Featuredফিচার

ছেলেবেলার স্মৃতিকথা: কেউ ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি কাউকে

কিছু এলোমেলো স্মৃতিকথা। নিজের ছেলেবেলা সম্পর্কে এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে এক সময় লিখতে বসবো। কোন সময় কল্পনায়ও আনতে পারিনি। গত বছর জুলাইতে নিজ মাতৃভুমিতে বেড়াতে গেলে ছেলেবেলার বন্ধুদের সুখ-দু:খ গাথা কষ্ট-আনন্দ-বেদনার সব বাস্তবতা দেখে এই লেখার তাগিদ অনুভব করলাম।

ইচ্ছে ছিল ছেলেবেলার বন্ধুদের নিয়ে চমৎকার সব কাহিনীগুলো ছবির এ্যালবামের মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করবো। হয়তো সেভাবে করতে পারিনি। তবে এখানে শুধু মনের আবেগটাই প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি মাত্র।

ছেলেবেলার বন্ধু এমদাদ, এমাদ ও উত্তম: এখানে যে তিনজন ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছে, তারা সবাই আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথী। সেই সময়কাল ছিল ১৯৭১-১৯৭৫ সাল। আমরা সিলেট শহরের খাসদবির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একসাথে পড়াশুনা করেছি। ছেলেবেলার বন্ধুদের মধ্যে যথাক্রমে- এমদাদ, এমাদ ও উত্তম

এমদাদ বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী ও এমাদ নিউ ইর্য়কের স্থায়ী বাসিন্দা আর উত্তম সিলেটেই আছে।

সহপাঠি সালেক: আমার পাশে দাড়িয়ে আমার ছেলেবেলার বন্ধু-সহপাঠি সালেক। তার সাথে আমার শিক্ষা জীবন কেটেছে সিলেটের প্রাচীনতম বিদ্যাপিট দি এইডেড হাইস্কুলে। সময়কাল ছিল ১৯৭৬-১৯৮১ইং সাল।

কর্মজীবনে সে এখন সিলেট জজ কোর্টের মুহুরী হিসেবে তার কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে।

বন্ধু গনি: আর সাথে বসা অবস্থায় যে ছবির ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে, তার নাম গনি। সেও আমার ছোটবেলার বন্ধু।

তার সাথে ১৯৭৬ সালে একই উচ্চ বিদ্যালয়ে দি এইডেড হাই স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু নিয়তির নির্মম বাস্তবতা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেয়নি।

কুকড়ে পড়েছিল এখনও কুকড়েই আছে। দীর্ঘ দিনের স্মৃতি নিয়ে সে আমাকে ভুলেনি, আমি ও তাকে ভুলিনি।

১৯৭৭ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত ওর সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই। যদিও দেখা করার সুযোগ ছিল। সময়ের অনুক্ষণে পরিবর্তিত মন তখন এমন ছিল না আজ যেমন। প্রবাস জীবনের বিরতিতে ২০০১ বা ২০০৪ এ একবার তাকে দেখে এসেছিলাম।

আর এবার ১৫ বা ১৮ বৎসর পর আবার তাকে এক সন্ধ্যা বেলা দেখতে গেলাম। জীর্ণশীর্ণ জড়ো হয়ে কঙ্কাল অবশিষ্ট শরীর নিয়ে বিছানায়। ওর ভাইরা আমাকে ভালো ভাবে চিনতে পারছেন না। ওকে ডাকা হচ্ছে সাড়া শব্দ নেই। এগিয়ে গেলাম নিরবে। আমার নাম না বলে আলতো গায়ে হাত বুলিয়ে ওর নাম ধরে ডাকলাম। একটু নড়ে উঠলো। ওর শক্তিতে পারছিল না উঠতে। হাত দিয়ে আদরের করে তাকে তুললাম। কিন্তু তাকে দেখেই আমার বুকটা ফেটে যেমন একটা অব্যক্ত ব্যাথা গুমড়ে উঠছে। আমি যেন তার ব্যাথায় ব্যতিত হয়ে ব্যাথায় সংকুচিত ও কিছুটা অবচেতন হয়ে পড়লাম। মনে কেন যেন একটা ভাবনা আসলো আমারই একটা রূপ তার মধ্যে নিহিত, তার বর্তমান রূপে। কেন সে আমার মত লেখাপড়া করে জীবন যুদ্ধ চালাতে সক্ষম হল না, তা শুধু কপাল এটা মানতে রাজি না। এটার বিবিধ কারন আলোচনার দাবি রাখে।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে তার পূর্বপুরুষ থেকেই তাদের বসবাস। তার বাসস্থানের অবস্থা জানান দিচ্ছে- এই শহরে এই চিলে কোটায় আসেনি শিক্ষা বা অর্থ। পুরো পরিবারটাকে আমি যেন হকচকিয়ে দিলাম। আমার বা আর কি করণীয় ছিল। তাকে না দেখে আসলে আবার একটা অতৃপ্তি বেলা অবেলা নাড়া দিত। বড় সযত্নে তাকে কাছাকাছি নিয়ে বসলাম। কাদে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে চিনেছ কি?

সাগর সমান প্রশস্তি দিয়ে যে বাক্য বের হয়ে আসলো, সেটা যে কি মূল্য আমি ছাড়া আর কে জানে। সেটা গিয়ে বিদ্ব হল সেই বন্ধুত্ব ও মানবতার গগনে উজ্জ্বল তারাসম হয়ে।

সে পরিষ্কার বলল তুমি ছালিক অনেক দিন আগে এসেছিলে, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার যাওয়া এবং দেখাটা তার জন্যে তীর্তের কাকের মত ছিল। নতুবা তার মনন জগতে আমি গেঁথে ছিলাম বা আছি ওর একজন হয়ে।

সে আমাকে বলল গেঞ্জি কিনবে টাকা দিতে। এক হাজার টাকা দিয়ে সাথে সাথে আরো পাঁচশ টাকা দিলাম। হাতে রাখলো আমার মনটা বলছে আর দিতে। পকেট থেকে আর হাজার টাকা বের করে তাকে দিলাম কিন্তু সে নিবে না আমি নাকি অনেক টাকা তাকে দিয়ে দিয়েছি। বন্ধুর টাকার প্রতিও তার মমত্বও কম না।

আমাকে সে আভিভূত করে দিল। তার পক্ষ থেকে কিছু খাবার তাগিদ আমি সঙ্গত কারনে রাখতে পারিনি। আমরা যারা শৈশব বেলার সাথীকে ফেলে এসেছি। দুঃখে কষ্টে যারা আছে তারা কিন্তু আমাদেরকে তাদের অন্তরে আবেগ আপ্লুত করে ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রেখেছে। তারা আমাদের মানবিক সান্নিধ্য কামনা করে। আমরা কতজন তা বুঝতে পারি?

সহপাঠি শামীম: আমার অপর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথী যার বুকে হাত দিয়ে কাছাকাছি দাড়িয়ে আছি। ওর সাথে তেমন হৃদ্যতা না থাকলেও একটা আপন দৃষ্টি ওর প্রতি ছিল। খুশি হলাম ওকে মুহুরি হিসেবে পেয়ে। আমি তখন সিলেট জজ কোর্টে উকিল হিসেবে কর্মরত। সময়টা ছিল ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ইং সাল।

এইবার ওর বিধ্বস্ত রুপ অবলোকন করে আমার মাথাটা গুরপাক খেতে লাগলো। কি থেকে কি হয় ভাবনাই কুলায় না। ওর বাবা চাচাদের চিনতাম। ওর বাবা খুবই প্রভাবশালী, বিশেষ শারীরিক কাঠামোর অধিকারী ছিলেন। উনি যখন রিক্সায় বসতেন, রিক্সাটা কে ছোট লাগত। সিলেট শহরে যদি আর কাউকে উনার সামনে দাড় করানো যায় তাহলে কূলঞ্জের নাসির চৌধুরী (সাবেক এমপি) ভাইকে ভাবা যায়।

ওর বাবা-চাচারা অবস্থা সম্পন্ন ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু তার করুন নেক্কারজনক পরিনতি খুবই দুঃখজনক। চৌকিদেখী মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে খাসদবিরের দিকে ধাবমান, চলার পথে মধ্যখানে এক আত্বীয়ের বাসার সন্ধান করার সময় এক লোক আমার দিকে দৃষ্টি দিলো। আমি দৃষ্টি সরাতে না সরাতেই সে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। আমি ওকে অবাক করে প্রশ্ন করলাম, আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন? সে একটু ভয় পেল, বলল না আমি তো তাকাইনি। আমি ওকে জড়িয়ে বললাম তুমি শামীম না? সে আরও বেশি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো।

তাকে অভয় দিয়ে আমার পরিচয় দিলাম। তার বর্তমান অবস্থা তুলে লজ্জা দিলাম না। সে আমার কাছে টাকা চাইলো। পাঁচশত টাকা অতি আনন্দের সহিত দিলাম। আমার শ্যালক আমার ব্যবহারে মোটেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। সে হয়তো মনে করছিল আমি রাস্তায় কোন এক লোককে টাকা দিয়ে দিচ্ছি।

কিন্তু আমার শ্যালক শামীমকে না জানলেও আমি আমার ছোটবেলার সাথীকে বুঝতে চেষ্টা করলাম। পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল তার প্রতিকূল। অবজ্ঞা করতে পারি না তার আবদার। যাই হোক, দুই দিন বাড়িতে অবস্থানকালে সে আবার আমার সাক্ষাৎ পেল। আমাকে আবারও জড়িয়ে ধরলো আর কিছু টাকা দেবার জন্যে আবদার করলো। আমি খুশি হয়ে টাকা দিলাম। আমার শ্যালক আমাকে একটু অন্য ভাবে ভাবতে শুরু করলো। আমি বাইরের একজন জরাজীর্ণ লোককে টাকা দিয়ে শুধু শুধু টাকা নষ্ট করছি। আমার মনে হলো, আমার তাতে মাথা ব্যাথা নেই। আমার ভাবনা অনেক পিছু থেকে অনেক দূরবর্তী, বিন্দু থেকে বিসর্গ, শুরু থেকে শেষ।

লেখক: মোহাম্মদ ছালিকুর রহমান চৌধুরী, বর্তমানে বিলেত প্রবাসী

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close