Featuredএশিয়া জুড়ে

কিম এর সবুজ ট্রেন রহস্য: কূটনৈতিক মিশন চীন

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: কিম জং উন উত্তর কোরিয়া থেকে একটি রহস্যময়ী সবুজ ট্রেন চীনে পৌঁছেছেন। এ নিয়ে পুরো বিশ্বে শুরু হয়েছে হইচই। ট্রেনকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ের রাস্তায় নিরাপত্তার ঘেরাটোপ দেখে জল্পনার পারদ ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। শত্রু-মিত্র সবাই নিশ্চিত, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনই রয়েছেন ওই ট্রেনে।

যে কিম জং উনকে কেন্দ্র করে কোরিয় উপদ্বীপ অঞ্চলে যুুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা মোতায়েন করেছিল যুদ্ধজাহাজ, চারদিকে ছিল রণপ্রস্তুতি, সেই কিম জং উনকেই এখন রাজসিক আপ্যায়ন করা হচ্ছে।

দুই দেশের কর্তৃপক্ষের রাখ-ঢাক  মনোভাবে শেষ পর্যন্ত সেই গুঞ্জনই সত্যি হল। সোমবার (২৬মার্চ ) ঢাকঢোল পিটিয়ে চীন নিজেই জানান দিল- উন এসেছেন। আগমনের মতো প্রস্থানেও নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল দেখার মতো। ট্রেনে ছিলেন কিম ও তার স্ত্রী রি সোল জু। বোন কিম ইয়ো জংও থাকতে পারেন।

তিনি কূটনৈতিক দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন। এরই মধ্যে অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার সঙ্গে তলে তলে তার সম্পর্ক গভীর করেছেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, সোমবার রাতে বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে পৌঁছায় সবুজ রঙের ট্রেনটি। রহস্যময় ওই ট্রেনে কে ছিলেন- এটা সামনে আসার পর এবার আবার নতুন শোরগোল উঠেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এখন একটাই আলোচনা- কী ছিল কিমের ট্রেনে? কিমকে বহনকারী পুরো ট্রেনে ছিল মোট ২১টি বগি। প্রতিটি বগির রং গাঢ় সবুজ। ট্রেনের প্রত্যেকটি কামরাই বুলেটপ্রুফ।

সাধারণ বগির তুলনায় এগুলোর ওজনও কয়েক গুণ বেশি। ওজন বেশি থাকায় ট্রেনের গতি অপেক্ষাকৃত কম। ধারণা করা হচ্ছে, কিমের সবুজ ট্রেনের গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৩৭ মাইল। আয়েশি সব আয়োজনে ঠাসা ছিল কিমের ট্রেন। দীর্ঘ ভ্রমণে মনোরঞ্জনের জন্য ছিল একদল নারী। খাবারের ক্ষেত্রে বাবা-দাদার চেয়ে কিমের পছন্দ আলাদা। সুইস চিজ, কাঁকড়া ও ক্রিস্টাল শ্যাম্পেন (মদ) ও হেনিসি কগন্যাক (মদ) বেশি পছন্দ করেন তিনি। পুরো ট্রেনে ছিল এসবের ভরপুর আয়োজন।

অন্যদিকে সর্বশেষ চীন সফরে এলেন। সেখানে তাকে রাজকীয় অভিষেক জানানো হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং তাকে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে দেয়া প্রটোকল অনুসরণ করেছেন।

সহাস্যে তাদেরকে দেখা গেছে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কিম জং উনের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনে বৈঠকে বসার কথা বলছে। বলা হচ্ছে, এমন আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন কিম জং উন।

ফলে কোরিয় উপদ্বীপ অঞ্চলের উত্তেজনা দৃশ্যত ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তবে কিম জং উন চীনে যে ট্রেনে করে সফরে গিয়েছিলেন তার একটি তাৎপর্য আছে। তাকে বহনকারী ট্রেনটি ছিল বুলেটপ্রুফ। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার। এর ভিতরে আছে সব রকমের প্রসাধনী। আছে বিলাসবহুল সব ব্যবস্থা। আছে চাহিবামাত্র এলকোহল। এই ট্রেনটি ২০০০ সালের মে মাসে চীন সফরে ব্যবহার করেছিলেন কিম জং উনের পিতা কিম জং ইল। তিনি চীনের ওই সময়ের নেতা জিয়াং জেমিনের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন বেইজিংয়ে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ২০০৯ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৯০টি সাজোয়া যান। এ ছাড়া ছিল আলাদা দুটি ট্রেন। একটি ছিল কিম জং ইলকে বহনকারী ট্রেনের সামনে। অন্যটি পিছনে। তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এ ব্যবস্থা। এ কারণে জিম জং ইলকে বহনকারী ট্রেনটির গতি ছিল ধীর, ঘন্টায় প্রায় ৩৭ মাইল।

ওই ট্রেনে ২০০১ সালে কিম জয় ইলের সঙ্গে মস্কো সফরে গিয়েছিলেন রাশিয়ার একজন কর্মকর্তা কন্টান্তিন পুলিকোভস্কি। তিনি দিয়েছেন এমনি অনেক তথ্য। সেই একই সবুজ-হলুদ রঙের ট্রেনে করে তার ছেলে কিম জং উন চীন গেলেন। এটি তিনি দেশের ভিতরে ব্যবহার করে থাকেন।

কিমই যে এবার প্রথম লুকিয়ে ট্রেন-ভ্রমণ করলেন, চীনে গেলেন তা নয়। কিমের মতোই ট্রেনে বিদেশ সফরে যেতেন তার বাবা ও দাদা। ২০০৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তাদের ট্রেনে অন্তত ৯০টি বগি থাকত। এ বগিগুলোতে আছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। মূলত তিনটি ট্রেনের বহর নিয়ে বিদেশে যান উত্তর কোরিয়ার নেতা। বহরের প্রথমে থাকে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি উন্নতমানের ট্রেন।

এরপরই থাকে উত্তর কোরীয় নেতাকে বহনকারী ট্রেন। আর সবার শেষে থাকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী, দেহরক্ষী ও প্রয়োজনীয় রসদ বহনকারী আরেকটি ট্রেন। তিন ট্রেনের প্রথমটিতে থাকেন প্রায় ১০০ নিরাপত্তাকর্মী। তারা মূলত বিভিন্ন রেলস্টেশন ও রেললাইনে তল্লাশি ও অনুসন্ধান চালান। প্রয়াত নেতা কিম জং ইলের সময় থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে। এই নিরাপত্তাকর্মীরা বোমা ও অন্যান্য হুমকির মোকাবিলা করেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কিমের ট্রেনের ভেতরের ফুটেজ খুব কমই ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত নানা স্থির ও ভিডিও চিত্রে এই ট্রেনের ভেতরের বিভিন্ন দৃশ্য প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক ভিডিওতে একটি সম্মেলন কক্ষ দেখানো হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, এই ট্রেনে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।

সম্মেলন কক্ষ, ডিনার কক্ষ, ব্যাংকুয়েট হল ছাড়াও আছে অফিস ঘর। ট্রেনে বসেই রাষ্ট্রীয় সব কাজ করতে পারেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করা হয়েছে মোট ২০টি বিশেষ রেলস্টেশন। ট্রেনবহরকে নজরে রেখে আকাশে উড়তে থাকে সামরিক হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজ।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কিমের বাবা কিম জং ইল ও দাদা কিম ইল সাং বিমানে চড়তে ভয় পেতেন। এ কারণেই তারা ট্রেনে ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বাপ-দাদার মতো কিমও কি তাহলে বিমান ভ্রমণে ভয় পান- এ প্রশ্ন এখন উঠছে। যদিও দেশের অভ্যন্তরীণ সফরে বিমানে চড়েন কিম।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close