Featuredস্বদেশ জুড়ে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ ট্রেন দূঘটনা: লাশের গন্ধ বাতাসে

শীর্ষবিন্দু নিউজ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ রেলস্টেশনের অদূরেই বায়েক শিক্ষা সদন উচ্চবিদ্যালয়। এই স্কুল ও তার আশপাশের এলাকার বাতাসে উৎকট গন্ধ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গন্ধ বাড়ছে।

স্কুলটির মাঠে খোলা অস্থায়ী ক্যাম্পে সারিবদ্ধভাবে রাখা তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের নিহত ১৬ জনের লাশ থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত লাশে পচন ধরছে দ্রুত। লাশের সন্ধানে এখানে ছুটে আসছেন নিহতদের স্বজনেরা। আছেন এলাকাবাসীও। মানুষের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে রেলস্টেশন থেকে শুরু করে স্কুলের মাঠ পর্যন্ত পুরো এলাকার পরিবেশ।

সরেজমিন দেখা যায়, মন্দবাগ রেলস্টেশন ও বায়েক শিক্ষা সদন উচ্চবিদ্যালয় ঘিরে এখনও হাজারো মানুষের ভিড়। মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) ভোর থেকে এখানে উৎসুক মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। এরমধ্যে রয়েছেন ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতদের স্বজনেরাও। অনেকে নীরবে চোখের জল ফেলছেন, অনেকে করছেন বুকফাটা আর্তনাদ।

সোমবার (১১ নভেম্বর) রাত ৩টার দিকে মন্দবাগ রেলস্টেশনে তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ সময় আহত হন আরও অন্তত ৭৭ জন। আহতদের মধ্যে তিন জন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ, ১০ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং বাকি ৬৪ জন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মঙ্গলবার ভোরে বায়েক শিক্ষা সদন উচ্চবিদ্যালয় অস্থায়ী ক্যাম্প খোলা হয়। এরপর থেকে এখানে আনা হতে থাকে নিহতদের লাশ। সময় যত গড়াতে থাকে, নিহতদের পরিচয়ও শনাক্ত হতে থাকে। এখন পর্যন্ত নিহত ১৬ জনেরই নাম পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।

স্টেশন সূত্রে জানা গেছে,  তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে মন্দবাগ রেলস্টেশনে দাঁড়ানোর জন্য সিগন্যাল দেওয়া হয়। ওই সিগন্যালে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস প্রধান লেন থেকে ১ নম্বর লাইনে যেতে শুরু করে। ট্রেনটির ছয়টি বগি ১ নম্বর লাইনে উঠতে পেরেছিল। অন্য বগিগুলো প্রধান লেনে থাকা অবস্থায় তূর্ণা নিশীথা সিগন্যাল অমান্য করে। এতেই দুর্ঘটনা ঘটে।

মন্দবাগ রেলস্টেশনের পাশেই থাকেন মো. ফারুক হোসেন। তিনি জানান, তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে বিকট শব্দ হলে তার ঘুম ভাঙে। তারপর পড়িমরি করে ছুটে আসেন স্টেশনে। তিনিসহ আশপাশের আরও অনেকে যখন হতাহতদের লাশ উদ্ধার শুরু করেন, তখন সেখানে আসেন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।

বায়েক শিক্ষা সদন উচ্চবিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে আবু ইউছুফের লাশ। সে লাশ বুঝে নিতে হবিগঞ্জের আনোয়ারপুর থেকে এখানে এসেছেন আবু ইউছুফের স্বজনেরা। তারা জানান, আবু ইউসুফ হবিগঞ্জ লিটল ফ্লাওয়ার কেজি অ্যান্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ওই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামের মৃত হাসান আলীর ছেলে। ইউসুফ আড়াই বছর আগে বিয়ে করেন পাশের উপজেলা আজমীরগঞ্জের রসুলপুর গ্রামে। তার স্ত্রী ইস্তিয়া চট্টগ্রামের রাউজানে একটি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন। ইষা নামে তাদের একবছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে।

নিহত ইউছুফের ভাগিনা তাজউদ্দীন বলেন, ১৪ নভেম্বর ইউছুফের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলামের বিয়ের অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে মেয়ে ও স্ত্রীকে চট্টগ্রাম থেকে আনার জন্য সোমবার রাতে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে উদয়নে ওঠেন মামা (ইউছুফ)। তারপর আমরা সকালে জানতে পারি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তিনি। তাজউদ্দীন আরও জানান, লাশ বুঝে নিতে তার সঙ্গে এসেছেন আবু ইউছুফের চাচা আবদুল জলিল, স্ত্রী ও কন্যা।

পাশেই মেয়ে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু ইউছুফের স্ত্রী ইস্তিয়া। তার চোখমুখ ফুলে রয়েছে। হাজারও মানুষ ও অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে চারদিকে অবাক চোখে তাকাচ্ছে আবু ইউছুফের মেয়ে ইষা।

তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের রাজারগাঁও গ্রামের মুজিবুর রহমান ও স্ত্রী কুলসুমা বেগম। তাদের লাশ বুঝে নিতে এসেছেন মুজিবুর রহমানের ভাই জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, মুজিবুর হবিগঞ্জে থাকতেন। সেখানে তার একটি হার্ডওয়্যারের দোকান ছিল। চাঁদপুর থেকে স্ত্রী কুলসুমা হবিগঞ্জে যান স্বামীর কাছে। সোমবার (১২ নভেম্বর) রাতে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশে রওনা হন তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামসুজ্জামান জানান, নিহত ১৬ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১৩ জনের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করেও দেওয়া হয়েছে দাফনের জন্য।

দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে এখন পর্যন্ত পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রেল মন্ত্রণালয়।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close