Featuredএশিয়া জুড়ে

সেনাপ্রধানের হুমকিতে উত্তেজনা: গদি হারাচ্ছেন সু চি

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লেইং। সেনাপ্রধানের অভ্যুত্থানের হুমকির ওই খবর অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মহাপরিচালক জেনারেল ইউ জ্য হতে।

সম্প্রতি এক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান। সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে ক্ষমতাসীন সু চির কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ারও হুমকি দেন তিনি।

তবে সেনাপ্রধানের অভ্যুত্থানের হুমকির ওই খবর অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মহাপরিচালক জেনারেল ইউ জ্য হতে। তিনি বলেন, মিন অং হ্লেইং এ ধরনের কোনো হুমকি দেননি।

চলতি মাসের শুরুর দিকে সু চির পাশাপাশি দেশটির প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর উপ-প্রধানের সাথে বৈঠক করেন মিন অং হ্লেইং। ওই সময় তিনি সু চিকে ক্ষমতা দখলের হুমকি দেন বলে জানায় ব্যাংকক পোস্ট।

ব্যাংকক পোস্টের নিবন্ধে ল্যারি জ্যাগান বলেছিলেন, মিয়ানমারের সর্বোচ্চ বেসামরিক কর্মকর্তা স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি ও আর্মি কমান্ডার সিনিয়র জেনারেল মিন অং লেইংয়ের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করেছেন জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত।

দুই সপ্তাহ আগে রাখাইন ইস্যুতে সরকারের কার্যক্রম ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এ দুই নেতার মধ্যে রেষারেষি চরম আকার ধারণ করে।

ল্যারি জাগান আরো বলেছিলেন, সংকটময় ওই মুহূর্তে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত সুইস কূটনীতিক ক্রিস্টিন শ্রানার বার্গনার মিয়ানমার সফর করেন। নিয়োগ পাওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম সফর। প্রথম সফরটি শেষ ২১ জুন বৃহস্পতিবার।

এ সময়টাতে তিনি স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি এবং সেনাপ্রধানসহ মিয়ানমার সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি বেশকিছু নিবিড় ও খোলামেলা আলোচনা করেন যা দেশের দুই প্রধানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখে।

রোহিঙ্গা নিধন চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এলিট ডিভিশন হিসেবে পরিচিত ৩৩ ও ৯৯ পদাতিক ডিভিশনের হত্যা আর অত্যাচারের মুখেই পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা।  গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই ‘জাতিগত নিধন অভিযানের’ বিষয়ে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

রয়টার্সের এই প্রতিবেদনে উঠে আসে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিধন অভিযানের অনেক কিছুই। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী, রাখাইনের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী, নিরাপত্তা রক্ষী ও সেনাসদস্যদের সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি তাদের ফেসবুক পোস্টও পর্যবেক্ষণ করে রয়টার্স।

বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাবেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাল্টা ওই বর্বর অভিযান চালায়। পদাতিক এ দুই ডিভিশনের হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ে সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।

ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কানাডার দেওয়া সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞায় দেশটির যে ৭ জেনারেলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে ডিভিশন দুটির প্রধানরাও রয়েছেন।

গত বছরের অাগস্টে আরসার হামলার আগে-পরে পদাতিক ডিভিশন দুটির সদস্যদের দেওয়া বিভিন্ন পোস্ট থেকে অভিযানের নানা অংশ এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাদের মনোভাবের ছবি ফুটে উঠেছে।

গত বছর অগাস্টের শুরুতেই আরও শতাধিক সৈন্যর সঙ্গে গোলযোগপূর্ণ রাখাইনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কেয়ি নিয়ান লিন (২৪)।

১০ অগাস্টে এই বিষয়ে জানিয়ে তার এক পোস্টে একজন মন্তব্য করেন, তোমরা কি বাঙালিদের মাংস খেতে যাচ্ছ? মিয়ানমারের অনেক নাগরিকই রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গালি’ বা আরো অবমাননাকর শব্দ ‘কালার’ বলে ডাকে।  অপর এক মন্তব্যে সে আরো বলে, কালারদের পিষে ফেলো, বন্ধু। যার উত্তরে লেফটেন্যান্ট লিন লিখেন, ‘অবশ্যই’।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে অবিহিত করেছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র একে ‘জাতিগত নিধন অভিযান’ বলে। তবে, এসকল অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।  লিনও বলছেন, ‘বাঙালি সন্ত্রাসীদের’ হামলার শিকার হওয়ার পরই সৈন্যরা পাল্টা অভিযানে নামে।অভিযানে কোনো হত্যাযজ্ঞ বা অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলেও রয়টার্সকে জানান এ লেফটেন্যান্ট।

২০১৭ সালের অগাস্টের শুরুতে রাখাইনে মোতায়েন করা হয় ৩৩ ও ৯৯ পদাতিক বাহিনীর সদস্যদের।  ফেসবুকে দেওয়া সৈন্যদের তখনকার ছবিগুলোতে বাহিনীর সদস্যদের রাখাইনের সিটুই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে ও নৌকাবোঝাই হতে দেখা গেছে। প্রতিটি দলে ৫ থেকে ৭জন পুলিশ সদস্য ও ২০ জন সেনাসদস্য থাকতো। পুলিশ ঘরগুলো ঘিরে রাখতো, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে এসে আগুন ধরিয়ে দিতো।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আবুল বাশার নামে একজন রোহিঙ্গা জানান, মধ্য অগাস্টে ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের এক কমান্ডার পিন গ্রামের অধিবাসীদের হুমকি দিয়ে বলেন- এখানে আসার আগে আমরা কাচিনের যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম। আমরা সেখানে ভয়াবহ খারাপ আচরণ করেছি, তারা ছিল নাগরিক, তোমরা তাও না, এখন ভাবো কি হবে।

তুলাতুলি গ্রামের তিন নারী, যারা এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছেন, ৯৯ পদাতিক ডিভিশনের সৈন্যদের হাতে নিজেদের ধর্ষিত হওয়ার মর্মস্পর্শী বর্ণণা দিয়েছেন রয়টার্সকে। বেগম নামে একজন জানিয়েছেন, তাকে ধর্ষণের আগে তার ছোটবোনকে জবাই করেছিল মিয়ানমারের এক সৈন্য।

‘কালাররা শান্ত হয়ে গেছে। তাদের গ্রামগুলো পুড়ে গেছে,’ ফেইসবুকে ৫ সেপ্টেম্বর দেওয়া অপর এক পোস্টে বলেন লেফটেন্যান্ট সাই সিট থোয়াই অং। রোহিঙ্গারাই নিজেদের বাড়ি পুড়িয়ে সেনাবাহিনীর ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছে বলেও দাবি এ সেনা কর্মকর্তার। অভিযানের পর পদাতিক বাহিনীর সদস্যদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার ছবিও মিলেছে ফেসবুকে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close