Featuredসিলেট থেকে

সিলেটে উৎসবমুখর পরিবেশ: আছে শঙ্কাও

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: পূণ্যভূমি সিলেট এখন উৎসবের নগরী। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আমেজ চারদিকে। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে প্রতিটি মোড়, রাস্তাঘাট, অলিগলি।

পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে চলছে নির্বাচনী আলাপ-আলোচনা। তবে এরমধ্যেও শঙ্কা রয়েছে ভোটার ও প্রার্থীদের মনে। নির্বাচনের এখনো ১০ দিন বাকি।

দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই যেনো শঙ্কা দানা বেঁধে ওঠছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা, প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, অন্যদিকে নিকট অতীতে সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনের নানা অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে।

খুলনা ও গাজীপুরের চিত্রও সামনে আনছেন তারা। সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই তারা সন্দিহান- আদৌ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা। নাকি খুলনা, গাজীপুরের মতোই নতুন কোনো উদাহরণ হবে এ নির্বাচন।

তবে শুধু শঙ্কা নয়, উল্টো বক্তব্যও রয়েছে অনেকের। এ পক্ষ বলছে, সিলেট মোটেই অন্য সিটির মতো নয়। এ শহরের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। শহরের মানুষও প্রতিবাদী।

তারা যেকোনো অন্যায় সহজে মেনে নেবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা প্রসঙ্গে তারা বলছেন, মানুষ একবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে তাদেরকে সামাল দেয়া কঠিন হবে। সে বিবেচনায় এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আশাবাদী তারা।

দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগরী ছেয়ে গেছে সাদা-কালো পোস্টারে। ২৭টি ওয়ার্ডের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে ঝুলছে ৭ মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি স্ব স্ব ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টার।

বৃষ্টি-বাদলার হাত থেকে এসব পোস্টারকে রক্ষা করতে পলিথিনের ভেতরে করে ঝুলানো হয়েছে। ঝুলছে ডিজিটাল ব্যানার ফেস্টুন। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার চিত্রই এক।

সরজমিন দেখা গেছে, নগরীর কোর্ট পয়েন্টের ওভারব্রিজ, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার পয়েন্ট, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পয়েন্ট, রিকাবীবাজার পয়েন্ট, মির্জা জাঙ্গাল পয়েন্ট, তালতলা পয়েন্ট, বাগবাড়ী পয়েন্ট, মীরের ময়দান পয়েন্ট, সুবিদবাজার পয়েন্ট, আখালিয়া, নয়াসড়ক, শাহী ঈদগাহ, টিলাগড়, শিবগঞ্জ, নাইওরপুল, কাজীটুলা, সোবাহানীঘাট, মেন্দিবাগসহ সবক’টি পয়েন্টই মেয়র প্রার্থীদের পোস্টারে ঢাকা পড়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক স্লোগান লেখা ব্যানারও শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এ যেন উৎসবের নগরী।
এদিকে, গত ১০ই জুলাই প্রতীক পেয়েই গণসংযোগে নেমে পড়েছেন মেয়রপ্রার্থী ও তার নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। বসে নেই কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। দুপুর দু’টোর পর থেকে চলছে মাইকিংও।

নানা ঢংয়ে, সুরে সুরে চলছে প্রার্থী বন্দনা। পাড়ায়-মহল্লায় গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন নিজ নিজ দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও।

তবে এতকিছুর পরও রয়েছে আতঙ্ক, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা। নগরীর বিভিন্ন এলাকার তৃণমূল ভোটার থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এ শঙ্কা কাজ করছে।

গতকাল কথা হয়, নগরীর টিলাগড় এলাকার পান-চা বিক্রেতা আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি এ সিটির ২৪ নং ওয়ার্ডের ভোটার।

তিনি বলেন, নির্বাচন যদি ঠিকমতো হয় তবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। ঠিকমতো কি হয় বলতে তিনি কি বুঝাচ্ছেন জানতে চাইলে নির্বাচনে কারচুপির কথা উল্লেখ করেন।

কোন প্রেক্ষিতে এমন কথা বলছেন- জিজ্ঞাসা করলে খুলনা ও গাজীপুরের সিটি করপোরেশনের কথা উল্লেখ করেন এই চা-বিক্রেতা। একই দোকানে বসে ছিলেন সিটি করপোরেশনের কর্মচারী রাহেল।

তিনি বলেন, দুই সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং বদরউদ্দিন আহমদ কামরান- উভয় সিলেটের উন্নয়নের জন্য ভালো। তারমতে, কামরান দয়ালু মানুষ। আরিফও সৎ।

দীর্ঘদিন জেলে থাকার পরও তিনি যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদেরও বেতন বাড়িয়েছেন। তার মতে, নিজের পকেটের টাকা খরচ করেও তিনি নগরীর উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। রাহেল বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনের মানুষ সুষ্ঠুমতো পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই।

কথা হয় সরকারি চাকরিজীবী মাসুদ খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এছাড়া সদ্য সমাপ্ত হওয়া দু’টি সিটি করপোরেশনেরও উদাহরণ টানেন। অন্য সিটির মতো এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতোটা নেই। তবে সরকারি দল মূল গেমটা খেলবে ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে কিংবা ভোটের দিন।

এদিকে খোদ প্রার্থীরাও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গতকাল বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।

আরিফুল হক চৌধুরীর বাড়ি সংলগ্ন তার অফিসে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনের আগে থেকেই পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়। এতে নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে দলীয় প্রার্থী আরিফের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

জামায়াত সমর্থিত নাগরিক ফোরামের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের পক্ষ থেকেও সরকারদলীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ও নাগরিক ফোরামের  সদস্য সচিব মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রচারণায় বের হলে সরকার দলীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাধা দিচ্ছে। আমাদেরকে ঘিরে নানান ধরনের কটূক্তি করছে। গত পরশুও (মঙ্গলবার) প্রচারণার সময় আমাদের দুই মহিলা কর্মীকে তারা আটকে রেখে নাজেহাল করে।

এছাড়া একটি পথসভাও তাদের কারণে বানচাল করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো সুরাহা হয়নি। এই অবস্থায় কর্মী সমর্থক ও ভোটাররা আতঙ্কে রয়েছেন।

খুলনা-গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে যেভাবে নির্বাচনকে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে তাতে সাধারণ ভোটাররা সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে শঙ্কিত। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদরউদ্দিন কামরানও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তার আঙ্গুল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর দিকে।

গতকাল সকালে গণসংযোগকালে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা নিজেদের অন্তর্কোন্দলের কারণে নিজেরাই দিশাহারা। জামায়াতও তাদের সঙ্গে নেই। এই অবস্থায় তারা অপপ্রচার চালিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করছে। যা ভোটারদের শঙ্কিত করছে বলেও মন্তব্য করেন নৌকার প্রতীকের এই প্রার্থী।

সিসিকের এবারের নির্বাচন পূর্বেও যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। কেননা এবারই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে সিলেট সিটিতে। নির্বাচনী প্রচারণা চলবে আগামী ২৮ই জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ৩০শে জুলাই।

উল্লেখ্য, সিসিক নির্বাচনে এবার চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধে  নেমেছেন ১৯৬ প্রার্থী। এর মধ্যে মেয়র পদে ৭ জন, কাউন্সিলর পদে ১২৭ জন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬২ জন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close