Featuredরাজনীতি

রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন কি জাপা চেয়ারম্যান

রাজনীতি ডেস্ক: হঠাৎ মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে নিজের ছোট ভাইকে দ্বিতীয় দফায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

শনিবার (৪ মে) রাত সাড়ে দশটার দিকে নিজের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার জালালীকে দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে খবর পাঠালেন, জাপার কোনও নেতাকে না জানিয়ে তার বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে যেতে।

আধঘণ্টার নোটিশে সংবাদ সম্মেলনে ভাঙা শরীরে সুতি কাপড়ের পাঞ্জাবি চাপিয়ে অস্পষ্ট শব্দে এরশাদ জানালেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার ভাইকে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। পরবর্তী ঘোষণা পর্যন্ত গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

এরশাদের হঠাৎ এ সিদ্ধান্তের পর জাপাসহ রাজনৈতিক দলগুলোয় আলোচনা শুরু হয়, তাহলে কি এরশাদ অবসরে যাচ্ছেন? ঠিক কী কারণে মধ্যরাতে সাংবাদিকদের ডেকে এনে জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে হলো?

এমন প্রশ্নের উত্তরে বিস্ময় প্রকাশ করেন এরশাদের ছোট ভাই। বললেন, বিষয়টি তার কাছেও অভিনব ঠেকেছে। তিনি বুঝতে পারছেন না হঠাৎ করে তার ভাই কেন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

তবে পদ ফিরে পেয়ে আনন্দিত জিএম কাদের। শনিবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এখন দায়িত্ব পেয়েছি, কাজ করতে পারবো। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি।

যদিও এ বছরের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে স্বাক্ষরিত সাংগঠনিক নির্দেশ জারি করেছিলেন এরশাদ।

এরপর ২২ মার্চ জিএম কাদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে এরশাদ জানান, তাকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হলো। পরদিন আবারও জানানো হলো, ছোট ভাইকে তিনি সংসদের উপনেতার পদ থেকেও বাদ দিয়েছেন।

জিএম কাদের ওই সময় বলেছিলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না, কারা করলো, কেন করলো।

দেবরকে সব পদ থেকে ছুড়ে ফেলায় জোয়ার তৈরি হয় রওশন এরশাদপন্থী নেতাদের মধ্যে। খুশির জোয়ারে ভেসেছেন তারা। এই নেতারাই এরশাদের শনিবারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ। বলছেন, এরশাদ জীবিত এবং বিরোধীদলীয় নেতার পদে আছেন। এ অবস্থায় একই ঘটনা দু’বার ঘটলো। সেক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চট করে কিছু বলা হলে পুরো বিষয়টা ঘোলাটে হওয়ার শঙ্কা থাকায় সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন একাধিক নেতা।

রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ম্যাডাম আরও সময় নেবেন নিশ্চয়ই। আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। স্যার জীবিত আছেন, স্বপদে আছেন, এ অবস্থায় আমাদের বলার কিছু নেই।’

এরশাদের এ সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে তার অবসরের বার্তা কিনা, এমন প্রশ্ন ছিল জিএম কাদেরের কাছে। তবে তার ধারণা, ঘটনার কারণ ভিন্ন।

পুরো ঘটনা খুলে বললেন জিএম কাদের। বলেন, ‘হঠাৎ করেই তার মনে হয়েছে। সকালেও আমি একবার গিয়েছিলাম স্যারের বাসায়। এরপর আবার ডাকা হয়। আবার ফিরে আসি। এরপর জিম করছি, ওই সময় তিনি ডেকে নিয়ে গেছেন। খাওয়া-দাওয়া করেছি। তখনই স্যার বলতেছিলেন, ‘‘আমার যদি হঠাৎ কোনও কিছু হয়ে যায়, কী হবে, পার্টির কী হবে’’ নানান কথা। এরপর আমি বললাম, এগুলো আপনার ঠিক করে দিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল। তারপর আমি চলে আসছি এসময় তিনি বললেন, ‘‘আচ্ছা ঠিক আছে। দেখি, কাল-পরশু একটা কিছু করে দেবো।’’ এরপর হঠাৎ করে বলছেন, যে না, এখনই করবেন উনি। আজকে রাতেই করবেন। কিন্তু কী করবেন, সেটা উনি আমাকে বললেন, এভাবে আমি করতে চাই। এরপর আমি ড্রাফট করলাম, কয়েকজনকে নিয়ে দেখালাম। তারপর তাকে দেখানোর পর অ্যাগ্রি করলো যখন, ঠিকঠাক করলেন, তখন তিনি পড়লেন। তার ধারণা হয়েছে, তার এই সিদ্ধান্তটা দিয়ে যাওয়া দরকার। তিনি নিজে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেলে পার্টিতে স্থিতিশীলতা থাকবে।’

তবে এরশাদের এ সিদ্ধান্ত জাতীয় পার্টিতে কতটা স্থিরতা ধরে রাখবে? রওশনপন্থীরা মনে করেন, সময়েই এ সিদ্ধান্তের কার্যকরিতা বলে দেবে। তবে তাদের পক্ষ থেকে এখনই কোনও প্রতিক্রিয়া জানানোর সম্ভাবনা নেই।

জাপার প্রেসিডিয়ামের প্রভাবশালী একজন সদস্যের মতে, ‘প্রথমত রাজনৈতিকভাবে এখন এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে বিএনপির সংসদে আসা আওয়ামী লীগকে অনেকটাই শক্তিশালী করেছে। একাদশ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলটির মধ্যে যে হতাশা বিরাজ করছিল তা কেটে গেছে। বিএনপি বেকায়দায় আছে। এই বেকায়দার সময় জাপাকে কার্যকরী করা যেতো। কিন্তু তা না করে জিএম কাদেরকে প্রথমে সরানো হলো। এরপর বহাল করা হলো। আবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে জিএম কাদেরকে একটি পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছে। ওই পক্ষটিই এরশাদকে দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করিয়ে নিয়েছে। ফলে, পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে সময় লাগবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

এরশাদের পরবর্তী সিদ্ধান্তে জিএম কাদের বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসছেন, এমন সম্ভাবনা কতটা। রওশনপন্থী এক প্রভাবশালী নেতা বলেন, ‘এর সম্ভাবনা কম। বিরোধীদলীয় নেতা হতে পার্লামেন্টারি বোর্ডের তো মত থাকবে। পার্টির এমপিদের মতামত থাকবে। সেক্ষেত্রে জিএম কাদেরের দিকে সমর্থন নাও যেতে পারে। এছাড়া এরশাদের জীবদ্দশায় রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেছেন। একইসঙ্গে এরশাদ নিজেও আমৃত্যু পদেই থাকতে চান, এমন আভাস তিনি ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে রেখেছেন।’

জানতে চাইলে জিএম কাদের বলেন, ‘আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়নি। পার্লামেন্টের দায়িত্বে স্যার থাকাই ভালো।’ তবে উপনেতার বিষয়ে এরশাদের কোনও আগ্রহ আছে কিনা, উত্তরে জিএম কাদের বলেন, ‘এটা নিয়ে আমি ভাবছি না। তাকে আমি নিজেও বলেছি, এটা নিয়ে চিন্তা না করতে। স্যার আমাকে বলেছিলেন, আমি না করেছি।’

শনিবার রাতে জিএম কাদেরকে পদে বসানোর খবরে জাপার অনেক নেতাই নাখোশ। প্রেসিডিয়ামের একজন সদস্যের দাবি, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদসহ অনেকেই জিএম কাদেরকে দলের নেতৃত্বে মেনে নিতে পারছেন না। কাজী ফিরোজ রশীদ গত মার্চেই অভিযোগ করেছিলেন, ‘জিএম কাদের কর্মীবান্ধব নন। তিনি মিটিং করেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না।’

জিএম কাদের মনে করেন, ‘জাপার হাতেগোনা চার-পাঁচজন নেতা আছেন, তারা তাকে অপছন্দ করেন। তবে এটা কাজের ক্ষেত্রে কোনও বাধা হবে না।’

কাদের আশা প্রকাশ করেন, ‘এতদিন কাজের স্কোপ ছিল না, সুযোগ ছিল না। অথরাইজড সক্ষমতা ছিল, সেটা এখন তিনি কাজে লাগাতে পারবেন।’

জিএম কাদের জানান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শরীর স্বাভাবিক আছে। তিনি কথা বলতে পারছেন স্বল্প শব্দে।

এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের কোনও ঘোষণা দেবেন না বলে জানান প্রেসিডিয়ামের অন্যতম একজন সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ঘোষণা করছি, আমার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আমার ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের পালন করবেন। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পার্টির নেতাকর্মীদের আহ্বান ও নির্দেশ দিচ্ছি।’

এদিকে, জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরকে বসানোর সঙ্গে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের চিন্তাও থাকতে পারে এরশাদের। ইতোমধ্যে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর নাম একটি পক্ষ থেকে ছড়ানো হলেও রওশনপন্থীরা মনে করছেন, বাবলু কাদেরের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। আর এর পেছনে মহাসচিব হওয়ার তাড়না বাবলুর থাকতে পারে। যদিও বিষয়টি নিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। বর্তমানে জাপার মহাসচিব পদে পরিবহন ব্যবসায়ী মসিউর রহমান রাঙ্গা আছেন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close