Featuredইসলাম থেকে

কোরআন-হাদিসের আলোকে নামাজের গুরুত্ব

শিহাবুজ্জামান কামাল: নামাজ একটি ফার্সি শব্দ। আরবি ভাষায় নামাজকে ‘সালাত’ বলা হয়। ইসলামের ৫টি স্তম্ভ বা খুটি রযেছে। যা হল কলিমা, নামাজ, রোজা, হজ এবং জাকাত। আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং নামাজের পর রোজা, হজ ও জাকাতের বেলা ইসলামে কিছু শর্ত রয়েছে।

যারা শারীরিক ভাবে দুর্বল তাদেরকে রোজা রাখার ব‍্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে এহসান করা হয়েছে। যারা গরীব এবং যাদের অস্বচ্ছল অবস্থা। তাদের বেলা হজ্ব ও জাকাতের হুকুম নেই। জাকাত এবং হজ্ব শুধু যারা অর্থশালী ও বিত্তবান রয়েছেন তাদের জন্য। কিন্ত নামাজ হচ্ছে এমন একটি ইবাদত, যা ধনী-গরীবসহ প্রত‍্যেক বয়সপ্রাপ্ত মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।

মহান আল্লাহ পাকের কাছে নামাজ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। আল্লাহ্ পাকের নিকট নামাজের চেয়ে প্রিয় ইবাদত আর কিছু নাই। আল্লাহ্পাক আমাদের উপর দিনরাত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয করেছেন।

যারা দৈনিক এই পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাজ আদায় করবে পরকালে সেই নামাজিরা বেহেশতের উত্তম স্থানে অবস্থান করবে এবং যারা নামাজ পড়বেনা তারা জাহান্নামের নিকৃষ্টতম স্থানে অবস্থান করবে।

হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ভালভাবে ওযু করে ভয় ও যত্ন সহকারে রীতিমত নামাজ আদায় করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্পাক তাঁদের সমস্ত সগীরা গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন এবং বেহেশতের উত্তম জায়গায় স্থান দিবেন।

“আসসালাতু ইমাদুদ্বীন”
নবী করীম সাঃ বলেছেন, “নামায হল দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ বা খুঁটি স্বরূপ”। অর্থাৎ খুটি ছাড়া যেমন কোন বাড়ি-ঘর তৈরি হয় না বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। ঠিক তেমনি ভাবে নামায নামক খুঁটি ছাড়া দ্বীন-ইসলাম ঠিকে থাকতে পারেনা।

যে ঠিকমত নামায কায়েম করল, সে ইসলামকে ঠিকিযে রাখতে সাহায্য করল। আর যে নামাজ কায়েম করল না সে যেন ইসলামকে ধ্বংস করে দিল। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্পাক মানুষের কাছ থেকে সর্ব প্রথম নামাযের হিসাব নিবেন। কেয়ামতের দিন নামাযী ব্যক্তির হাত, পা, মুখমন্ডল সূর্যের আলোর মত উজ্জল হবে। কিন্তু যারা বেনামাজি তাদের মুখমন্ডলে কোন আলো থাকবেনা এবং তারা জাহান্নামে পতিত হবে।

হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের ময়দানে নামাজিগণ নবী, শহীদ ও অলীগণের সঙ্গি হবেন এবং বেনামাজিরা, ফেরাউন, সাদ্দাদ, হামান, কারূনের এবং আরও বড় বড় কাফেরদের সাথে থাকবে।

তাই প্রত্যেক বযসপ্রাপ্ত মুসলিম নর-নারীর জন্য নামায পড়া ফরজ। কেউ যদি নামায না পড়ে তাহলে তাকে দুনিয়া এবং আখেরাতে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। নামাজ কারোর জন্য মাফ নাই। কোন অবস্থায়ই নামায তরক করা যাবেনা। যারা রুগ্ন, খোড়া, বধির, অন্ধ, আতুর অর্থাৎ যে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই নামায আদায় করতে হবে।

পবিত্র কোরআনে নামাজের ব‍্যাপারে ৮২বার বলা হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রতিটা আয়াতই মুল‍্যবান।মানব জাতীর নিকট নামাজের এই গুরুত্ব বুঝানোর জন্য আল্লাহ্পাক নামাজের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন।

নামাজের ব‍্যাপারে সুরা ‘ মু’মীনুন ‘ এর প্রথম ও ২য় নাম্বার আযাতে আল্লাহ্ পাক বলেছেন – ঃ ক্বাদ আফলাহাল মুওমীনাল লাজি না হুম ছালাতিহিম খাশিউন। অর্থ হচ্ছেঃ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগন। যারা তাঁদের সালাতে ভীত অবনত।

তাছাড়া ছাড়া সুরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে “ইননাস্ সালাতা তানহা আনেল ফাহ্শ্বা-ই ওয়াল্ মূনকার” নিশ্চয়ই নাভাজ অন‍্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।

আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ পর্যন্ত দুনিয়াতে যত নবী রাসুল এসেছেন তাঁদের প্রত্যেকের উপর এবং তাঁদের উম্মতদের উপর নামায ফরয ছিল।

তখন কোন নবীর প্রতি ১০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৩০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৫০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৪০ ওয়াক্ত নামায ফরয ছিল। আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ যখন মেরাজে গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ্ পাক ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছিলেন এবং পর্যায়ক্রমে কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন।

কিন্তু আখেরী জামানার উম্মতগণ এই ৫ ওয়াক্ত নামায পড়লেই ৫০ ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব পাবেন। নামায আল্লাহ্ পাকের একটি বিশেষ উপহার। যরা আল্লাহ্ পাকের দেয়া এই উপহার অবহেলা বা অবজ্ঞা করবে তারা কখনই আল্লাহপাকের প্রিয় বান্দা হতে পারবে না।

আমাদের নবী করীম সাঃ এব‍্যাপারে উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় এমন, যেন তোমাদের বাড়ীর সামন দিয়া প্রবাহিত একটি নদীর মত। কেউ যদি প্রতিদিন ৫ বার ঐ নদীতে গোসল কর, তবে যেমন তাঁর শরীরে কোন ময়লা-আবর্জনা থাকতে পারেনা। ঠিক তেমনি ভাবে যে ব্যক্তি পাঁচ বার নামায পড়ে, কোন প্রকার পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারবেনা।

নবী পাক (সাঃ) আরও বলেছেন, যখন কোন ব্যক্তি যত্ন সহকারে অজু করে, ভয় সহকারে নামায পড়বে, আল্লাহ্ পাক তার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দিবেন। সুবহানাল্লাহ্।

ইসলামের ফরজ সমুহের মধ্যে সর্বপ্রথম এই নামাজ ফরজ করা হয়েছে।

আর এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যেঃ
হযরত আদম (আঃ) এর উপর ফজরের নামায।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উপর জোহরের নামাজ।

হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর উপর আছরের নামাজ।

হযরত দাউদ (আঃ) এর উপর মাগরিবের নামায এবং হযরত ইউনুছ (আঃ) এর উপর এশার নামায ফরয করা হয়েছিল।

সুনানে নাসায়ির একটি হাদীসে আছেঃ
যে ব্যক্তি নিয়মিত এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিকমত এবং যত্ন সহকারে আদায় করবে, সে উপরের পাঁচজন নবীর নামাজের সমান সওয়াব পাবে।

নবী করীম সাঃ বলেন, যখন তুমি নামাযে দাঁড়াবে তখন মনে করবে যে, আমি আল্লাহপাকের সামনে দাঁড়িয়েছি।

যদিও তুমি আল্লাহ্কে দেখছনা কিন্তু মনে করবে আল্লাহ্ তোমাকে দেখছেন। হাদিসে আছে নামাজ হচ্ছে ” বেহেশ্তের চাবি। আর নামাজের চাবি হলো অজু ” গাক পবিত্র হওয়া।

এ ব‍্যাপারে একটি ঘটনায় জানা যায়, রাসুল সাঃ এর জামানায় এক যুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ) এর পায়ে একটি তীর বিদ্ধ হয়েছিল। তিনি তীরের আঘাতের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন। অনেক চেষ্টা করেও তীর বের হচ্ছিলনা। তিনি যখন নামাযের নিয়ত করলেন, নবী করীম সাঃ এর ইশারায় কয়েক জন ছাহাবা টানিয়া তীরটি বের করে ফেললেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) এতে কিছুই টের পেলেন না।

তাই আমাদেরকে মনযোগ সহকারে, একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করতে হবে। আর এই নামাজ হচ্ছে এমন একটি ইবাদত। যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী চলে যায়।

এ ব‍্যাপারে মহানবীর হাদিসে বলা হয় “আসসালাতু মেরাজুল মুও্মীন” নামাজ হচ্ছে মুমীনের মেরাজ স্বরুপ। নামাজে সবচয়ে তৃপ্তির সময় হচ্ছে, যখন আমরা সেজদাতে যাই। তখন আমরা এক পরম আত্বাতৃপ্তি লাভ করে থাকি।

এই নামাজের মাধ্যমে কিন্ত একজন মুমীন ও কাফির চেনা যায়। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে খুশুখুজু সহকারে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন।

আর এই নামজ সহী সুন্দর করতে আমাদের কে কোরআন শরীফকে সহিশুদ্ধ ভাবে তেলাওয়াত করতে হবে। তানাহলে আমাদের নামাজ শুদ্ধ হবে না। সেই সাথে আমাদের কে নামাজের যে সমস্ত ফরজ, ওয়াজিব রয়েছে সেগুলো জানতে হবে।

ব‍্যক্তিগত ভাবে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি আমাদেরকে মসজিদে জামায়াত নামাজ আদায় করার জন্য যথাসাধ‍্য চেষ্টা করতে হবে। কারণ জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক বেশী। জামাতে নামাজ পড়লে ২৭ গুন বেশি ছওয়াব পাওয়া যায়।

তাছাড়া মসজিদে গেলে জানাজা নামাজে শরীক হওয়া যায়। মসজিদে গেলে বন্ধবান্দব, পাড়া প্রতিবেশিবের সাথে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয়।

ফলে পরস্পরের মধ্যে প্রীতি ভালোবাসা এবং একে অন‍্যের সাথে সুম্পর্কের সৃষ্টি হয়। নামাজে আমরা যখন কাতার বন্দী হই, তখন আমরা ভুলে যাই কে ধনী কে গরীব। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই আল্লাহর গোলাম। নামাজ কিন্তু আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দেয়।

আল্লাহ্পাক আমাদের সবার ব‍্যক্তি জীবন, পারিবারিক ও সমাজ জীবনে ইসলামের আলোকে জামাতী জীবন গঠনের তৌফিক দান করুন।

সেই সাথে যে ভাবে নামাজ আদায় করলে মহান আল্লাহ্পেকের সন্তুষ্টি হাছিল করা যায়,যে ভাবে নামাজ পড়লে আমাদের আত্মা প্রশান্তি লাভ করে। আমরা যেন সেই ভাবে নামাজ আদায় করতে পারি।

আল্লাহ্পাক আমাদের সবাইকে যেন ক্ষমা করেন। আমাদের সকল ইবাদত বন্দেগী গুলো কবূল করেন। পরকালে তাঁর প্রিয় নেক বন্দাদের সাথে যেন আমাদের হাশর নছিব করেন। সেই দোয়া কামনা কমনা করছি। আমিন।

লেখক: কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক ‘রেনেসাঁ সাহিত্য মজলিশ ইউকে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close