঁত বিশ্লেষণও তার কাছে পাওয়া গেলো। বললেন, এ ঘটনায় ঘাবরে যেও না। এরকম আরও ঘটবে। প্রস্তুত হও।

এটা তো কেবল শুরু। ব্যখ্যাও দিলেন, তিনি। বললেন, মুসলিম দেশগুলোতে এই সমস্যা আগামী একশো বছর পৃথিবীকে অস্থির করে রাখবে। বললাম, এগুলো তোমাদের পশ্চিম থেকেই বপন করা বিষবৃক্ষ। এর ফল একদিন তোমাদেরও তো ভোগ করতে হবে। শুরুও তো হয়েছে। ফ্রান্সে কয়েকটি জঙ্গি হামলার উদাহরণ দিয়ে তাকে বোঝালাম। বেঞ্জামিন বললেন, কারা এর পেছনে সেগুলো বের হতে আরও হয়তো অর্ধশতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু আমরা আসলেই বিশেষ করে নগরকেন্দ্রিক মানুষরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি দিন দিন। পুঁজিবাদি মানসিকতাই একদিন পৃথিবীকে বিরাণভূমি বানিয়ে ফেলবে। ধনী দেশগুলো হয়তো এই সংকট থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু তোমাদের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলো এই জঙ্গিবাদ নিয়ে মহাবিপদে পড়বে। কারণ, জঙ্গিবাদের সঙ্গে দরিদ্রতার সম্পর্ক নিবিড়।

এমন পূর্বাভাস অবশ্য আগেই দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্যামুয়েল হানটিংটন। ক্লাস অব সিভিলাইজেশনে তার বক্তব্য, আগামী কয়েক দশক পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি শক্তি সম্ভাব্য একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। যার শুরুটা ইতোমধ্যে হয়েই গেছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলিআর্টিজানের নারকীয় হত্যাযজ্ঞর কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠি। ঘটনার সময়টিতে আমি ছিলাম কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে। খুব কাছ থেকেই ঘটনাটি দেখেছিলাম। সারা পৃথিবীর দৃষ্টি ছিলো সেদিন বাংলাদেশের দিকে। টনক নড়ে দেশের ভেতরেও।

সে রাতে পুরো জাতি কাটিয়েছিল উৎকণ্ঠায়। যা পরের দিন সকালে পরিণত হয়েছিল ঘৃণায়। যখন একে একে বের করে আনা হয়েছিল মৃতদেহগুলো। ইতালীয়, ভারতীয়, জাপানী ও বাংলাদেশ মিলিয়ে উনিশজন মানুষ সে রাতে নিহত হয়েছিল। তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল আমাদের দেশেরই কিছু কিশোর ও তরুণ বয়সী ছেলে। প্রথমে গুলি করে অর্ধমৃত করে তারপর বুকে ও গলায় ছুরি চালিয়েছিলো তারা।

এরা সবাই ছিল ইসলামী মৌলবাদের নতুন ধারায় দীক্ষিত। বেশীরভাগই সমাজের সুবিধাভোগী সমাজের অভিজাত পরিবারের সন্তান। খেয়েছে নামিদামী হোটেলে, পড়েছে দেশের অভিাজাত স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। হলিআর্টিজেনে নিহত জঙ্গিদের পরিবারগুলোতে খোঁজখবর করে জানা গেছে, তারা ভালবাসার মধ্যেই বড় হয়েছে।

তাদের শখ আহলাদ সাধ্যাতীতভাবে পুরণ করেছে পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই তারা বদলে যেতে শুরু করে। আজ জঙ্গি নিরবাশ বা তামিম চৌধুরী নিহত হয়েছে নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে বপণ করে রাখা সেই বিষবৃক্ষ এখন ফল দিতে শুরু করেছে। শত শত তামিম নিরবাশ তৈরি হয়েছে যারা শাণিত করছে তাদের অস্ত্র। সুযোগ পেলেই বোমা ফোটাচ্ছে, ছুরি চালাচ্ছে। কেউ ধরা পড়ছে কেউ লুকিয়ে আছে।

হলিআর্টিজেনের ঘটনার পরই এদেশে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপানী উন্নয়ন সংস্থা ‘জাইকা’ তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বিদেশী বিভিন্ন দেশের নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে যায়। অন্য বিদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বেশ কিছুদিন তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

দেশের মধ্যেও জঙ্গি কার্যক্রমের কারণে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমরাও নানা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্ররা চাকুরি করতে এসে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দাড়ি টুপি পড়া সাধারণ মুসলিমের দিকে সমাজ তাকাচ্ছে সন্দেহের দৃষ্টিতে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোও ভাল নেই। পুলিশি ঝমেলা, গ্রেপ্তার ছাড়্রাও সামাজিক নিগ্রহেরও শিকার হচ্ছেন তারা।

শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে জঙ্গিদের কারণে নতুনভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরাও এর দায়ভার বহন করছেন। যন্ত্রণা ভোগ করছেন বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরাও। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে তারা নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসিদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বাংলাদেশী অভিবাসিরা। যার বড় প্রমাণ দিয়েছে জঙ্গি আকায়েদ।

গত ১২ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে একটি বাস স্টেশনে বোমা হামলা করার আগ মূহুর্তে বোমাটির বিস্ফোরণে সে আহত হয়। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আবার ফিরে আসে বাংলাদেশের ওপর। চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়ে আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসিরা। দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী খুঁজতে গিয়ে চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে তাদের।

আকায়েদ উল্লাহর ওই হামলার পরদিন নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন বসবাসরত আবু হানিফ নামে একজন প্রযুক্তিবিদ বলছিলেন, স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশি কম্যুনিটির মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। যেসব জায়গায় বাংলাদেশীদের বেশি আনাগোনা, বিস্ফোরণের পর তা একেবারেই কমে গেছে।

এমনকি, যাদের বৈধ কাগজপত্র আছে এবং নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তারা ভয় পাচ্ছে। যারা অবৈধ আনডকুমেন্টেড কিন্তু কাগজপত্রের জন্য অ্যাপ্লাই করেছে, তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। আশংকা করছেন, বৈধ হওয়ার কাগজপত্র তৈরির পথে এ ঘটনার প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি হচ্ছেও তাই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই অভিবাসন বিরোধী। আকায়েদের ঘটনায় বাংলাদেশীদের পারিবারিক ভিসায় আমেরিকায় অভিবাসী হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ঘুমন্ত এক ব্যক্তির বুকে ছুরি চালায় বাংলাদেশি তরুণী মোমেনা সোমা। জানা যায়, সে ধর্মের অপব্যখায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে ওই কাজটি করেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোমা। পরবর্তীতে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে অষ্টেলিয়া যায় সে।

বাংলাদেশে তার ছোট বোনও জঙ্গি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। পুলিশ সোমার পরিবারের খোঁজে মিরপুরের বাসায় গেলে সেখানে তাদের ওপর ছুরি নিয়ে হামলা করে সোমার ছোট বোন আসমাউল হুসনা। পরে সে স্বীকারও করেছে, বড় বোনের কাছ থেকে ইসলামী উগ্রপন্থায় আকৃষ্ট হওয়ার কথা।

সোমার ঘটনায় মেলবোর্নে বাংলাদেশি কমিউনিটি নানা সংকটের মধ্যে পড়েছে। তারা ধারণা করছেন, এ কারণে অভিবাসন প্রক্রিয়া বা অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষাবৃত্তি সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।

শান্তির ধর্ম হিসেবে ইসলাম বিশ্বের সর্বত্র স্বীকৃত। সেই ইসলামের গায়ে কলঙ্ক দিতেই দেশ বিদেশে ইসলামের নামে এক চরমপন্থী গ্রুপ তৈরি হয়েছে। হাজার বছর ধরে এদেশে চলমান অধ্যাত্মবাদ (সূফিবাদের) হাত ধরে ইসলাম ধর্ম এসেছিল এদেশে। ব্যপ্তিও পেয়েছে বেশ।

সেই সুফিবাদের ধারনা পাল্টে দিয়ে সেখানে ওহাবি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করতেই এই চরমপন্থা বেছে নেওয়া হচ্ছে। আর এর পেছনে গুটিকয়েক মানুষ। এদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। নইলে দেশে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বারবার সংকটের মুখে পড়বে। ধীরগতি পাবে সরকারের এমডিজি অর্জন লক্ষ্যমাত্রা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close