Featuredযুক্তরাষ্ট্র জুড়ে

আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ মুসলিম

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ জন মুসলিমকে নির্বাচিত করেছে সিএনএন। প্রভাবশালী এই সংবাদ মাধ্যমটি আমেরিকার মুসলিমদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে এই ২৫ জনকে বাছাই করেছে।

সিএনএন’র ওয়েবসাইটে এ নিয়ে বলা হয়, আমেরিকার মুসলিমদের মুখপাত্র কে? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, কেউ নয়। কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠী দেশটির ৩৫ লাখ মুসলিমের মুখপাত্র হওয়ার দাবি করতে পারে না। এই বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকায় দ্বিগুণ হবে। তবে আমেরিকার নানা পর্যায়ে আছেন কিছু মুসলিম যারা বেশ প্রভাবশালী।

ক্ষমতা নয়, তারা তাদের ব্যক্তিত্ব ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ২৫ মুসলিমের মধ্যে কমেডিয়ান থেকে কংগ্রেসম্যান, অ্যাক্টিভিস্ট থেকে অলিম্পিকে পদকজয়ী অ্যাথলেট, ফ্যাশনিস্ট থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব – অনেকেই আছেন। এদের বেশিরভাগই মুসলিম অভিবাসী বা কৃষ্ণাঙ্গদের সন্তান। আমেরিকায় তাদের কারও কারও শেকড় কয়েক শতাব্দী পুরোনো। এদের মধ্যে প্রখ্যাত কয়েকজনের সম্পর্কে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

সংস্কৃতি

হাসান মিনহাজ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ধুয়ে দেওয়ার জন্য পরিচিত এই কমেডিয়ান। তার মতে, তার ব্যাঙ্গবিদ্রƒপে ধর্মবিশ্বাসের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় একজন মুসলিম হিসেবে বেড়ে উঠার মাধ্যমে আমেরিকান জীবনাচরণ সম্পর্কে ভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বলেন, ‘আমি আমার পুরো জীবনে অনেক পরিস্থিতিতে পড়েছি, যখন শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে আমাকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে পেপেরনি পিজ্জা খেতে না পারা থেকে শুরু করে ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত সব আছে।’ আমেরিকার জনপ্রিয় স্ট্যান্ড-আপ কমেডি অনুষ্ঠান ডেইলি শোতে বেশ কয়েক বছর ছিলেন তিনি। তবে গত বছর হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্ট মিটিং-এ তার কৌতুক বলে নাম কামিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে সপ্তাহিক একটি টক-শো আয়োজনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি।

ইবতিহাজ মুহাম্মদ
২০১৬ সালের অলিম্পিকে প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে হিজাব পরে অলিম্পিকে অংশ নেন অবতিহাজ। একটি ব্রোঞ্জ পদকও জিতেন তিনি। তিনি বিশ্ব ফেন্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে লড়ার প্রস্তুতি তার। খেলাধুলার বাইরে তিনি প্রায়ই সহিষ্ণুতা ও জনবৈচিত্র্য নিয়ে বক্তৃতা দেন।

জি উইলো উইলসন
নেদারল্যান্ডে মোহাম্মদ (সঃ)-এর কার্টুন আঁকা নিয়ে যখন সারাবিশ্বে সমস্যা, তখন ব্যাপারটা যেন এমন ছিল যে কমিকস আর ইসলাম যেন দুই মেরুর বস্তু। ঠিক তখনই বিশ্ববিখ্যাত কমিকস সিরিজ সুপারম্যানের দুই ইস্যু রচনা করেন জি উইলো উইলসন। তার মার্ভেল কমিকসে প্রথমবারের মতো তিনি সৃষ্টি করেন একজন মুসলিম-আমেরিকান সুপারহিরো চরিত্র। তার রচিত কমিকস প্রায়ই বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত কমিকসের তালিকায় স্থান পায়। তিনি তরুণদের জন্য বই লিখেছেন। এমনকি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হওয়া নিয়ে আÍজীবনীও লিখেছেন।

রাজনীতি

কেইথ এলিসন

২০০৬ সালে প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন কেইথ এলিসন। মিনেসোটার একটি আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি ব্যবহার করেন কুরআন। এই কুরআনের মূল মালিক হলেন আমেরিকার অন্যতম জাতির পিতা থমাস জেফারসন।
নিজের জীবনে ইসলামের প্রভাব নিয়ে সঙ্কোচ নেই তার। বিশেষ করে দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মের প্রভাব রয়েছে। তবে রাজনীতি তার সব ধর্মের মানুষের জন্য। ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান পদে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সমর্থিত কেইথ এলিসন। তবে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে তিনি এখন দলের কো-চেয়ারম্যান। কেইথ এলিসন সম্পর্কে একজন বলেন, যদিও তিনি কোনো ধর্মীয় নেতা নন, কিন্তু কার্যত তিনিই যেন আমেরিকান মুসলিমদের মুখপাত্র।

লিন্ডা সারসোর

আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টের একজন তিনি। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লিন্ডার জন্ম নিউ ইয়র্কে। ৯/১১ হামলার পর আটককৃত মুসলিমদের জন্য আরবি দোভাষি হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর বার্নি স্যান্ডার্সের নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেন তিনি। কাজ করেছেন আলোচিত ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে। ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নারীদের আলোচিত বিক্ষোভ উইমেন্স মার্চের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

আন্দ্রে কারসন

ব্যপ্টিস্ট পরিবারে জন্ম নেওয়া কারসন পড়েছিলেন ক্যাথলিক স্কুলে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এক বছর পর তিনি মসজিদে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে কোনো কারণ ছাড়াই আটক হন। এই অভিজ্ঞতা তাকে পরবর্তীতে পুলিশ কর্মকর্তা হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে তিনি কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেন।
পরে তিনি কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের প্রভাবশালী ইন্টিলিজেন্স কমিটির সদস্য। বর্তমান কংগ্রেসের দুই মুসলিম সদস্যের একজন তিনি।

ফারহানা খেরা

নিউ ইয়র্কের ছোট শহর পেইন্টেড পোস্টে তার জন্ম। পেশাগত জীবনে প্রথমে ছিলেন কর্পোরেট জগতে। পরে মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটের প্রভাবশালী জুডিশিয়ারি কমিটিতে একজন সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তিনি কুখ্যাত প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট সংশোধনে ভূমিকা রাখেন। এ সময় তিনি প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০০৫ সালে মুসলিম অ্যাডভোকেটস নামে একটি আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এই আইনজীবী। এই সংগঠনের লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুসলিম-বিরোধী ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই চালানো। এবং মুসলিমদের নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার বিরুদ্ধে কাজ করা।

ধর্ম

ইমাম জাইদ শাকির

ইমাম জাইদ শাকিরকে ‘জনগণের ইমাম’ বলে আখ্যা দিয়েছে সিএনএন। বিমান বাহিনীতে কাজ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। এরপর তিনি কানেকটিকাটে ইসলামিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে মাদক ও সহিংসতা উপদ্রুত অঞ্চলে ইসলামের বার্তা পৌঁছান তিনি। তিনি পশ্চিমে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ইসলামি প-িতদের একজন।
২০০৯ সালে জায়তুনা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০১৬ সালে তিনি এক বিশ্ববিখ্যাত মুসলিমের জানাজা পড়ান। তিনি ছিলেন বক্সার মোহাম্মদ আলি।

হাসনা মাজনভি

ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় হওয়ার সময় হাসনা একটি সুন্দর মসজিদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। লেখিকা ও কমেডিয়ান এই নারী উপলব্ধি করলেন, মসজিদ আসলে কোনো জায়গা নয়, বরং বিশ্বাসীদের সম্প্রদায় বা একত্রস্থল। ২০১৫ সালে মাজনাভি অন্যদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দ্য উইমেন মস্ক অব আমেরিকা। এটি ছিল দেশটির প্রথম নারীদের মসজিদ।

মিডিয়া

দীন ওবায়েদাল্লাহ

দীন ওবায়েদেল্লাহ একটি জনপ্রিয় রেডিও শোর উপস্থাপক। তিনি তার অনুষ্ঠান সবসময়ই একটি লাইন দিয়ে শুরু করেন: ‘আমার নাম দীন ওয়েবদাল্লাহ। আমি হতে চাই আপনার মুসলিম বন্ধু।’ আইনজীবী থেকে কমেডিয়ান ও সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার বনে যাওয়া ওবায়েদেল্লাহ বলেন, ‘জনমত জরিপে দেখা যায়, কেউ যদি কোনো মুসলিমকে চিনে থাকেন, তাহলে সব মুসলিম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।’ একটি জাতীয় রেডিও শোর উপস্থাপক হিসেবে ওবায়েদাল্লাহ প্রায়ই সিএনএন ও অন্যান্য বড় টেলিভিশনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আসেন। কলাম লিখেন। আয়োজন করে বিশেষ কমেডি অনুষ্ঠানের। তার সর্বশেষ একটি শো আলোচিত হয়েছিল। মুসলিম কমেডিয়ানদের নিয়ে আলোচিত এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল: ট্রাম্প বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের শেষ অনুষ্ঠান।

ডালিয়া মোগাহেদ

ডালিয়া মোগাহেদ প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেছিলেন। তবে তিনি স্কুল পত্রিকায় লিখতেন ভূরাজনীতি নিয়ে। তবে পরবর্তীতে তিনি ডাটা (উপাত্ত) ও ধর্ম নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি গ্যালাপ সেন্টার ফর মুসলিম স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক। তিনি বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, শত কোটি মুসলিম আসলে কী ভাবে? ইন্সটিটিউট ফর সোস্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর গবেষণা পরিচালক মোগাহেদ অন্য কারণেও ভীষণ পরিচিত। ‘হোয়্যাট ইট’স লাইক টু বি অ্যা মুসলিম ইন আমেরিকা’ শীর্ষক তার একটি ‘টেড টক’ দেখা হয়েছে ২৮০ কোটি বার।

রেজা আজলান

রেজা আজলান আশির দশকে ইরান থেকে আমেরিকায় অভিবাসিত হন। তখন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা চলছিল। তার বয়স তখন ৭। ইংরেজিও পারতেন না ভালোভাবে। ক্লাসে সহপাঠীরা তাকে বলতো শত্রু!
ধর্ম নিয়ে বেশ কয়েকটি সর্বাধিক বিক্রিত বই আছে এই ধর্মতাত্বিকের। বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে তিনি মুসলিমদের পক্ষে সরব। সিএনএন-এ তিনি ‘বিলিভার’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলেন। পরে অবশ্য ওই অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যায়। তবে এখনও আজলান লেখক, প্রযোজক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রভাবশালী।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close