Featuredইসলাম থেকে

ঈদুল আজহা ও কুরবানীর আহকাম

আজ শুক্রবার! পবিত্র জুমাবার! ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ মেনে আসছে ঈদুল আজহা কিভাবে উদযাপন করবেন, সে বিষয়ে পাঠকদের জন্য বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন শীর্ষবিন্দু নিউজের ইসলাম বিভাগের প্রধান- ইমাম মাওলানা এম নুরুর রহমান।

ঈদুল আজহার দিন সকালে জামা‘আতের সাথে ঈদের দুই রাক‘আত নামায পড়া প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন পুরুষের উপর ওয়াজিব। মেয়েদের উপর ঈদের নামায নেই।

ঈদের নামায পড়ার নিয়ম: প্রথমে কান বরাবর উভয় হাত তুলবেন। তারপর এভাবে নিয়ত করবেন, “আমি ঈদুল ঈদুল আযহার দুই রাক‘আত ওয়াজিব নামায এই ইমামের পিছনে পড়ছি।” অতঃপর তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত নাভির নিচে বাঁধবেন এবং ছানা পড়বেন। তারপর আরো তিনবার তাকবীর বলবেন এবং প্রথম দুই তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিবেন। এরপর তৃতীয়বার হাত কান পর্যন্ত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বেঁধে চুপ করে ইমামের কিরাআত শ্রবণ করবেন।

এভাবে প্রথম রাক‘আত আদায়ের পর দ্বিতীয় রাক‘আতের কিরাআতের পর তিনবার হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে প্রত্যেকবার তাকবীর বলে হাত ছেড়ে দিবে। এরপর চতুর্থবার হাত না তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে রুকুতে যাবেন এবং অবশিষ্ট নামায অন্যান্য নামাযের ন্যায় সম্পন্ন করবেন। (ফাতাওয়া শামী, ১ম খ-, ১৭২ পৃষ্ঠা)
.
ঈদুল আজহায় পালনীয় সুন্নাতসমূহ
১. অন্য দিনের তুলনায় সকালে ঘুম থেকে উঠা।
২. মিসওয়াক করা।
৩. গোসল করা।
৪. শরী‘আত সম্মত সাজ-সজ্জা করা।
৫. সামর্থ অনুযায়ী উত্তম পোষাক পরিধান করা। তবে সুন্নাত আদায়ের জন্য নতুন পোষাক জরুরী নয়।
৬. সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৭. কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া। এরপর ঈদের নামায পড়ে নিজের কুরবানীর গোশত দ্বারা আহার করা মুস্তাহাব।
৮. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া।
৯. ঈদের নামায ঈদগাহে আদায় করা সুন্নাত। বিনা উজরে মসজিদে আদায় করা উচিত নয়।
১০. এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা।
১১. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া।
১২. ঈদগাহে যাওয়ার সময় এই তাকবীর উচ্চস্বরে পড়তে থাকা :
اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ وَلِله الحَمْدُ
১৩. ঈদের নামাযের পর সুন্নাত তরীকা অনুযায়ী দু‘আ পড়ে কুরবানী করা।
.
কুরবানীর আবশ্যকীয় আহকাম
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। এ সম্পর্কে হযরত মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা আরাফাহ ময়দানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন তাকে ইরশাদ করতে শুনেছি, “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই প্রত্যেক পরিবারের উপর প্রত্যেক বছর কুরবানী দেয়া অপরিহার্য।”
(সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১২৫)

তেমনি হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন–“যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে, কিন্তু কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে।”
(মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৩৫১৯)
.
কুরবানী সহীহ-শুদ্ধভাবে আদায় করা কর্তব্য। এখানে কুরবানীর কিছু জরুরী মাসায়িল উল্লেখ করা হলো-

➤ প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী–যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবেন, তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
নিসাব হলো, স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি এবং টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো–এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।

➤ টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু সবকিছু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব হবে।
(ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, ১৭ খ-, ৪০৫ পৃষ্ঠা)

➤ কুরবানীর ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব পুরো বছর থাকা জরুরী নয়; বরং কুরবানীর তিনদিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।

➤ মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম।

➤ নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রƒপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, তারা নিসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তাদের অভিভাবক নিজেদের সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।

➤ দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু কোন দরিদ্র ব্যক্তি যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনেন, তাহলে তা কুরবানী করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে যায়।

➤ কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারেন, তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব হবে। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিলেন, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি, তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবেন।

➤ ৫ প্রকার পশু (নর ও মাদী) দ্বারা কুরবানী করা যাবে : উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। উট কমপক্ষে ৫ বছর, গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছর আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে।

তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কম হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।
কিন্তু ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না।

➤ যে পশুর একটি পা নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে চলার সময় সেটা দ্বারা সাহায্য নিতে পারে না, তা দ্বারা কুরবানী দরস্ত হবে না। শিং-এর গোড়া দিয়ে ভেঙ্গে যদি মগজে ক্ষতি পৌঁছে, তাহলে কুরবানী হবে না। দাঁত মোটেও না উঠলে অথবা অর্ধেকের বেশী পড়ে গেলে, তা দ্বারা কুরবানী হবে না। কান বা লেজের তিনভাগের একভাগ-এর বেশী কাটা গেলে তা দ্বারা কুরবানী হবে না।

➤ একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবেন। কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবেন। সাতের অধিক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। আবার কারো অংশ এক সপ্তমাংশের অনুপাতের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।

➤ কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবেন। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।

➤ কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবেন। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো।

➤ অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়েন, তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না।

➤ শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে সমভাবে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে বা বেশকম করে ভাগ করা জায়িয নয়।

➤ কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকিনকে, এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেয়া এবং এক তৃতীয়াংশ নিজেরা খাওয়া উত্তম। অবশ্য জরুরতের কারণে পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয়, তাতেও কোনো গুনাহ হবে না।

➤ কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়িয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে।

আল্লাহু আ’লাম

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close