Featuredইসলাম থেকে

কুরবানী (আরাবী قربانى‎‎)

আজ পবিত্র ঈদ উল আযহা! সকল পাঠককে জানাই ‘ঈদ মোবারক’!

একই সাথে আজ শুক্রবার! পবিত্র জুমাবার! ধর্মপ্রাণ সকল মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ মেনে আজ ঈদ উল আজহার দিনে আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে পশু কুরবানী করবেন, এই বিষয়ে পাঠকদের জন্য বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন শীর্ষবিন্দু নিউজের ইসলাম বিভাগের প্রধান- ইমাম মাওলানা এম নুরুর রহমান।

কুরবানী (আরাবী قربانى‎‎), কুরবান অথবা আদ্বহা বা আযহা ( أضحية) কে ইসলামী আইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা ঈদ আল আযহা সময় পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান। কুরবানী শব্দটি হিব্রু কোরবান আর সিরিয়াক ভাষার কুরবানা শব্দদুটির সংগে সম্পর্কিত যার আরবী অর্থ ‘কারো নিকটবর্তী হওয়া’। ইসলামি মতে কুরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। মুসলমানদের পবিত্র আল কোরআনের তিনটি স্থানে কুরবানির উল্লেখ আছে যার একটি পশু কুরবানির ক্ষেত্রে এবং বাকি দুটি সাধারণ ভাবনার কাজ বোঝাতে যা দ্বারা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। ঈদ উল আযহার নির্দিষ্ট দিনের বাইরে খাওয়ার জন্যে পশুহত্যা কে ইসলামে জবেহ বলা হয়ে থাকে।

কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন, কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন,

﴿ ۞وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَيۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانٗا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ يُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡأٓخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [المائ‍دة: ٢٧]
অর্থাৎ, আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবূল করে থাকেন।[সূরা মায়িদা (৫):২৭]।

মূল ঘটনা হলো: যখন আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া (আ.) এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীস (আ.) ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া আদম (আ.) এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.) এর শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় আদম (আ.) একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল পরমা সুন্দরী। তার নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। সে ছিল কুশ্রী ও কদাকার। তার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী ‘নিয়মানুযায়ী হাবীলের সহোদরা কুশ্রী বোন কাবীলের ভাগে পড়ল। ফলে আদম (আ.) তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষি তে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে তার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে বকাঝকা করলেন। তবুও সে ঐ বকাঝকায় কান দিল না। অবশেষে আদম (আ.) তার এ দু‘সস্তান হাবীল ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।’ সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত। যাহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভাল ভাল মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হাবীল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবীলের কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। [ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবীলের পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে ইসমাঈল যাবিহুল্লাহ (আ.) কে ঐ দুম্বাটি পাঠিয়ে বাঁচিয়ে দেয়া হয়।] আর কাবীলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হাবীলেরটি গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না। কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। হাবীল বলেছিল, ‘ তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়?…..তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হাবীল কে হত্যা করে ফেলল। (তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

কুরআনে বর্ণিত হাবীল ও কাবীল কর্তৃক সম্পাদিত কুরবানীর এ ঘটনা থেকেই মূলত কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরবানী দাতা ‘হাবীল’, যিনি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্যে একটি সুন্দর দুম্বা কুরবানী হিসেবে পেশ করেন। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়। পক্ষান্তরে কাবীল, সে অমনোযোগী অবস্থায় কিছু খাদ্যশস্য কুরবানী হিসেবে পেশ করে। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়নি। সুতরাং প্রমাণিত হলো কুরবানী মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবূল হয় না। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপরে এটা জারি ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُۥٓ أَسۡلِمُواْۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُخۡبِتِينَ ٣٤ ﴾ [الحج: ٣٤]

অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। [সূরা হাজ্জ (২২):৩৪]

বস্তুত মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানি হযরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল এর দেয়া কুরবানি থেকেই কুরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়। যেমন- পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “হে রাসূল আপনি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানি করেছিল। তাদের একজনের কুরবানি কবুল হলো। অন্যজনের কুরবানি কবুল হলো না।” (সুরা মায়েদা ২৭) অবশ্য আমাদের উপর যে কুরবানির বিধান প্রচলিত হয়ে আসছে তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর রাহে যে কুরবানি করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা দৃষ্টান্তহীন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের কথা। স্বপ্নাদৃষ্ট হলেন আল্লাহর প্রিয় খলিল হযরত ইবরাহীম (আঃ) কুরবানি করতে। তিনি পশু কুরবানি করলেন একটির পর একটি। কিন্তু সে কুরবানি তার প্রতিপালকের নিকট গৃহীত হলো না।

হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্দেশ পেলেন এমন বস্তু কুরবানি করতে যা তার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কী সেই প্রিয় জিনিস? হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তো স্বীয় পুত্র ইসমাঈল। তবে কি তার মহান প্রভু ইবরাহীম ও হাজেরার পরম আদরের সন্তান ইসমাইল এর কুরবানি চান? আল্লাহর আদেশ ছিল অতি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

সন্দেহেরও কোন অবকাশ ছিল না তাতে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্তম্ভিত না হয়ে আল্লাহর আদেশের কথা পুত্র ইসমাইলকে জানালেন। জবাবে পুত্র ইসমাইল বললেন, “হে আমার প্রিয় পিতা, আপনি যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন তা সন্তুষ্টির জন্য আপনি তা পালন করুন। ইনশাল্লাহ্ আপনি আমাকে সবুরকারীদের মধ্যে পাবেন।” (সুরা সাফ্ফাত ১০২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ) উভয়েই আল্লাহর হুকুম পালনে অবিচল সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। মা হাজেরাও স্বেচ্ছায় আদরের সন্তানকে সাজিয়ে দিলেন। পিতামাতা পুত্রের আল্লাহর পথের কুরবানির এ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম। বালক ইসমাইলকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) নিয়ে গেলেন মিনায় (বর্তমান হাজীদের কুরবানির স্থান)। যখন প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করতে উদ্যত হলেন সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীদ্বয়ের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের কুরবানি কবুল করলেন। আনুগত্য ও কর্তব্য পরায়ণতার পুরস্কার স্বরূপ একটি মোটা তাজা পশু (দুম্বা) পাঠিয়ে পুত্রের পরিবর্তে জবাই করার হুকুম প্রদান করলেন।

বস্তুতঃ ইবরাহীম (আঃ) এর পুত্র কুরবানি দেয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত করে রাখার জন্যই উম্মতে মোহাম্মদীর উপর তা ওয়াজিব করা হয়। সেই থেকে সারা বিশ্বে ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ উদ্যাপিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদুল আযহা তথা কুরবানি এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে আছে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close