শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: পুলিশের সামনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরু’র করা গুলিতেই সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহজাদপুর সার্কেলের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত।
শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে বৃহস্পতিবার মারধর করার অভিযোগে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ মেয়র মিরু’র বাড়ি ঘেরাও করলে মেয়র নিজে শর্টগান দিয়ে গুলি নিক্ষেপ করেন। এ সময় দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এদিকে মেয়র হালিমুল হক মিরুর বাসা থেকে গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, যে শর্টগান দিয়ে সাংবাদিক আ. হাকিম শিমুলকে গুলি করা হয়েছে এটি তারই খোসা। শাহজাদপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত এ তথ্য জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত আরও বলেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ সেখানে যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছিল। ঘটনার সময় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মেয়রকে বার বার বারণ করার পরও তিনি গুলি ছোড়েন। একাধিক গুলি করেন মেয়র। ওই সময় অন্য কোনো পক্ষ গুলি করেনি। শাহজাদপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শিমুলের জানাজা পূর্ব সমাবেশে একথা বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, যা আমাদের সামনেই ঘটেছে। অপরাধী যত ক্ষমতাশালীই হোক, আমরা তাকে আইনের আওতায় আনবো। ঘটনার পর মেয়রের বাড়ি থেকে শর্টগান ও ৪৩টি গুলি জব্দ এবং ঘটনাস্থল থেকে ৬টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
জানাজা অনুষ্ঠানে শাহজাদপুরের সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন, সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন আল রাজিব, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমান, সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক ফজল-এ-খোদা লিটন, সাবেক সভাপতি হারুন-অর-রশিদ খান হাসান বক্তব্য রাখেন।
সংসদ সদস্য হাসিবুর বলেন, শাহজাদপুরবাসী আগে থেকেই অবগত যে মেয়র ও তার ভাইয়েরা অস্ত্রবাজি করে। এখানে তার গুলিতেই সাংবাদিক মারা গেলেন। এটা অত্যন্ত লজ্জাকর। এতে আমরা মর্মাহত। মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে নিষ্পত্তির দাবী করেন তিনি বলেন, সাংবাদিকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করানো হবে।
সাংবাদিকের মৃত্যুর পর থেকে উত্তেজনা চলছে এই উপজেলা শহরে। মেয়রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিম ও ছাত্রলীগ নেতা বিজয়ের কর্মী-সমর্থক এবং সাংবাদিকরা। তারা শাহজাদপুর উপজেলায় শনিবার অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করলে তা সফল হয়। শনিবার সকাল-দুপুর সব ধরনের দোকানপাট ও যানবাহন বন্ধ ছিল। শিমুল হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম বাদী হয়ে মেয়রসহ ১৮ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস,আই কমল দেবনাথ বলেন, ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। তারা হলেন-মেয়রের দুই ভাই হাসিবুল ইসলাম পিন্টু ও মিন্টু এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে,এম নাসির উদ্দিন (৪৮)। সকাল সাড়ে ১০টায় শাহজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ও পরে শিমুলের বাড়ি মাদলা গ্রামের কবর স্থানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন করা হয় শিমুল ও তার নানিকে।
একই স্থানে নানি-নাতির আলাদা আলাদা জানাজা হয়। পরে মাদলা গ্রামের কবরস্থানে দুইজনকে পাশাপাশি দাফন করা হয়। শুক্রবার শিমুলের মৃত্যু খবর জানার পর তার নানি মারা যান।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় আওয়ামী লগের দুই গ্রুপের মধ্যকার সংঘর্ষে পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মীরুর গুলিতে আহত দৈনিক সমকালের উপজেলা প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল মারা গেছেন।
গতকাল শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে বগুড়া থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলের মৃত্যু হয় বলে জানান হাটিকুমড়ুল এলাকার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক হাফিজ রহমান মিলন।
আর শিমুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই মেয়র মীরু আত্মগোপনে চলে গেছেন। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তার বেশির ভাগ সমর্থক ও আত্মীয়স্বজনের। মীরুর মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, মেয়র হালিমুল হক মিরুর শর্টগান থেকেই গুলি করা হয়েছে। তার বাড়ি থেকে গুলির খোসা পাওয়া গেছে। ৪৩ রাউন্ড গুলিসহ ওই শর্টগান জব্দ করা হয়েছে।
এর আগে শিমুল হত্যার এই ঘটনায় এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা কে এম নাসির উদ্দীনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার ভোররাতে শাহজাদপুর উপজেলার ছয়আনি গ্রাম থেকে নাসিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি তিনজনকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল শুক্রবার রাতে নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী কামরুন নাহার বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মীরু ও তাঁর দুই ভাইসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়।
স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, শুক্রবার দুপুরে শিমুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেয়র পুলিশের সহায়তায় নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করেছেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
এ বিষয়ে নিহত শিমুলের ভাই আজাদ হোসেন বলেন, সংঘর্ষের ছবি তুলতে গেলে মেয়র মীরু পরিকল্পিতভাবে শিমুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। আমরা মেয়র মীরু ও তার দুই ভাই পিন্টু ও মিন্টুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল হক জানান, শিমুলের মৃত্যুর পর থেকেই মেয়র মীরুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।