Featuredইউরোপ জুড়ে

এরদোয়ানের বিজয়ে কেন বিভক্ত তুরস্ক: একদিকে যোগ্য নেতৃত্ব অন্যদিকে এক ব্যক্তির শাসন

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: এরদোগানের বিরোধীরা এবার প্রায় নিশ্চিত হয়েছিলেন যে এবার অন্যরকম ফলাফল হবে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী ঐক্য তৈরি হয়েছিল। তারা ধরেই নিয়েছিলেন এবার প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবেন।

বামঘেঁষা দল সিএইচপি বিশ্বাস করেছিল যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা এমন একজন প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছে যিনি জিততে পারেন: মুহাররেম ইনজে, সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সাধারণ মানুষের ভাষা বোঝেন তিনি, দাঁড়ালেই অগণিত মানুষ হাজির হয়ে যায়। খবর বিবিসির

নির্বাচনের আগে অধিকাংশ জনমত জরীপ বলেছিল, ইনজে এরদোগানকে দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটের মুখোমুখি করতে পারবেন।

আশার প্রধান কারণ ছিল- তুরস্কের অর্থনীতির যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছিলো, তা হালে থমকে গেছে। মুদ্রাস্ফীতির হার ১২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। তুরস্কের মুদ্রা লিরার মূল্যমান এবছর ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। ফলে, এরদোগানের সমর্থন কমে যাচ্ছে।

তুখোড় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক মেরাল আকসেনার প্রেসিডেন্টের অনেক ভোট কাটবেন, অনেকেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। এরদোগানও যে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় তা স্পষ্ট চোখে পড়ছিল।

আর এ কারণে, ১৫ বছর পর এবার তুরস্কের বিরোধীরা স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু তার সাফল্য নিয়ে যে সন্দেহ এবার দানা বেঁধেছিলো এরদোগান তা শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণ করলেন।

নির্বাচনের পর উল্লাসরত তার এক সমর্থক বিবিসিকে বলেন, ‘তিনি (এরদোগান) আমাদের কাছে সবকিছু – তিনি না থাকলে তুরস্কই থাকবেনা।’

পাশে আরেকজন বললেন, ‘সন্ত্রাসী দলগুলো হেরে গেছে, তুর্কি জাতির বিজয় হয়েছে…প্রকৃত মুসলমানদের বিজয় হয়েছে।’

ফলাফলে অবাক করার মতো দুটো বিষয় ছিল এক, মুহাররেম ইনজে এবং মেরাল আকসেনারের মিলিত ভোটে এরদোগানের চেয়ে বেশি হয়নি।

ইনজে ভোট পেয়েছেন ৩০.৭ শতাংশ। এপ্রিলে তিনি যখন প্রচারণা শুরু করেন, তখন যে ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে এই সংখ্যা যদিও বেশী, কিন্তু যেভাবে তিনি তার নির্বাচনী সভাগুলোতে লাখ লাখ লোক টানছিলেন, সে বিবেচনায় এই সংখ্যা বেশি নয়।

কিন্তু আকসেনারের ব্যাপারে বিরোধী ফ্রন্ট যতটা আশা করছিলো, সেই ভোট তিনি পাননি। অবাক করার মতো অন্য যে ঘটনা ঘটেছে, তা হলো সংসদ নির্বাচনে এরদোগানের কট্টর ডানপন্থী শরিক এমএইচপি’র আশাতীত ভালো ফল।

যেখানে ঐ দলের ৭০ বছরের নেতা চোখে পড়ার মতো কোনো প্রচারণা চালাননি, নির্বাচনের আগে যে দল নিয়ে কথাবার্তা তেমন শোনাই যায়নি, তারা ধারণার চেয়ে বেশি আসন জিতেছে। ফলে এরদোগানের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষত রয়ে গেছে।

কারচুপির জোরালো অভিযোগ ভোট গণনার সময়, বিরোধীরা অভিযোগ করে যে ব্যালট বাক্স খোলার আগেই সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদলু ফল ঘোষণা করে দেয়।

সিএইচপি বলছে, লাখ লাখ ভোট যখন গণনাই করা হয়নি, সেসময় একমাত্র যে সূত্রটি খবর দিচ্ছিল, সেই আনাদলু সংবাদ সংস্থা প্রেসিডেন্টের আঙ্গুলের ইশারায় চলে।

অন্য যে সব মিডিয়া নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কিত খবর দিতো, তাদেরকে সেনা অভ্যুত্থানের পর গত দু বছরে হয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, নয় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

তবে সরকার এবং আনাদলু তাদের বিরুদ্ধে কারচুপি করার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। এরদোগান মন্তব্য করেছেন, ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধীরা ফলাফলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।

বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, এরদোগানের সমর্থকরা কোনোভাবেই তাদের নেতার পরাজয় মেনে নিত না। রক্ষণশীল, ধর্মভীরু তুর্কিদের কাছে এরদোগানই একমাত্র ভরসা। কারণ একসময়কার ‘ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কে’ এরা কথা বলতে পারতেন না।

তাদের কাছে, টুইটার বন্ধ করে দেওয়া বা বা একজন সাংবাদিককে জেলে পোরার মত ঘটনার কোনো গুরুত্বই নেই।

বরঞ্চ, এরদোগানের ১৫ বছরে তৈরি রাস্তা-ঘাট, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল তাদের অনেকের জীবনকে বদলে দিয়েছে। যে কারণে প্রেসিডেন্টের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রশ্নাতীত।

কিন্তু তুরস্কে এরদোগানের সমালোচকদের কথা -তিনি দেশকে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢোকার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন তিনি নস্যাৎ করে দিয়েছেন।

কিন্তু তার সমর্থকদের কথা – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তুরস্ককে ধ্বংস করতে চেয়েছিল এবং এখনো করে চলেছে, সেই শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এরদোগান।

প্রেসিডেন্টের বিরোধীদের একটি সান্ত্বনা যে ক্রমাগত গ্রেপ্তার, হয়রানি স্বত্বেও কুর্দি-সমর্থক, ইউরোপ-সমর্থক বামঘেঁষা দল এইচডিপি ১০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে সংসদে ঢোকার অধিকার অর্জন করেছে। তারা ৬০টিও বেশি আসন জিতেছে। ফলে গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পক্ষে সংসদে কথা বলার সুযোগ তারা অর্জন করলো।

বিরোধীদের আরেকটি সান্ত্বনা – যেখানে দেশের ৯০ শতাংশ মিডিয়া সরকার সমর্থক, বিরোধীদের বক্তব্য খুব কমই প্রচার পেয়েছে, জরুরী অবস্থার সূত্রে সরকারের সমালোচনা করতেন এমন সাংবাদিক- বুদ্ধিজীবীদের হয় জেলে পোরা হয়েছে, না-হয় দেশ ছাড়া তরা হয়েছে, সেই অবস্থাতেও প্রেসিডেন্ট এরদোগান দেশের অর্ধেক মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন।

বিরোধী এমপি সেলিন সায়েক বলেন, ‘আমরা একটি ফ্যাশিস্ট জামানায় রয়েছি, কিন্তু ফ্যাশিস্টরা ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচন জেতে না, তারা জেতে ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে। সুতরাং প্রমাণিত হয়েছে, তুরস্কে এখনও প্রগতিশীল মূল্যবোধ মরে যায়নি। এবং তারা মাথা তুলতে সক্ষম।’

কিন্তু এখন সময় এরদোগানের হাতে। তার হাতে এখন একচ্ছত্র ক্ষমতা, মন্ত্রীসভা এবং আদালতের বিচারকদের নিয়োগ তার হাতে। ফলে কামাল আতাতুর্কের পর এরদোগানই আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

তিনি ক্ষমতায় থাকবেন ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তখন কীভাবে তাকে আবারো চ্যালেঞ্জ করা যায়, সেই কৌশল ঠিক করা ছাড়া তুরস্কের বিরোধীদের সামনে এখন আর তেমন কোনো বিকল্প নেই।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close