Featuredদুনিয়া জুড়ে

নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রাথমিক রায় আজ

শীর্ষবিন্দু আর্ন্তজাতিক নিউজ: বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়ত, রাষ্ট্রবিহীন সংখ্যালঘু জাতির নাম এখন রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬-২০১৭ সালে সামরিক নির্যাতন এবং দমনের সম্মুখীন হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রাথমিক রায় আজ বৃহস্পতিবার।

জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর চালানো দমন ও নির্যাতনকে জাতিগত নির্মূলতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যেখানে গণহত্যার মত অপরাধের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দ্বারা সংগঠিত এই গণহত্যার বিচারের জন্যে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। মামলার রায় নিয়ে আশায় বুক বেঁধে আছেন বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গারা। যারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো হত্যা, ধর্ষণ, আগুনে পুড়িয়ে মারা নির্যাতন সইতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের বিশেষ তদন্তকারী ইয়ংহি লি বিশ্বাস করেন, মিয়ানমার পুরোপুরি তাদের দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতড়িত করতে চায়। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আঘাতের চিহ্ন, মৃতদেহগুলো প্রমাণ করে হত্যার উদ্দেশ্যেই তাদেরকে আঘাত করা হয়েছে। যারা পারছে, তারা প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়ছেন। এভাবেই মিয়ানমার চাচ্ছে আরাকান জনপদটিকে রোহিঙ্গামুক্ত করতে। জাতিগত নিধনের লক্ষ্যে গণহত্যার মাধ্যমে এই নারকীয় আক্রমণ চালানো হচ্ছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর।

সাম্প্রতিক ২০১৬-১৭ মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের পূর্বে অনুমানিক ১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করত। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মের অনুসারি, যদিও কিছু সংখ্যক হিন্দু ধর্মের অনুসারিও রয়েছে। তাদের ভাষা রোহিঙ্গা ও বার্মিজ। কেউ কেউ আরবী ও উর্দু ভাষাও জানেন। গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গাই দেশছাড়া। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, নেপাল ও ভারতে ছড়িয়ে গেছে এই দেশ-বিতাড়িত মানুষগুলো।

১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন অনুসারে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ১৯৮২ সালের আইনে “রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অর্জনের সম্ভাবনা কার্যকরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অথচ মানুষগুলো সুপ্রাচীনকাল থেকেই আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। বর্তমান মিয়ানমারের “রোসাং” এর অপভ্রংশ “রোহাং” (আরাকানের মধ্যযুগীয় নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। আরাকানের প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ।

১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুবার তাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালায়। এই আক্রমণ অব্যাহত থাকে। ২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া আক্রমণেও লাখ লাখ রোহিঙ্গা গৃহহীন-উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুসারে, ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গারা নতুন করে মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়ে স্বদেশ ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘নাগামান’ (‘ড্রাগন রাজা’) অভিযানের ফলে প্রায় দুই লক্ষ (২,০০,০০০) রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

সরকারিভাবে এই অভিযান ছিল প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যে সব বিদেশি অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই সেনা অভিযান সরাসরি বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলছিল এবং ফলে ব্যাপক গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ঘটনা ঘটে।

১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। ২০০৫ সালে, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে, কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

বিশেষত, ২০১৫ সময়কালে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে চলমান গণহত্যায় লক্ষ লক্ষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা পাঁচ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসকারী মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লক্ষের বেশি।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close