শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৪১

বন্যায় ঘরহারা মানুষের টিকে থাকার নতুন লড়াই

বন্যায় ঘরহারা মানুষের টিকে থাকার নতুন লড়াই

পানি নামতে শুরু করলেও তলিয়ে রয়েছে কৃষিজমি, এদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের পথে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে দুর্গত মানুষ।

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে নতুন বাস্তবতা।

কোথাও ধসে গেছে বসতঘর, কোথাও কাদায় ভরে গেছে ঘরের ভেতর। নষ্ট হয়েছে ফসল, মাছের ঘের, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে এখনো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে হাজারো মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত দেশের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রাণ গেছে ৫৭ জনের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ মানুষ, পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১। বর্তমানে পানি নামলেও লাখো মানুষের সামনে এখন ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার কঠিন লড়াই।

এদিকে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বৃষ্টি কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ধান, সবজি ও পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি ঢুকে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কয়েকটি এলাকায় সড়ক যোগাযোগও এখনো বিঘ্নিত রয়েছে।

চট্টগ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলেও দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব বলছে, ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ পর্যন্ত বন্যা ও ভারী বর্ষণজনিত বিভিন্ন ঘটনায় শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১৫ হাজার ২২৩টি বসতঘর, ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু এসব অবকাঠামোর প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, বন্যায় ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি ও ১ হাজার হাঁস মারা গেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ির ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ৯২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষি খাতের ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তার জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বন্যা ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিনজন, সাতকানিয়ায় তিনজন এবং সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে একজন করে রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম জানান, এবারের বন্যায় জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি।

তিনি জানান, সরকারি মজুতে বর্তমানে ৫১৬ টন চাল ও ২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে ৬৮৪ টন চাল এবং ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজন মেটাতে আরও ৬২২ টন চাল ও ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026