Featuredফিচার

মুসলিম সংস্কৃতির পথিকৃৎ দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব

ভারত উপমহাদেশের উত্তরপূর্ব আসাম অঞ্চল সহ সিলেটের সাহিত্য ও মুসলিম সংস্কৃতির একজন পথিকৃৎ দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী (১৮৯৮-১৯৭১)। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন পুরোধা। তিনিই সর্বপ্রথম প্রবন্ধ লিখে সিলেটে ভাষা আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেন। এছাড়া এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতেও তিনি চিরঞ্জীব একজন কিংবদন্তী। ছিলেন ইসলামী রেনেসাঁ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা। বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিকাশে আজীবন কাজ করেছেন দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী। বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি আওয়াজ তুলেছেন। ক্ষুরধার লেখনিতে ফুটিয়ে তুলেছেন স্বাধিকার আন্দোলনের স্পৃহা। আর তাই তো সিলেটের সাহিত্যিক গবেষকদের মতে তিনি ছিলেন একজন অনন্য প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব।

দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরীর বসত ভিটা। দোহালিয়া পানাইল জমিদার বাড়ীর প্রবেশ দ্বার। যেটি
১৯২০ সালে ভূমিকম্পে মাটির নীচে দেবে যায়। এটি সম্ভবত আজ থেকে সাড়ে ৪শ’ বছর আগের গেট।
ছবি: মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

আহবাব চৌধুরী ছিলেন একজন তুখোড় রাজনীতিক, তাহযিব-তমুদ্দুনের এক লড়াকু সৈনিক। তাঁর ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের মনোভাব আজো ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর লেখনিতে ফুটে ওঠেছে মুসািলম জাতীয়তাবাদ, তমদ্দুন ও দেশ প্রেম। তিনি মুসলিম জাতির গৌরবময় ইতিহাস এবং ইসলামে প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করেন। বাঙালির জাতির বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় নতুন প্রজন্মকে দিক-নির্দেশনা দেবে।

আহবাব চৌধুরী ভারত ওপনৈবেশিক শাসনামলের সময় কাল হতে খেলাফত আন্দোলনের একজন অকোতভয় সৈনিক ছিলেন। তৎকালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সদস্য ও আসাম মুসলিম লীগের সহসভাপতি ছিলেন। সারা জীবন তিনি জাতীয়তাবাদের আদর্শ লালন করেছেন। ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের আসাম পার্লামেন্টের সদস্য। মুসলমানদের ওপর অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে ব্র্রিটিশ সরকার কর্তৃক দেওয়া “খান ” উপাধি বর্জন করেছিলেন। তিনি আসাম পার্লামেন্টে জ্বালাময়ী ভাষনের মাধ্যমে সংসদ চলাকালীন সময়ে নামাজের জন্য বিরতির বিধান চালু করেছিলেন। বঙ্গীয় স্বারস্বত সমাজ কর্তৃক বিদ্যাবিনোদ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন দেওয়ান আহবাব চৌধুরী। তিনি হলেন জাতীয় অধ্যাপক দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ চৌধুরীর গোত্রীয় চাচাতো ভাই। আহবাব চৌধুরীর রাজনৈতিক ও দর্শনই দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ কে অনুপ্রাণিত করেছে বলে বিবেচনা করা হয়। অসম্প্রদায়িকতার চর্চায় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মতই দেওয়ান আহবাব চৌধুরী জ্ঞানের চর্চা , বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবন-দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করলে তাঁর সত্যিকার অবদান অকপটে স্বীকার করতে হবে।

১৯১৮ সালে বিশ^ কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুর সিলেটে আসলে এই অঞ্চলের অন্যান্য সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণায় তিনি রবিন্দ্র নাথের সঙ্গে ঘনিষ্ট ভাবে পরিচিত হন। তৎকালে তাঁর উদীয়মান ক্ষুরধার লেখনির ভুঁয়সী প্রশংসা করেন রবি ঠাকুর। ১৯২০ সালে আহবাব চৌধুরী তৎকালীন আসাম সরকারের উচ্চ পদে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখান করে তিনি মৃতপ্রায় বাঙ্গালী মুসলিম জাতি-স্বত্তাকে পুনর্জীবিত করার মানসে সাহিত্য ও রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। সঙ্গত কারণেই বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরীকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

দেওয়ান আহবাব চৌধুরী ১৮৯৭ সালের মে মাসে বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া (পানাইল) গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা দেওয়ান আফতাব চৌধুরী। শৈশবে আহবাব চৌধুরী নানা বাড়ী পীরপুরে বেড়ে ওঠেন। তৎকালে পারিবারিক উস্তাদ সৈয়দ রশিদ আলীর নিকট কুরআন শিক্ষা সমাপনের পর সিলেটের তরফ নিবাসী জনৈক আব্দুল আজিজ খাদিম এর নিকট ইংরেজী প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯০৮ সালে তিনি বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার পানাইল জমিদার বাড়ীর ইংরেজী মধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেট গভর্ণমেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন।দেওয়ান আহবাব চৌধুরী ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে মেট্রিক পাস করেন এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সিলেট এমসি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি এক ছেলে ও চার মেয়ের জনক।

আহবাব চৌধুরী সুনামগঞ্জের বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া (পানাইল) জমিদার বংশের পূর্ব পুরুষ আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে ভারতের দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চল থেকে তৎকালীন সিলেট এর হবিগঞ্জ মহকুমার পুটিজুড়িতে জমিদারী প্রাপ্ত হয়ে আগমন করেন। পরবর্তীতে এই বংশের অধ্বস্তন চতুর্থ পুরুষ বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া (পানাইল) গ্রামে চলে আসেন। এখানেই আহবাব চৌধুরীর বেড়ে ওঠা। আজো তাঁর স্মৃতি বিজড়িত পৈতৃক জমিদার বাড়ীতে বসবাস করছেন তাঁরই অধ্বস্তন পরিবারের লোকজন।

আহবাব চৌধুরী ছোট বেলা থেকে তিনি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রচুর লিখতেন। ক্লাস সেভেনে পড়াশোনা করার সময় থেকে তিনি সমাজ জীবনে গাøনি দূর করতে কলম হাতে নেন। অবিরত লিখতে থাকেন সমাজের যত সব অত্যচার-শাসন শোষণের কথা। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি অবিরাম কলম চালিয়েছেন। ১৯২২ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় যে সকল প্রবন্ধ লিখেছিলেন তা একত্রে সন্নিবেশিত করে ‘‘বাঙ্গলা সাহিত্য প্রসঙ্গ’’ পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি প্রবাসী বিচিত্রা, দৈনিক আজাদ, যুগভেরী, আল ইসলাহ সহ অন্যান্য পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তার রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এদেশের মুসলমান সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চেতনাবোধ সৃষ্টি। ১৯১৯ সালে বঙ্গীয় স্বারস্বত সমাজ তাকে বিদ্যাবিনোদ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৩১ সালে তার লেখা “বাংলা সাহিত্য প্রসঙ্গ” গ্রন্থখানি প্রকাশিত হওয়ার পর সুধী সমাজের প্রশংসা অর্জন করেন এবং সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৯৩৮ খ্র্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে আসাম আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী দেশ ও সমাজের জন্য আমৃত্যু কাজ করেছেন। মুসলিম রেনেসার কথা বলেছেন এটাও তাঁর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নিজেদের প্রয়োজনে তাঁকে চর্চা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। ১৯৪৪ সালে আহবাব চৌধুরী কলকতা বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য থাকাকালে সর্বপ্রথম ইসলামিক ষ্ট্যাডিজ কে ওই বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে অন্তর্ভুক্তি মুখ্য ভুমিকা পালন করেন।

সাহিত্যিক-গবেষকদের মতে, বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাসে দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী এক বিশাল বটবৃক্ষ। মূল্যবোধের চর্চার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিকতার স¤পৃক্ততায় ইসলামী চিন্তা-চেতনার পরিপূর্ণ অনুসারী ছিলেন। এদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর পূর্ববর্তী সকল আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম।

সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী অবদান রেখেছেন। ইসলামী মূল্যবোধে এতটাই পরিপূর্ণ ছিলেন যে, আদর্শের ব্যাপারে তিনি আপোস করতেন না। ভাষা আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়েও তিনি বাংলাকে মাতৃভাষা করার জন্য প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী সত্যিকার অর্থে একজন ইসলামী চিন্তা-চেতনার অনুসারী ছিলেন। তিনি জামাল উদ্দিন আফগানীর চিন্তা-চেতনায় প্রাণিত হয়ে নিজেকে সেই ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এতদ্ব সত্ত্বেও ভাষার প্রশ্নে তিনি তাঁর সবঠুকুকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর অবদানের কারণে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন। তিনি সিলেটের জন্য এক সমৃদ্ধ ইতিহাস।

লেখক-গবেষক দেওয়ান আব্দুল হামিদ উল্লেখ করেন, ‘ব্রিটিশ আমলে বাংলা ভাষার স্বপাক্ষে যাঁরা অনবরত লেখনি পরিচালনা করতেন আহবাব চৌধুরী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্রনী। আহবাব চৌধুরী মনে করতেন, বাংলা ভাষাকে ইসলামী ভাবধারায় সত্যিকারের বাহন হিসেবে তৈরী করে ইসলামী রূপ দেওয়ার পরে যে সাহিত্য সৃষ্টি হবে তাই হবে বাঙ্গলা দেশবাসী মুসলিমদের সত্যিকারের সাহিত্য। হিন্দু-মুসলিম উভয় জাতির ভাবধারার বাহক হিসেবে সাহিত্য সৃষ্ট হলে দুই জাতির মিলনের পথ হবে প্রশস্ত।’

পরিশেষে বলতে চাই, দেওয়ান আহবাব চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ব্যক্তি। যার কারণে তিনি ইংরেজদের দেওয়া খান বাহাদুর উপাধিকে বর্জন করেছেন। আমরা আমাদের পূর্বপুরষদেরকে যতই জানতে পারবো, ততই সমৃদ্ধ হবো। তাই আমাদের মনীষীদেরকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। গবেষণা করতে হবে তাঁদের রেখে যাওয়া কর্ম-কান্ড নিয়ে।

পর্যালোচনা সহায়িকা
১. মাসিক আল ইসলাহ (১৯৩২)
২. মোহাম্মদী মদীনা ১৯৬৯, প্রবীণ সাহিত্যিক দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী (দেওয়ান আব্দুল হামিদ)
৩. দোয়ারাবাজারের শেকড় ও স্বরূপ (ইতহাস-ঐতিহ্য গ্রন্থ) নিজ প্রণীত।
৪. সাক্ষাৎকার দেওয়ান মোহাম্মদ মাহমুদ রাজা চৌধুরী। (সাধারণ সম্পাদক কেমুসাস, সিলেট)।

লেখক: মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close