Featuredইসলাম থেকে

جنّة আরাবী শব্দ: জান্নাতের পরিচয়

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার। মুসলিম ব্যক্তিরা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে কিভাবে জান্নাতে যেতে পারবেন, সে বিষয়ে পাঠকদের জন্য বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন শীর্ষবিন্দু নিউজের ইসলাম বিভাগের প্রধান- ইমাম মাওলানা এম নুরুর রহমান।

জান্নাত (আরাবী جنّة‎‎) হল ইসলামিক পরিভাষা অনুযায়ী, পার্থিব জীবনে যে সকল মুসলিম আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলবে এবং পরকালীন হিসাবে যার পাপের চেয়ে পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে তাদের জন্য আল্লাহ যে সকল স্বর্গ প্রস্তুত রেখেছেন। এটি একটি আরবী শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হল “বাগান” বা “উদ্যান”| প্রচলিত বাংলা ভাষায়একে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেহেশত বলা হয়ে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয় পরহেযগাররা বাস করবে উদ্যান ও প্রস্রবণসমূহে। (তাদেরকে বলা হবে) তোমরা শান্তি ও নিরাপওার সাথে তাতে প্রবেশ কর। আমি তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা থাকবে তা দূর করে দেব; তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে। সেথায় তাদেরকে অবসাদ স্পর্শ করবে না এবং তারা সেথা হতে বহিষ্কৃতও হবে না।” [সূরা হিজর ৪৫-৪৮]

তিনি আরো বলেন: “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পনকারী (মুসলিম) ছিলে। তোমরা এবং তোমাদের সহ ধর্মিনীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণের থালা ও পান পাএ নিয়ে ওদের মাঝে ফিরানো হবে, সেখানে রয়েছে এমন সমস্ত কিছু, যা মন চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে। এটাই জান্নাত, তোমরা তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ যার অধিকারী হয়েছ। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা থেকে তোমরা আহার করবে।” [সূরা যুখরুফ ৬৮-৭৩]

তিনি অন্য জায়গায় বলেন: “নিশ্চয় সাবধানীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে-বাগানসমূহে ও ঝরনারাজিতে, ওরা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমি বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই ঘটবে ওদের; আর আয়াতলোচনা হুরদের সাথে তাদের বিবাহ দেব। সেখানে তারা নিশ্চিন্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে। (ইহকালে) প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। (এ প্রতিদান) তোমরা প্রতিপালকের অনুগ্রহস্বরূপ। এটাই তো মহাসাফল্য।” [সূরা দুখান ৫১-৫৭]

আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: “পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দের সজীবতা দেখতে পাবে। তাদেরকে মোহর আঁটা বিশদ্ধ মদিরা হতে পান করানো হবে। এর মোহর হচ্ছে কস্তুরীর। আর তা লাভের জন্যই প্রতিযোগিতারা প্রতিযোগিতা করুক। এর মিশ্রন হবে তাসনীমের (পানির)। এটা একটি প্রস্রবণ, যা হতে নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পান করবে।” [সূরা মুত্বাফিফীন ২২-২৮]

এ মর্মে আরো অনেক আয়াত রয়েছে। এখানে কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল:

১) জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “জান্নাতবাসীরা জান্নাতের মধ্যে পানাহার করবে; কিন্তু পেশাব-পায়খানা করবে না, তারা নাক ঝরাবে না, পেশাবও করবে না। বরং তাদের ঐ খাবার ঢেকুর ও কস্তুরীবৎ সুগন্ধময় ঘাম (হয়ে দেহ থেকে বের হয়ে যাবে)। তাদের মধ্যে তাসবীহ ও তাকবীর পড়ার স্বয়ংক্রিয় শক্তি প্রক্ষিপ্ত হবে, যেমন শ্বাসক্রিয়ার শক্তি স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে।” [মুসলিম ২৮৩৫, আবূ দাউদ ৪৭৪১]

২) আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন: “মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য জিনিস প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ন শ্রবন করেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার; যার অর্থ,“কেউই জানে না তার জন্য তার কৃতকর্মের বিনিময় স্বরূপ নয়ন-প্রীতিকর কী পুরস্কার লুকিয়ে রাখা হয়েছে।” [সূরা সাজদাহ ১৭] [সহীহুল বুখারী ৩২৪৪, ৪৭৭৯,৪৭৮০]

৩) উক্ত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “জান্নাতে প্রথম প্রবেশকারী দলটির আকৃতি পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মত হবে।তারপর তাদের পরের দলটি আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় জ্যোতির্ময় হবে। তারা জান্নাতে পেশাব করবে না, থুথু ফেলবে না, নাক ঝাড়বে না। তাদের চিরুনী হবে স্বর্ণের। তাদের ধুনুচিতে থাকবে সুগন্ধ কাঠ। তাদের স্ত্রী হবে আয়াতলোচনা হুরগণ। তারা সকলেই একটি মানব কাঠামো, আদি পিতা আদমের আকৃতিতে হবে (যাদের উচ্চতা হবে) ষাট হাত পর্যন্ত।” (সহীহুল বুখারী ৩২৪৫, ৩২৪৬, ৩২৫৪, ৩৩২৭)

মুমিন জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য জান্নাত। দুনিয়ার জীবনে মুমিন যা কিছুই করে, সকল কাজের লক্ষ্যই হলো তার স্রষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং এর বিনিময়ে মানবজাতির চিরস্থায়ী আবাস জান্নাত অর্জনের।

১) জান্নাতুল ফেরদাউস: ফেরদাউস এমন বাগানকে বলা হয়, যাতে সব ধরনের গাছপালা এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তার সবই এক জায়গায় এখানে পাওয়া যায়। জান্নাতগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত হচ্ছে জান্নাতুল ফেরদাউস। এ জান্নাতের ওপর আল্লাহর আরশ অবস্থিত। আল্লাহ নিজ হাতে এটি তৈরি করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তিনটি জিনিস নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আদমকে তাঁর হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাওরাত কিতাব নিজ হাতে লিখেছেন এবং ফেরদাউস নিজ হাতে স্থাপন করেছেন।’ (দায়লামি)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস।’ (সূরা কাহাফ: ১০৭)।

(২) জান্নাতুন নাঈম: নাঈম অর্থ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, দান-নেয়ামত। জান্নাত খাদ্য-পানীয়, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অবাধ স্বাধীনতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের নেয়ামতে পরিপূর্ণ, তাই নাঈম নামে নামকরণ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় মোত্তাকিদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত।’ (সূরা কলম : ৩৪)।

(৩) জান্নাতুল মাওয়া: মাওয়া শব্দের অর্থ ঠিকানা বা প্রকৃত আশ্রয়স্থল। নেককার ও শহীদদের রুহগুলো এখানে এসে আশ্রয় নেবে, এখান থেকে তারা আর বাইরে বের হবে না। এ জন্য এর নামকরণ করা হয় ‘জান্নাতুল মাওয়া’।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যারা ঈমান আনবে ও নেক আমল করবে তাদের জন্য তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া।’ (সূরা সাজদাহ : ১৯)।

(৪) জান্নাতুল আদন : আদন অর্থ কোনো স্থানে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বসবাস করা ও চিরঞ্জীব। জান্নাত যেহেতু চিরস্থায়ী আবাস, কখনো শেষ হবে না, তাই এ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জান্নাতুল আদন, তারা তাতে প্রবেশ করবে, যার তলদেশে ঝরনাগুলো বয়ে গেছে। তারা যা চাইবে তাদের জন্য সেখানে তাই রয়েছে, এভাবেই আল্লাহ মোত্তাকিদের পুরস্কার দিয়ে থাকেন।’ (সূরা নাহল : ৩১)।

(৫) দারুস সালাম: দারুস সালাম অর্থ শান্তির ঘর। যেহেতু জান্নাতে থাকবে শান্তি ও নিরাপত্তা, সেখানে অশান্তির কিছু থাকবে না এবং তারা পরস্পরে সালাম বিনিময় করবে। আল্লাহ ও ফেরেশতারাও সালাম জানাবে, তাই একে দারুস সালাম বা নিরাপত্তা ও শান্তির ঘর বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহ (দারুস সালাম) শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন সরল পথের দিকে।’ (সূরা ইউনুস : ২৫)।

(৬) দারুল খুলদ: খুলদ শব্দের অর্থ স্থায়ী হওয়া। জান্নাতিরা সেখানে চিরস্থায়ী হবে, কখনো বের হবে না, তাই জান্নাতিদের অবস্থার আলোকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাতে শান্তির সঙ্গে প্রবেশ করো, এটাই (খুলদ) স্থায়িত্বের দিন।’ (সূরা কাফ : ৩৪)।

(৭) দারুল মাকাম: দারুল মাকাম অর্থ স্থায়ী আবাসের বাড়ি। জান্নাত হচ্ছে প্রকৃত স্থায়ী আবাসের বাড়ি, এখান থেকে কাউকে কখনো উচ্ছেদ করা হবে না। তাই এ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের (দারুল মাকাম) স্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোনো কষ্ট আমাদের স্পর্শ করে না এবং কোনো ক্লান্তিও আমাদের স্পর্শ করে না।’ (সূরা ফাতির : ৩৫)।

(৮) দারুল কারার: দারুল কারার অর্থ স্থায়ী আবাস, যার শুরু আছে কিন্তু কোনো শেষ নেই। আখেরাতে বিচার-ফয়সালার পর জান্নাতে বসবাস শুরু হবে আর কোনো দিন তা শেষ হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমার কওম, এ দুনিয়ার জীবন শুধু ক্ষণকালের ভোগ; আর নিশ্চয়ই আখেরাত হলো (দারুল কারার) স্থায়ী আবাস।’ (সূরা গাফির : ৩৯)।

আল্লাহ সকল মু’মিনদের ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জান্নাত নাসিব করুন। আমিন!

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close