Featuredজাতীয়

একজন অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েও নিতেন না বেতন

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা: আইনজীবী হিসেবে রফিক-উল হক সততা, নিষ্ঠা ও সমতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি একাগ্র চিত্তের মানুষ। দায়িত্বশীলও। কখনো তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দল বিবেচনায় নেননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষেও তিনি ওকালতি করেছেন। দুজনকেই তিনি সমভাবে ও সমদৃষ্টিতে দেখেছেন। আগ্রহ নিয়ে দুজনের মামলা পরিচালনা করেছেন।

আইনি অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক উল হক। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের পদে থেকেও বেতন নিতেন না ব্যারিস্টার রফিক উল হক।

বরং নিজের উপার্জন মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিতেন তিনি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনগণের সেবকের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। রফিক উল হকের স্মৃতিচারণ করে এসব কথা বলছেন আইনজীবীরা।

১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ব্যারিস্টার রফিক উল হক। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার অ্যাট ল সম্পন্ন করেন।

ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে রফিক উল হকের সঙ্গে পরিচয় হয় দেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলামের। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইংল্যান্ডে পড়াশোনার সময় তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সমসাময়িক সময়ে আমরা সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করি। অনেক দান করতেন। বিশেষ করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালেও তিনি অনেক অনুদান দিয়েছেন। সেদিক থেকে তাকে একজন দানবীরও বলা যেতে পারে।

সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রফিক উল হক বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি সবসময়ই হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন বলেও জানান ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম।

ব্যারিস্টার রফিক উল হক ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। এরপর জেনারেল এরশাদের আমলে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা, সে সময়কার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়কের আমলে দেওয়া মামলা পরিচালনা করতেও ব্যারিস্টার রফিকের অবদান উল্লেখযোগ্য বলেও জানান তিনি।

১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক উল হক। এ সময়ে তিনি কোনও সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনও কোনও রাজনৈতিক দল করেননি। তবে নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা তাকে পাশে পেয়েছেন।

বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘তিনি একাধারে নির্লোভ, নীতিবান ও সৎ মানুষ ছিলেন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে কোনও বেতন নেননি। অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তিনি নিজেকে সরকার নয়, জনগণের সেবক মনে করতেন। তার মৃত্যুতে আইন অঙ্গনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।

ব্যারিস্টার রফিক উল হক তার বর্ণাঢ্য জীবনে আইন পেশায় প্রায় ৬০ বছর পার করেছেন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই করেন তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার ছিলেন।  গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী।

আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন,  তিনি রাজনীতি করতেন না, তবে রাজনীতিবিদদের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। আইন অঙ্গনে তার সঙ্গে বহুবার আমার আলাপ হয়েছে। আলাপচারিতা থেকেই জেনেছি, তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও মনেপ্রাণে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী।

স্মৃতিচারণ করে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন,  তিনি অত্যন্ত ভদ্রলোক ছিলেন। ব্যারিস্টারি শেষ করে এসে তাকে আমরা আইন অঙ্গনে রফিক ভাই বলেই ডাকতাম। তিনিও আমাদের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন।

ব্যারিস্টার রফিক উল হককে গত ১৫ অক্টোবর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০ অক্টোবর রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান।

সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম বলেন, আইনের ব্যাপারে তার যেমন অগাধ জ্ঞান, তেমনি আইনকে তিনি আইনের দৃষ্টিতে দেখেছেন সবসময়। কোন দল দেখেননি। বিনে পয়সায়ও তিনি অনেকের মামলা পরিচালনা করেছেন। আদালতে তাকে খুব সামনে থেকে দেখেছি ও শুনেছি। তার যুক্তিতর্ক খুবই স্পষ্ট ও সাবলীল। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক যখন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তখনো তিনি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি।

রফিক-উল হক সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি সমসাময়িককালের একজন অত্যন্ত উঁচুমানের আইনজীবী যাকে বিচারক, আইনজীবীসহ এই পেশার সর্বস্তরের ব্যক্তিগণ শ্রদ্ধা সম্মানের চোখে দেখেন।

তিনি এই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা কোনো না কোনোভাবে পরিচালনা করেছেন। ওই সব মামলায় বিভিন্ন আইনের ইন্টারপ্রিটেশন (বিশদ ব্যাখ্যা) দেয়া হয়েছে এবং আইনের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দেশে ডেভেলপমেন্ট অব ল’তে আইনজীবী হিসেবে এক বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ব্যক্তি হিসেবেও তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহপরায়ণ।

রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি জীবনে অনেক টাকা উপার্জন করেছেন। আবার সেই অর্থ অনেক জনহিতকর ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত বিরল।

রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আইনজীবী হিসেবে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ওয়ান ইলেভেন সরকারের বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন মামলা পরিচালনা করেছিলেন। একজন স্পষ্টভাষী ও সাহসী মানুষ হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে।

তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে বেশকিছু বিরল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। যে দৃষ্টান্তগুলো উনার আগে বা পরে কেউ দেখাতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি- তখনকার সময়ে অনেককেই স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে ডিটেনশন দিয়ে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হতো। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে হেভিয়াস কর্পাস রিট দায়ের হতো।

সেসব ফাইল দেখে যদি তিনি বুঝতে পারতেন যে ডিটেনশন বৈধ হয়নি, রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কার্যতালিকার ওইসব মামলাগুলোর বিষয়ে আদালতকে অপেক্ষায় না রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আটকাদেশ বৈধ হয়নি উল্লেখ করে তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলতেন। এ রকম স্বচ্ছতা অন্য কোনো অ্যাটর্নি জেনারেল দেখাতে পারেননি।

শুধু তাই নয়, অন্যান্য রিট পিটিশনের ক্ষেত্রেও তিনি যদি দেখতেন যে সরকারি আদেশ বেআইনি সেখানেও তিনি আদালতে কোনোরূপ ভনিতা না করে তা স্বীকার করে নিতেন। আমি শুনেছি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার যে প্রাপ্য বেতন ছিল, তাও গ্রহণ করেননি। এটিও বিরল দৃষ্টান্ত।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close