Featuredইসলাম থেকে

রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আমল ‘ইতিকাফ‘

রহমত, বরকত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে হাজির হয় মাহে রমজান। রমজানের শেষ দশকের গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে- ইতিকাফ।

ইতিকাফ শব্দটি আরবি। এর অর্থ অবস্থান করা। পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয় আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। কদরের রাত প্রাপ্তির আকাঙ্খায় মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে লাভের জন্য রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফকে সুন্নত করা হয়েছে।

একজন বান্দা সবকিছু ছেড়ে শুধুমাত্র আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে তার দরজায় পরে থাকবে এবং নিরিবিলি পরিবেশে তার ইবাদতে মশগুল থাকবে।
আল্লাহতায়ালা মানুষকে ফেরেশতা চরিত্র ও পশু চরিত্রের এক সমন্বিত রূপে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের চরিত্রে ও তার সৃষ্টিতে ওই সব জৈবিক চাহিদা রয়েছে যেগুলো অন্যান্য পশুদের মাঝে থাকে। সেই সঙ্গে তার সৃষ্টিতে ঊর্ধ্ব জগতের ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। আর মানুষের সফলতা তখনই আসবে যখন তার পশুসুলভ স্বভাবের ওপর ফেরেশতাদের স্বভাব বিজয়ী হবে হবে।

রোজার সাধনার বিশেষ উদ্দেশ্যে ও লক্ষ হলো- রোজার মাধ্যমে মানুষের পশু শক্তিকে আল্লাহর আহ্কামের অনুসরণ এবং আত্মিক ও ঈমানি দাবিসমূহের তাবেদারিতে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে নেওয়া। এজন্যই রোজা সাধারণ মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেই রোজার সময় আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এবং ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইতিকাফের রীতি বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। এজন্য রমজানের শেষ দশকে কোনো এলাকার মসজিদ ইতিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নতে মোয়াক্কাদা বর্জনের কারণে গোনাহগার হবেন।

কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা দু’জন (ইবরাহিম ও ঈসমাইল আ.) আমার ঘরকে তাওয়াফকারী ও অবস্থানকারীদের জন্য পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে রাখবে।’ –সূরা বাকারা: ১২৫

হাদিস শরিফেও ইতিকাফের গুরুত্ব ও মর্যাদা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন তার এ রীতি মৃত্যু পর্যন্ত অব্যহত ছিল। পরবর্তীতে তার স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। -সহিহ বোখারি

এতেকাফ
রমজানের শেষ দশকের বিশেষ ফজিলতসমূহের মধ্যে অন্যতম সুন্নত এবাদত হল: এতেকাফ যার অর্থ সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা।

এতেকাফের উদ্দেশ্য: মানুষের ঝামেলা থেকে দূরে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত হওয়া। এ লক্ষ্যে কোন জামে মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর তরফ থেকে সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভ করার আশা করা। এতেকাফকারীর কর্তব্য হল অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকা। তবে পরিবার পরিজন বা অন্য কারো সাথে অতিপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই।

এতেকাফকারী নিজ অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করবে। নিজের অবস্থার দিকে খেয়াল করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে নিজের অলসতা ও অবহেলা করার কথা মনে করবে। নিজের পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ যে কত নেয়ামত দিয়েছেন তা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। গভীরভাবে আল্লাহর কালাম অধ্যয়ন করবে। খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও গল্প গুজব কমিয়ে দেবে। কেননা এ সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে রাখে।

অনেকে এতেকাফকে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া ও সাথিদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এতে এতেকাফের ক্ষতি হয় না বটে তবে আল্লাহর রাসূলের এতেকাফ ছিল অন্য রকম। এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস, চুম্বন, স্পর্শ নিষেধ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
‎وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِد

‘তোমরা মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না।’ সূরা আল-বাকারা: ১৮৭

শরীরের কিছু অংশ যদি মসজিদ থেকে বের করা হয় তাতে দোষ নেই। নবী করিম (সাঃ) এতেকাফ অবস্থায় নিজ মাথা মসজিদ থেকে বের করতেন।

এতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া তিন ধরনের হতে পারে:—
এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাবের জন্য, খাওয়া-দাওয়ার জন্য, পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তবে শর্ত হল এ সকল বিষয় যদি মসজিদের গণ্ডির মাঝে সেরে নেয়া যায় তবে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না।

দুই. এমন সকল নেক আমল বা ইবাদত-বন্দেগির জন্য বের হওয়া যাবে না যা তার জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা, জানাজাতে অংশ নেয়া ইত্যাদি।

তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না যা এতেকাফের বিরোধী। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। এতেকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে এতেকাফ বাতিল হয়ে যায়।

ফেতরা প্রদান
রমজান মাসের আরেকটি বিশেষ হুকুম হল ফেতরা প্রদান। সারা রমজান মাস রোজা থাকার পর ঈদের চাঁদ দেখা যাবার পর থেকে ঈদের নামায পড়ার আগ পর্যন্ত ফেতরা প্রদান করতে হয়।

ফেতরার পরিমান: নবী স. এর সুন্নত হল: দুই ছা, অর্থাৎ সোয়া তিন কেজির সমতুল্য চাল,গম, খেজুর, কিশমিশ, .. ইত্যাদির সমমূল্য অর্থের পুরোটাই ফেতরা পাবার উপযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদান করতে হবে।

আহকাম: যার উপর যাকাত ফরজ তার উপর ফেতরা ফরজ বা ওয়াজিব। অন্যদের উপর ফেতরা প্রদান করা মুস্তাহাব। আর যারা যাকাত পাবার উপযুক্ত তারাই ফেতরা নিতে পারেবে। তবে নব বংশের সন্তানদের জন্য যাকাত/ফেতরা গ্রহন করা হারাম।

লেখক: মাওলানা নুরুর রহমান, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, ইমাম ও খতিব– মসজিদুল উম্মাহ লুটন, সেক্রেটারি– শরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড ও মিডল্যন্ড ইউকে, সত্যয়ানকারী চেয়ারম্যান- নিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে, প্রিন্সিপাল- আর রাহমান একাডেমি ইউকে,  পরিচালক- আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close