Featuredযুক্তরাজ্য জুড়ে

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জালিয়াতির স্ক্যান্ডাল বিষয়ে তদন্ত দাবি

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে, তার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে ব্রিটিশ এমপিরা। বাংলাদেশ ছাড়াও দেশটিতে বসবাসরত আরও বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর বলছে, এসব শিক্ষার্থীরা ইংলিশ টেস্টে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। এমন অভিযোগে ইতোমধ্যেই সাত হাজারের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার ওয়েস্টমিনস্টার হলে এক পার্লামেন্টারি বিতর্কে কেস স্টাডি হিসেবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আহসানের বিষয়টি সামনে আনেন ব্রিটিশ এমপিরা। এ সময় তারা স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতি আহ্বান জানান, আহসানের মতো শিক্ষার্থীদের যেন সুযোগ দেওয়া হয়; যারা দাবি করছে, ইংলিশ টেস্টে জালিয়াতির ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভুল।

যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির এমপি আফজাল খান বলেন, আহসানের ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের শেষ দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বিচারক রায় দিয়েছিলেন, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা তাদের এভাবে দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত নয়।

এমপি  আফজাল খান বলেন, তার মামলা ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত তালিকা থেকে নিজের নাম মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি কয়েক মাস ধরে তিনি অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন। সে পরিস্থিতি বর্ণনা করেছিল এভাবে যে, ‘এখানে আমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর্থিকভাবে, বরং নৈতিকভাবে এটা ঘটছে।’

অভিবাসীদের ইস্যুতে বরাবরই সরব ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা মাইগ্রেন্ট ভয়েস। এ ইস্যুতেও প্রচারণা চালিয়েছে সংস্থাটি। গত জুলাইয়ে হাউস অব কমন্সে এ সংক্রান্ত প্রচারণার সূচনা করেন মাইগ্রেন্ট ভয়েসের পরিচালক নাজেক রামাদান। তিনি বলেন, এই ইস্যুটি যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা ব্রিটিশদের জীবনযাত্রার মূলনীতিগুলোর বিপরীত। এখানে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কেউ নির্দোষ। তাই সমষ্টিগত শাস্তি প্রয়োগ ব্রিটিশ মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ইস্যুটি সামনে আসে ২০১৪ সালে। ওই সময় বিবিসি’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কলেজগুলোতে টেস্ট অব ইংলিশ ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন (টিওইআইসি) পরীক্ষায় প্রতারণার কিছু চিত্র উঠে আসে। এ ঘটনায় তদন্তে নামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ৩৩ হাজার ৭২৫টি পরীক্ষার ফল অবৈধ বা অকার্যকর। এছাড়া ২২ হাজার ৬৯৪টি পরীক্ষার ফল প্রশ্নবিদ্ধ।

মাইগ্রেন্ট ভয়েস-এর প্রতিবেদন অবশ্য বলছে, স্বরাষ্ট্র দফতর তার অভিযোগের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু শিক্ষার্থীকে এমন স্থানে টেস্ট অব ইংলিশ ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন (টিওইআইসি) পরীক্ষায় প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে যারা কখনও ওই জায়গায় যায়নি। এমনকি এমন একজন শিক্ষার্থীও রয়েছে যে কখনও এই পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

এদিকে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবার বিগত বছরগুলোর চেয়ে বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন প্রক্রিয়ার সংস্থা ইউনিভার্সিটিস অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিশন সার্ভিস (ইউকাস) গত ফেব্রুয়ারিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

ইউকাস জানায়, গত বছরের চেয়ে এবার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিমাণ ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ১৯০ জন আবেদন করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কতজন ভর্তি হতে পারবেন তা স্পষ্ট করেনি সংস্থাটি।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন সেশন। আবেদন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি থেকে বোঝা যায় যে, যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে।

ইউকাসের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ থেকেও যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার জন্য আবেদনের পরিমাণ বেড়েছে। সংস্থাটির বহিঃসম্পর্ক বিভাগের পরিচালক হেলেন থ্রোন বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে খুবই জনপ্রিয়। এর মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষার মান ও অভিজ্ঞতা। আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন পাউন্ডের দাম কমায় পড়াশোনার খরচও অনেকটা আয়ত্ত্বে চলে এসেছে।’

এবারের শরতে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দুনিয়ার নানা প্রান্তের এক লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। ইইউ’র শিক্ষার্থীদের আবেদন জমা পড়েছে ৪৩ হাজার ৫১০টি। যা গত বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। অন্যান্য দেশ থেকে জমা পড়েছে ৫৮ হাজার ৪৫০টি। গত বছরের তুলনায় যা ১১ শতাংশ বেশি।

এই সংখ্যাটি এমন সময় প্রকাশ হলো যখন আলোচনা চলছে যে ব্রিটিশ সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া কমিয়ে দেবে কি না। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই সংখ্যা কমে গেলে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশ থেকে আসা অর্থের পরিমাণ অনেক কমে যাবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তার আগের অবস্থান থেকে অনেকটা নমনীয় হয়ে এসেছেন। ইতোপূর্বে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি করলে দীর্ঘমেয়াদী কোনও সুফল আসে না। তবে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, কলেজগুলোতে অনেক অনাচার হয়েছে। ৯০০টি কলেজে এখন বিদেশি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য আসতে পারেন না। কারণ তাদের বেশিরভাগই কাজের জন্য এখানে আসে। অনেকে একসঙ্গে এসে আবার চলে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কোনও লাভ হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিবাসী সীমা বাড়ানোর চেষ্টা করছে যেন তারা আরও বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে। বিশাল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী দেশটির অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে।

এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে পড়াশুনা করতে যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা দেশটির অর্থনীতিতে বছরে দুই হাজার ২৬০ কোটি পাউন্ড যুক্ত করছে। এতে করে যুক্তরাজ্যই লাভবান হয়েছে। দ্য হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউট ও কাপলান ইন্টারন্যাশনাল পাথওয়েস যৌথভাবে ‘দ্য কস্ট এন্ড বেনেফিটস অব ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস বাই পার্লামেন্টারি কনস্টিটুয়েন্সি’ নামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে দেখানো যে বিদেশি শিক্ষার্থীরা কিভাবে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close