Featuredস্বদেশ জুড়ে

হেফাজতের নাটকীয় পরিবর্তন

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা: হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছিলেন কওমি আঙ্গিনায় সবচেয়ে সম্মানিত নাম। হেফাজতে তার কথাই ছিল শেষ কথা। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে থাকে।

পরিস্থিতির এই পরিবর্তন একেবারে নাটকীয় ছিল না। অথচ এক সময় এটা কল্পনাও করা যেতো না। একদিকে তার বয়স বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, ছেলে আনাস মাদানীর প্রভাব বাড়তে থাকে। কওমিপাড়ায় যার সমালোচক অনেক। দুর্নীতি, অনিয়ম ও নির্যাতনসহ তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে আল্লামা শফীর। যার পরিণতিতে গত জুনে তাকে হেফাজত হেডকোয়ার্টার থেকে আউট হয়ে যেতে হয়। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠেন কওমিপন্থী তরুণরা। বাদ-বিবাদে জড়ান তারা। বিশেষ করে আনাস মাদানীসহ আল্লামা শফীর কয়েকজন অনুসারী ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রে। তারই চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে বুধবার দুপুর থেকে উত্তাল হতে থাকে হাটহাজারী মাদ্রাসা।

আনাস মাদানীর অপসারণসহ কয়েক দফা দাবিতে শুরু হয় বিক্ষোভ। খুব বেশি বিস্ময় তৈরি না করে দাবিতে এটাও দেখা যায়, বয়োবৃদ্ধ আহমদ শফীকে অপসারণ করে যোগ্য ব্যক্তিকে যেন হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। রাতে আনাস মাদানীকে অপসারণের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

তবে গতকালও দিনভর বিক্ষোভ হয়েছে সেখানে। সন্ধ্যার দিকে মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। সবমিলিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ১৩ দফার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া হেফাজতে ইসলাম গত কয়েক বছর ধরেই নানা কারণে আলোচনায় ছিল। প্রায় সব মহলই হেফাজতকে কাছে টানার চেষ্টা করেছে। দেশে-বিদেশে অনেকের দৃষ্টিই ছিল সংগঠনটির দিকে। কার হেফাজতে হেফাজত এ প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে বারবার।

কিন্তু হেফাজত সদর দপ্তরে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর সংগঠনটির ভবিষ্যতের প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। কোন্‌ পথে যাচ্ছে হেফাজত? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, হেফাজত ধীরে ধীরে কার্যত দু’ ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী, অন্যভাগের নেতৃত্বে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। হাটহাজারীর ঘটনা যে বিভক্তিকে আরো সামনে নিয়ে এসেছে।

যদিও জুনায়েদ বাবুনগরীকে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে অপসারণের পরও পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয় একবার। বাবুনগরী ও আনাস মাদানীর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যে বৈঠকে দু’ জনে সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি আদতে যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে যায়। বরং আরো খারাপ হয়েছে।

হেফাজত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আদর্শগতভাবেই হেফাজতে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। মৌলিক ইস্যুতে আহমদ শফী এবং জুনায়েদ বাবুনগরীর চিন্তাধারায় ফারাক তৈরি হয়েছে। বাবুনগরীর সমর্থকদের অভিযোগ, অত্যধিক পুত্র স্নেহ আহমদ শফীকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। দীর্ঘদিন ধরেই ছেলে যা বলছে তিনি তাই করছেন। আর ছেলে আনাস মাদানী জড়িয়ে পড়েছেন নানা অনিয়ম ও নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে।

অন্যদিকে, আল্লামা শফী সমর্থকদের অভিযোগ, জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতকে সরকারের সঙ্গে দান্দ্বিক অবস্থানে নিয়ে যেতে চান। ভুল পথে পরিচালিত করতে চান সংগঠনটিকে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সব মিলিয়ে হেফাজত এখন বিভক্তির পথে। যে কসমেটিক্স ঐক্য রয়েছে তাও হয়তো বেশিদিন টিকবে না। যদিও সংগঠনটির ভেতরে অনেকেই এখনো দাবি তুলছেন, শীর্ষ আলেমরা বসে যেন বিভেদ মিটিয়ে নেন।

ছাত্রদের বিক্ষোভে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে বুধবার রাতে মাদ্রাসার শূরা কমিটি মাওলানা আনাস মাদানীকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষাসচিব, মাদরাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীর ছেলে। সেই সঙ্গে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক।

বিক্ষোভের শুরু থেকেই ছাত্ররা মাদ্রসার মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিলে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় মাদ্রাসার বাইরে গেটের সামনে অবস্থান নেন র‍্যাব ও পুলিশের সদস্যরা।

হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এর আগে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী তিনি মাদরাসার মুহতামিম পদ ছেড়ে দেন।গত দুই দিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। এসময় মাদরাসায় অবস্থান করা আহমদ শফী অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত হাটহাজারী খাগড়াছড়ি মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হেফাজত নেতাকর্মীরা কঠোর অবস্থানে ছিলেন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close