Featuredইসলাম থেকে

যিনা বা ব্যভিচার এর বিধান কি?

আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘যিনা বা ব্যভিচার’। ইসলাম ধর্মে ‘যিনা বা ব্যভিচার এর বিধান’ কি ও নিজের অজান্তে কিভাবে একজন মুসলিম এই কাজে লিপ্ত হয়ে যান তা নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। একজন মুসলিম ইসলামী রীতিনীতি মেনে সুন্দর জীবন গঠন করতে কি কি করা জরুরী এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান। ‘ইসলাম থেকে’ বিভাগ প্রধান, শীর্ষবিন্দু নিউজ।

যিনাʾ (زِنَاء) বা জিনা (زِنًى বা زِنًا) হল অবিবাহিত দুইজন মানুষের মধ্যে যৌনক্রিয়া। ব্যুৎপত্তিগতভাবে: যিনা হল ইসলামী বৈবাহিক নিয়ম অনুযায়ী পরস্পর অবিবাহিত একাধিক মুসলিমের মাঝে অবৈধ যৌন সম্পর্ক বিষয়ক একটি ইসলামী নিষেধাজ্ঞা।বিবাহোত্তর যৌনতা এবং বিবাহপূর্ব যৌনতা। যেমন: পরকীয়া (পারস্পারিক সম্মতিতে বিবাহিতের অবৈবাহিক যৌন সম্পর্ক), ব্যভিচার (দুজন অবিবাহিতের পারস্পারিক সম্মতিতে যৌনসঙ্গম) পতিতাবৃত্তি (অর্থের বিনিময়ে যৌনসঙ্গম), সমকামিতা (সমলিঙ্গীয় ব্যক্তিদ্বয়ের পারস্পারিক সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক) সডোমি (পায়ুসঙ্গম ও মুখমৈথুন), অজাচার (পরিবারের সদস্য বা অবিবাহযোগ্য রক্তসম্পর্কের ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসঙ্গম), পশুকামিতা (অমানব পশুর সঙ্গে যৌনসঙ্গম) এবং ধর্ষণ (জোরপূর্বক অবৈবাহিক যৌনসঙ্গম) এর অন্তর্ভুক্ত। যিনা কবিরা গুনাহ যা তাওবাহ ব্যাতিরেকে মাফ হয় না। কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, ”লা তাকরাবাল যিনা” যার অর্থ “তোমরা যিনার ধারে-কাছেও যেও না।”

যিনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যে বিষয়গুলো রয়েছে তা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে তবে জীবনের যে দুইটি পর্যায়ে এগুলো সংঘটিত হয় তা হলো বিবাহের পূর্বে যৌনক্রিয়া (অবিবাহিত পুরুষ ও নারীর মাঝে যে যৌনক্রিয়া সংঘটিত হয়) এবং বিবাহের পরের যৌনক্রিয়া ( অর্থাৎ বিবাহিত পুরুষ ও নারীর মাঝে সংঘটিত যৌনক্রিয়া, যারা একে ওপরের সঙ্গে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ নয়)। এগুলো ছাড়াও আরো বিভিন্ন ভাবে যৌনকর্মের মাধ্যমে যিনা হয়ে থাকে যেমন: পরকীয়া- বিবাহিতদের অবৈবাহিক যৌন সম্পর্ক, পতিতাবৃত্তি- অর্থ বা অন্য যেকোনো কিছুর বিনিময়ে যৌনসঙ্গম, সমকামিতা- সমলিঙ্গীয়দের যৌন সম্পর্ক, অজাচার- পরিবারের সদস্য বা রক্তের সম্পর্ক আছে এমন কারো সঙ্গে যৌনসঙ্গম, পশুকামিতা- পশুর সঙ্গে যৌনসঙ্গম, ধর্ষণ- জোরপূর্বক যে যৌনসম্পর্ক করা হয় ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। যিনা বা ব্যভিচারের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃন্য ও জঘন্যতম ব্যভিচার হচ্ছে মাহরাম অর্থাৎ মা, বোন, খালা, সৎ মা, মেয়ে অর্থাৎ চিরনিষিদ্ধ নারী বা মহিলাদের সঙ্গে সংগম করা।

এছাড়াও ইসলামের ইতিহাসে কোনো পুরুষের সঙ্গে দাসীর যৌনকর্মও যিনার অন্তর্ভুক্ত, যদি না দাসী ওই পুরুষের নিজের সম্পত্তি হয়। এছাড়াও চুম্বন, বিভিন্ন অঙ্গে স্পর্শ ও আলিঙ্গন, স্পর্শকাতর আদর, হস্তমৈথুন, মুখমৈথুন ইত্যাদি যেকোনো ধরনের যৌনক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যিনার পরোক্ষ প্রকরণ হিসেবে ধরা। নবীজী (সা.) দেহব্যবসায়ী ও দেহ ব্যবসা করে উপার্জিত অর্থ সম্পর্কে বলেন, ‘কুকুর বিক্রি করে উপার্জিত অর্থ যেমন নিকৃষ্ট, তেমনি নিকৃষ্ট যেনাকারিনীর উপার্জিত অর্থ।’ (মুসলিম শরীফ)

ইসলামে যিনাকারীদের জন্য যেমন পৃথিবীতে রয়েছে কঠিন শাস্তি তেমনি পরকালে রয়েছে অনন্তকালের জাহান্নামের আগুন। পৃথিবীতে একজন যিনাকারীর শাস্তি হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত পুরুষ ও নারী যারা, তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর, তাদের এই বিষয়ের করুণা যেন তোমাদেরকে দুর্বল না করে, এমন বিষয়ে যা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং মহাপ্রলয় দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখো এবং বিশ্বাসীদের একদলকে তাদের শাস্তির সাক্ষী করে রাখো।’ (সূরা- আন-নুর: আয়াত- ২)

লুত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের দশটি কারণের অন্যতম একটি কারণ ছিল সমকামীতা যা তাদের আগে কোনো সম্প্রদায় করেনি। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র আল কোরআনে বলেন, ‘লুত তার সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা যা করছ এমন অশ্লীল কাজ তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি, তোমরা নারীদের পরিবর্তে পুরুষদের দ্বারা যৌনবাসনা পূরণ কর; রাহাজানী কর এবং নিজ মজলিসে গর্হিত কাজ কর? জওয়াবে তার সম্প্রদায় কেবল এ কথাই বলল, যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহর আযাব আন।’ (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত -২৯)

স্বমেহন বা হস্তমৈথুনকারী, মুখমৈথুনকারী এরা আরেক শ্রেনীর যিনাকারী। এই শ্রেনীর লোকদের ওপর রাসূলের লানত রয়েছে। হাত, পা, জিহ্বা ইত্যাদি অঙ্গের মাধ্যমে এসব গর্হিত কাজ এবং বিভিন্ন খারাপ কাজ করার ফল সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যেদিন তাদের কৃতকর্মের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও পা সাক্ষী দিবে।’ (সূরা আন নূর, আয়াত-২৪)

যিনা করা কবিরা গুনাহ যে গুনাহ তাওবা ছাড়া মাফ হয় না। যিনা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
‘তোমরা যিনার কাছেও যেও না। কেননা তা অত্যন্ত অশ্লীল এবং খারাপ কাজ।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-৩২)

এছাড়াও বিভিন্ন সহীহ হাদীসে নবীজীর বক্তব্য এভাবে এসেছে যে, ‘কোনো পরনারীর প্রতি নজর দেয়া চোখের যিনা, যৌনতা সম্পর্কিত অশ্লীল কথাবার্তা জিহ্বার যিনা, অবৈধ সম্পর্কের কাউকে স্পর্শ করা হচ্ছে হাতের যিনা, ব্যভিচার করার উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাওয়া পায়ের যিনা, খারাপ অশ্লীল কথা শোনা কানের যিনা এবং মনের মাধ্যমে কল্পনা ও আকাংখা করা মনের যিনা। অত:পর লজ্জাস্থান এই চাহিদার পূর্ণতা দেয় অথবা অসম্পূর্ণ রেখে দেয়।’ (সহীহ বুখারী শরীফ, সহীহ মুসলিম শরীফ, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে আন-নাসায়ী)

যিনা বা ব্যভিচারের কঠিন শাস্তির কথা পবিত্র কোরআন ও হাদীস সমূহে উল্লেখিত আছে। যিনার সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে কঠিন বিধান রয়েছে। যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে হজরত মুহম্মদ (সা.) এর হাদিস বর্ণিত আছে যে, ‘আমি একদিন স্বপ্নে একটি চুলা দেখতে পেলাম যার ওপরের দিক ছিল সরু এবং ভেতরের দিক ছিল প্রশস্ত, যেখানে আগুন উত্তপ্ত হচ্ছিল এবং তার ভেতরে নারী পুরুষেরা চিৎকার করছিল। আগুনের শিখার উঠানামার সঙ্গে সঙ্গে তারাও উঠানামা করছিল, এ অবস্থা দেখে আমি জিবরাইল আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাইল আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উত্তর দিল, এরা হলো অবৈধ যিনাকারী নারী ও পুরুষ।’ (সহীহ আল-বুখারী)

আরো উল্লেখ আছে, ‘একজন ব্যভিচারী কেবল একজন ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে ছাড়া বিয়ে করবে না এবং একজন ব্যভিচারিণীকে কেবল একজন ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মুমিনদের ওপর এটা হারাম করা হয়েছে।’ (সূরা: আন-নূর, আয়াত: ৩)
নবী (সা.) যিনাকারীর শাস্তি বর্ণনা দেন যে, ‘একজন অবিবাহিত পুরুষ এবং একজন অবিবাহিত নারীর ব্যভিচারের ক্ষেত্রে, তাদেরকে একশত বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন পেতে হবে। আর যদি বিবাহিত পুরুষ বিবাহিত নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করে তাহলে তাদেরকে একশত বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে হবে।’ (সহীহ মুসলিম)

যিনাকারীর পরকালের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো যিনাকারী তওবা না করে মৃত্যুবরণ করে তাহলে তার স্থান হবে জাহান্নাম। নবী কারীম (সা.) বলেন, ‘যে আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিসের এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিসের নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহারের) দেবে আমি তার জন্য বেহেশতের নিশ্চায়তা দিব।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এবং মহান আল্লাহ তায়াল বলেন, ‘আর তারা সংযত রাখে নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহকে, তাদের স্ত্রী ও দাসী ছাড়া এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এগুলো ছাড়া অন্য কাউকে কামনা করলে তারা হবে সীমা লঙ্ঘনকারী। এবং যারা প্রতিশ্রুতি ও আমানত রক্ষাকারী; আর যারা নিজেদের ইবাদতে যত্নবান থাকে। তারাই হবে ফেরদাউসের উত্তরাধিকারী, যেখানে তারা স্থায়ী হবে।। আল্লাহু আ’লাম।

লেখক: ইমাম ও খতিব– মসজিদুল উম্মাহ লুটন, সেক্রেটারি– শরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড ও মিডল্যন্ড ইউকে। সত্যয়ানকারী চেয়ারম্যান- নিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে। প্রিন্সিপাল- আর রাহমান একাডেমি ইউকে, পরিচালক- আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close