Featuredফিচার

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মালিকানা কার হাতে

ব্যারিস্টার শাহ আলী ফারহাদ: বিশ্বের খুব কম সংখ্যক দেশ রয়েছে যাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। সফলভাবে জিওস্টেশনারি যোগাযোগ স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের বুকে।

এই মাহেন্দ্রক্ষণ একদিকে যেমন জাতীয় গৌরবের বিষয় অন্যদিকে দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে তাদের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে মিথ্যাচার করছেন। বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং এই ক্ষেত্রের কর্মরত সবাই সর্বসম্মতভাবে একমত যে, এই কৃত্রিম উপগ্রহটি দেশের জন্য বিশাল প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু বিএনপি এই বিষয়টাকে অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণের মাঝে ভিন্ন বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে এবং একেবারে বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে তারা দাবি করছে এটার কোন সুফল বাংলাদেশ পাবে না। এতকিছু বলার পরেও সর্বশেষ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মালিকানা দুইজন ব্যক্তির কাছে চলে গেছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে কোন কিছু বলার দায়িত্ব যেহেতু মির্জা ফখরুল ইসলামের তাই আমরা ধরেই নিতে পারি এটা বিএনপির অফিসিয়াল বক্তব্য। মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের পর উন্মুক্ত সব প্রমাণাদি ঘেঁটে দেখে নিতে পারি আমরা, আসলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মালিকানা কার হাতে রয়েছে।

প্রথমত, আমরা এ কথা স্পষ্ট করে বলতে পারি যে, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মালিকানা বাংলাদেশের হাতেই রয়েছে এবং এর পরিচালনাও বাংলাদেশই করবে। স্যাটেলাইটটি বানিয়েছে ফ্রান্স, উৎক্ষেপণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং উৎক্ষেপণের জন্য মহাকাশে অরবিট স্লট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কেনা হয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সঙ্গে এই তিন দেশের খুব নিবিড় সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাদের কারোরই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মালিকানা দাবি করার কোন প্রকার সুযোগ নেই। ফ্রান্সের কোম্পানি থেলেস অ্যালেনিয়া বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্যাটেলাইটটি বানিয়েছে এবং এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড স্টেশনটিও তাদের তৈরি করা।  মার্কিন কোম্পানি স্পেসএক্স তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির রকেট দিয়ে এটাকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে। এবং উৎক্ষেপণের সঙ্গে আনুষঙ্গিক কাজও তারা করেছে। এর পাশাপাশি রাশিয়ান কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিক বাংলাদেশকে ভাড়ায় মহাকাশে স্যাটেলাইটের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষপথ বা অরবিটাল স্লট দিয়েছে। এর বাইরে স্যাটেলাইটটির মালিকানা এবং পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ থাকছে বাংলাদেশ সরকারের হাতে। এর জন্য বাংলাদেশের গাজীপুর এবং বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইটের সিগনাল ধরতে গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করেছে বাংলাদেশ নিজেই।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার পৃথক একটি কোম্পানি তৈরি করেছে যার নাম, ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)।’ বিসিএসসিএল প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট। পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধনের এই কোম্পানি ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এই কোম্পানির প্রাথমিক শেয়ারের দাম ১০ টাকা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি পরিচালক ২০০ শেয়ার কিনেছে। ২০১৭ সালের জুলাইতে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিসিএসসিএল প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিসিএসসিএল এর বোর্ড গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্য বিশিষ্ট। এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন টেলিযোগাযোগ সচিব, এবং বিসিএসসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোম্পানিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এই কোম্পানির বাকি পরিচালকরাও হবেন সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বরত পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। যেমন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, স্পারসোর চেয়ারম্যান, বিটিসিএল এর মহাপরিচালক এবং সরকার মনোনীত দুইজন প্রতিনিধি। যদি কেউ আরো বিস্তারিত তথ্য জানতে চান, বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল) এর অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে যেয়ে খোঁজ নিতে পারেন। ওয়েব সাইট লিঙ্ক:  http://www.bcscl.com.bd

কাগজে কলমে শুধু নয়, বাস্তবতার নিরিখেও স্যাটেলাইটটির মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ সরকার। সুতরাং, এই বিষয় নিয়ে মিথ্যাচার করে বিএনপি ও তাদের সমর্থকরা খুব একটা সুবিধা করতে পারবে বলে আমি মনে করি না। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে তা বাস্তবসম্মত না।

লেখক: আইনজীবী, গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী। বর্তমানে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)’তে জ্যৈষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close