রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

ইমাম মুসলিম (রহ.)

শীর্ষবিন্দু ডেস্ক / ১ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশ কাল : শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

আজ শুক্রবারপবিত্র জুমাবারআজকের বিষয় ‘ইমাম মুসলিম (রহ.)‘। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান। ‘ইসলাম থেকে’, বিভাগ প্রধান, শীর্ষবিন্দু নিউজ

হাদিসের বিশুদ্ধতা নিরূপণে ইতিহাসে যেসব মহামানব চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)। খোরাসানের নিশাপুরে ২০৪ হিজরি মোতাবেক ৮২০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

নিশাপুর বর্তমানে ইরানের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম মুসলিম (রহ.) ছিলেন আরব বংশজাত। ইলমে হাদিসের এ মহান ইমামের নাম ‘মুসলিম’, উপনাম ‘আবুল হুসাইন’ আর উপাধি আসাকিরুদ্দীন। তাঁর বংশপরম্পরা আরবের বিখ্যাত বংশ ‘কুশাইর’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে তাঁকে কুশাইরিও বলা হয়। ইমাম মুসলিমের প্রাথমিক শিক্ষা নিশাপুরেই সম্পন্ন হয়। অতি অল্প সময়েই ইমাম মুসলিম (রহ.) প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পেরিয়ে হাদিস শিক্ষায় ব্রতী হন।

ইমাম মুসলিম (রহ.) ২১৮ হিজরিতে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ইলমে হাদিস শিক্ষায় মনোযোগ দেন। তিনি জন্মস্থান নিশাপুরের বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হননি, তৎকালীন ইলমে হাদিসের সব কেন্দ্রেই ছুটে গেছেন, হাদিসের এক বিশাল ভাণ্ডার আত্দস্থ করেছেন। তিনি একাধিকবার বাগদাদ সফর করেছেন। তাঁর সর্বশেষ বাগদাদ সফর হয়েছিল ২৫৯ হিজরিতে।

ইমাম মুসলিম (রহ.) ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আত্তামিমি, আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামাহ আল কানাবি, আহমাদ ইবনে ইউনুস, ইসমাঈল ইবনে আবি উয়াইস, সাঈদ ইবনে মানুস, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, মুহাম্মদ ইবনে মেহরান, আবু গাসসান, আবু মাসয়াবসহ ২১১ জন বিশিষ্ট মুহাদ্দিসের কাছ থেকে ইলমে হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং হাদিস সংগ্রহ করেন। ইমাম বোখারি (রহ.) ছিলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর উস্তাদ।

ইমাম বোখারি (রহ.) নিশাপুরে এলে ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সাহচর্য গ্রহণ করেন। তিনি বোখারি (রহ.)-এর ইলমে হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ হাদিস আহরণ করেন। একটি বিশেষ মাসায়ালার বিষয়ে ইমাম বোখারি (রহ.)-এর বিরুদ্ধে তখন প্রবল প্রচারণা চলছিল। ইমাম মুসলিম (রহ.) স্বীয় উস্তাদের বিরুদ্ধে এহেন প্রচারণা যথাসাধ্য প্রতিরোধ করেন। একদিন ইমাম মুসলিম (রহ.) মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয্যাহলির দারসে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

সহসা মুহাদ্দিস যাহলি (রহ.) ঘোষণা করেন, বিশেষ একটি মাসায়ালায় যাঁরা বোখারির মত বিশ্বাস করেন, তাঁরা যেন আমার এ মজলিশ থেকে বের হয়ে যান। ইমাম মুসলিম উস্তাদের এ ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান। ঘরে ফিরে এসে ইমাম মুসলিম (রহ.) ওই উস্তাদের কাছ থেকে গৃহীত সব হাদিসের লিখিত পাণ্ডুলিপি ফেরত পাঠিয়ে দেন। তারপর থেকে তিনি ইমাম যাহলির সূত্রে আর কোনো হাদিস বর্ণনা করেননি।

ইমাম মুসলিম (রহ.) ছিলেন উলুমুল হাদিসের এক বিশাল সাগর। তিনি যেখানেই যেতেন জ্ঞানপিপাসু আলিমের দল তাঁকে মৌচাকের মতো বেষ্টন করে রাখতেন। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা তাঁর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে হাদিস রত্ন আহরণ করেছেন। ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর কাছ থেকে যাঁরা ইলমে হাদিসের বিশেষ শিক্ষা লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন_ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সুফইয়ান, হাফেজ আবু ঈসা তিরমিজি, আবু হাতেম রাজি, আবু বকর ইবনে খুজাইমা। ইবরাহিম ইবনে আবু তালেব, ইবনে সায়েদ, মাক্কি ইবনে আবদান, মুহাম্মাদ ইবনে মুখাল্লাদ, আহমাদ ইবনে সালামাহ, মুসা ইবনে হারুন। আবু আওয়ানা প্রমুখ মুহাদ্দিস।

ইমাম মুসলিম (রহ.) ইলমে হাদিসের যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার সংগ্রহ করেছিলেন, তা শিক্ষা দিয়ে যেমন অসংখ্য মুহাদ্দিস তৈরি করে গেছেন, সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে জগৎবাসীর জন্য মহামূল্যবান উপহার হিসেবে রেখে গেছেন। সহিহ মুসলিম ছাড়াও ইমাম মুসলিম (রহ.) যেসব গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, তার মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো_মুসনাদে কবির, কিতাবুল জামি, কিতাবুল আসমা ওয়াল কুনা, কিতাবুত্ তাময়ীয, কিতাবুল ইলাল ওয়া কিতাবুল ওয়াহদান, কিতাবুল ইফরাদ, কিতাবুল আরকান, কিতাবু হাদিসি আমর ইবনে শুয়াইব, কিতাবু মাশায়েখে মালেক, কিতাবু মাশায়েখে শোবা, কিতাবু আওলাদিস সাহাবা, কিতাবু আওহামিল মুহাদ্দিসিন, কিতাবুত তাবাকাত, কিতাবু সুয়ালাতি আহমাদ বিন হাম্বল, কিতাবু মান লাইসা লাহু রব্বুন ইল্লা ওয়াহিদ ইত্যাদি। তবে ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর রচনাবলির মধ্যে একমাত্র ‘আস্ সহিহুল মুসলিম ছাড়া আর কোনোটাই বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না।

মুসলিম শরিফ সংকলন : ইমাম মুসলিম (রহ.) দীর্ঘ পনের বছরের সাধনায় তিন লাখ হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে ‘সহিহ্’ মুসলিম শরিফ সংকলন করেছেন। ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর বিশিষ্ট সাগরেদ আহমাদ ইবনে সালামা বলেন, ‘আমি মুসলিমের সঙ্গে তাঁর আসসহিহ প্রণয়নকালে পনের বছর লেখালেখির কাজ করেছি (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ)।

ইমাম মুসলিম (রহ.) শুধু সহিহ হাদিসের সমন্বয়ে এ মহান গ্রন্থখানা রচনা করেছেন। তাই এর নামকরণ করেছেন ‘আসসহিহ’। মুসলিম শরিফে পুনরুল্লেখ ছাড়া হাদিসের মোট সংখ্যা চার হাজার, আর পুনরুল্লেখসহ মোট হাদিসের সংখ্যা সাত হাজার ২৭৫টি। ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর ‘সহিহ’ রচনার পর বলেছিলেন, ‘মুহাদ্দিসরা ১০ বছর পর্যন্তও যদি হাদিস লিখতে থাকেন, তবুও তাঁদের অবশ্যই এ বিশুদ্ধ মুসনাদ গ্রন্থের ওপর নির্ভর করতে হবে।’

ইমাম মুসলিম (রহ.) অত্যন্ত সত্য কথাই বলেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সুদীর্ঘ ১২০০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ অবধি মুসলিম শরিফের মানের দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব হয়নি কারও পক্ষে। ইমাম মুসলিম (রহ.) মুসলিম শরিফ রচনায় শুধু নিজের স্মৃতিশক্তির ওপরই নির্ভর করেননি। তিনি এটি রচনার পর তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণের সামনে পেশ করেছেন। তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের স্বীকৃতি নিয়ে চূড়ান্ত রচনার কাজটি সমাধা করেছেন।

তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি এ গ্রন্থখানা আবু জুরআ আর-রাজির কাছে পেশ করেছি। তিনি যে যে হাদিসের সনদে দোষ আছে বলে ইঙ্গিত করেছেন, আমি তা পরিত্যাগ করেছি, আর যে যে হাদিস সম্পর্কে মত দিয়েছেন যে এগুলো সহিহ, আমি সেগুলো গ্রন্থে সনি্নবেশিত করেছি।’ বস্তুত বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফের হাদিস বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে সমপর্যায়ের হওয়ার কারণেই দুটিকে একত্রে ‘সহিহাইন’ বলা হয়।

ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর আসসহিহর ভূমিকায় ‘সহিহ’ রচনার কারণ সম্পর্কে দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন।

(ক) ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর বিখ্যাত সাগরেদ আবু ইসহাক ইব্রাহিম তাঁর কাছে একটি উন্নতমানের সহিহ হাদিসগ্রন্থ সংকলন করার জন্য অনুরোধ জানান। কিতাবের ভূমিকায় তিনি তাঁর ছাত্রের জন্য দোয়া করেছেন।

(খ) ইমাম মুসলিম (রহ.) দ্বিতীয় কারণটি এভাবে উল্লেখ করেছেন_কেবল তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে সহিহ হাদিসগুলো বাছাই করার কষ্ট স্বীকার করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। কিন্তু আমি যখন জানতে পারলাম যে তথাকথিত মুহাদ্দিসরা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিথ্যা ও মুনকার হাদিসগুলো ছড়িয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, তখন তোমার অনুরোধে সাড়া দেওয়া আমার জন্য আরো সহজ হয়ে গেল। ইমাম মুসলিম (রহ.) মওজু ও দুর্বল হাদিস থেকে সহিহ হাদিস বেছে বের করার লক্ষ্যে কিছু কঠিন শর্তের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করেছেন। শর্তগুলো হলো : (ক) মুত্তাসিলুস্ সনদ। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত হাদিস বর্ণনাকারীদের পরম্পরা ধারাবাহিক হতে হবে। কোনো পর্যায়ে কোনো বর্ণনাকারীর নাম অজ্ঞাত থাকলে তিনি ওই সনদে কোনো হাদিস গ্রহণ করেননি। (

(গ) সাকাতুর রাবি_অর্থাৎ রাবি বা হাদিস বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য হতে হবে। কোনো বর্ণনাকারীর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার অভাব থাকলে, বর্ণনাকারী বর্ণিত হাদিসের বিপরীত আমল করলে তিনি তাঁর কোনো হাদিস গ্রহণ করেননি।

(ঘ) হাদিস বর্ণনাকারী তাঁর ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারীর সমকালীন হওয়া। বর্ণনাকারী আর তিনি যাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করছেন উভয়েই সমকালীন হওয়া। (ঘ) জবতুর রাবি অর্থাৎ বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি প্রখর হওয়া। কারণ রাবির স্মরণশক্তি প্রখর না হলে তাঁর পক্ষে মহানবী (সা.)-এর বাণীকে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

(ঙ) ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর পঞ্চম শর্ত হলো_ বর্ণিত হাদিসের মতো বা মূল বক্তব্য সব ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে। ইমাম মুসলিম (রহ.) কর্তৃক সহিহ হাদিস নির্বাচনে ওই যাচাই-বাছাইয়ের কারণেই অনেকে মুসলিম শরিফকে বোখারি শরিফের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, ‘সহিহ মুসলিম রচনার পর থেকে আজ পর্যন্ত মুহাদ্দিসদের কাছে যতখানি সমাদৃত হয়েছে, ততখানি সমাদর আর কোনো গ্রন্থ লাভ করতে পারেনি।’ আবু আলী নিশাপুরী (রহ.) বলেছেন, ‘মুসলিমের গ্রন্থ অপেক্ষা বিশুদ্ধতর কোনো গ্রন্থ আর নেই (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ)। ইলমে হাদিসের এ মহান সাধক ২৬১ হিজরির ২৫ রজব রবিবার মোতাবেক ২৮০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে নিশাপুরে ইন্তেকাল করেন।

লেখক: ইমাম ও খতিব– মসজিদুল উম্মাহ লুটন, সেক্রেটারি– শরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড ও মিডল্যন্ড ইউকে। সত্যায়নকারী চেয়ারম্যান- নিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে। প্রিন্সিপাল- আর রাহমান একাডেমি ইউকে, পরিচালক- আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে।


এই বিভাগের আরও সংবাদ
  • নামাজের সময়সূচি
  • রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১
  • সূর্যোদয় :- ৫:১০ সূর্যাস্ত :- ৬:৪৯
    নাম সময়
    ফজর ৪:১৫
    যোহর ১২:১০
    আছর ৪:৫০
    মাগরিব ৬:৪৫
    এশা ৮:১৫
    পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ