সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫৭

ভিসা-মাস্টারকার্ড-অ্যামেক্স নিয়ে গেছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা

ভিসা-মাস্টারকার্ড-অ্যামেক্স নিয়ে গেছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা

হিটলার এ. হালিম: বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম’ না থাকায় ভিসা, মাস্টার কার্ড ও অ্যামেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গত চার বছরে দেশ থেকে নিয়ে গেছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। চলতি বছর নিয়ে যাবে প্রায় আরও ১২ কোটি ৯২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা। নিজস্ব পেমেন্ট স্কিম থাকলে অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘ট্র্যাডিশনাল পেমেন্ট প্রসেসিং’ এবং এসব কার্ড কোম্পানিগুলোর শরণাপন্ন হতে হতো না দেশের ব্যাংকগুলোকে। দেশের টাকা দেশেই থেকে যেতো।

যদিও কার্ডভিত্তিক প্রতিটি লেনেদেন ভিসা, মাস্টার কার্ড, অ্যামেক্সসহ অন্যান্য কার্ড সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে চার্জ কাটে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে (যারা পেমেন্ট নেওয়ার জন্য পিওএস মেশিন ব্যবহার করে) চার্জ কেটে নেয়। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ক্যাটাগরিভিত্তিক লেনদেনে একেক ধরনের চার্জ কাটে কার্ড কোম্পানিগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে গ্রাহকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বাড়িয়ে চার্জ সমন্বয় করতে পারে।

প্রসঙ্গত, ভিসা বা মাস্টার কার্ড হলো এক ধরনের অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা সম্পন্ন এটিএম কার্ড। যা প্রায় সব ধরনের এটিএম মেশিনে সাপোর্ট করে। ফলে যেকোনও ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সুবিধা দেয়। এমনকি বিদেশেও এমন সুবিধা দেয়। ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিমও এসব সুবিধা দেবে।

ভারতের রুপে, সৌদি আরবের সামা, ব্রাজিলের এলো (ইএলও) নামে নিজস্ব ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম’ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ধীরগতিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম তৈরির উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার। ২০১৬ সালে ছিল ৯ লাখ, ২০১৫ সালে সাত লাখ ৬০ হাজার, ২০১৪ সালে সাত লাখ আর ২০১৩ সালে ছিল পাঁচ লাখ ৭০ হাজার।

অন্যদিকে, দেশে বর্তমানে ডেবিট কার্ড ব্যবহার হচ্ছে প্রায় এক কোটি পাঁচ লাখ ৭০ হাজার। ২০১৬ সালে ছিল ৯৩ লাখ ৬০ হাজার, ২০১৫ সালে ছিল ৮৬ লাখ, ২০১৪ সালে ছিল ৮০ লাখ ছয় হাজার আর ২০১৩ সালে ছিল ৬৫ লাখ ৪০ হাজার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভিসা, মাস্টার কার্ড বা অ্যামেক্স কার্ড দিয়ে কোনও এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা হলে কার্ডধারী প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ ব্যবহারের জন্য সরাসরি চার্জ কেটে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং যে ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা হয় সেই ব্যাংক।

আর ভিসা, মাস্টার কার্ড বা অ্যামেক্স কার্ড সার্ভিস ব্যবহারের জন্য ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে চার্জ দিয়ে থাকে। তবে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা কেনাকাটার বিল পরিশোধের জন্য যখন কোনও পিওএস (পয়েন্ট অব সেল) মেশিন ব্যবহার করেন এবং অনলাইন কেনাকাটার পেমেন্ট দিয়ে থাকেন তখন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো (সুপার শপ, ফাস্টফুড শপ, সুপার মল, সিনেমার হলের টিকিটের বিল পরিশোধ ইত্যাদিতে) কার্ড ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার্জ পরিশোধ করতে হয়।

পিওএস মেশিনের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিল পরিশোধ করলে প্রতি লেনদেনে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ডেবিট কার্ড দিয়ে পরিশোধ করলে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ চার্জ কেটে নেয় ভিসা, মাস্টার কার্ড বা অ্যামেক্সসহ অন্যান্য কার্ড কোম্পানিগুলো (পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর কাছ থেকে)।

অন্যদিকে, অনলাইনে বা ই-কমার্স কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটার বিল পরিশোধে প্রতি লেনদেনে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ডেবিট কার্ড দিয়ে পরিশোধ করলে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ চার্জ কেটে নেয় কার্ড কোম্পানিগুলো। আর এ ফলে প্রতি বছর বিপুল অংকের টাকা দেশ থেকে চলে যাচ্ছে।

দেশের প্রথম সার্টিফায়েড স্মার্টকার্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রফেশনাল (সিএসআইপি) ও কোরিয়াভিত্তিক স্মার্টকার্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কনা আই’ এর উপদেষ্টা খালেকদাদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই স্থানীয় ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম হওয়া দরকার। এটা এখন খুবই জরুরি। এটা করা গেলে দেশের রাজস্ব দেশেই রাখা সম্ভব।’

খালেকদাদ খান জানান, ভিসা, মাস্টার কার্ড বা অ্যামেক্স এর অনুমোদন পেতে হলে ভিসা বা মাস্টার কার্ড থেকে সার্টিফিকেশন নিতে হয়। এজন্য টাকা দিতে হয়। আবার প্রতি বছর এসব সার্টিফিকেশন রিনিউ করতে হয়। ফলে বড় অংকের টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম চালু করা গেলে হয়তো সব টাকা বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো করা যাবে না। তবে চলে যাওয়ার পরিমাণ বহুলাংশে কমানো যাবে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভিসা, মাস্টার কার্ড ও অ্যামেক্সসহ অন্যান্য কার্ড কোম্পানি ২০১৬ সালে নিয়ে গেছে প্রায় ১১ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ২০০ টাকা। ২০১৭ সালে প্রায় ১২ কোটি ৯২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা। ২০১৫ প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা। ২০১৪ সালে ছিল প্রায় আট কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা। আর ২০১৩ সালে ছয় কোটি ১১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ওই নথি অনুযায়ী এভাবে টাকা যেতে থাকলে ২০২০ সালে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১৮ কোটি ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৭ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম বিষয়ক একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি ‘বেজ প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হবে। ফলে এসব কার্ড যেকোনও পিওএস ও এটিএম মেশিনে ব্যবহার করে টাকা উত্তোলনসহ সব ধরনের লেনদেন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক এসএম রেজাউল করিম বলেন, ‘এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য স্প্যাসিফিকেশন প্রয়োজন হবে। সেজন্য চিপভিত্তিক স্প্যাসিফিকেশন করা হবে। এটি চালু (ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম) করতে হলে ব্যাংকগুলোকে একটি সমন্বয় করতে হবে। তখন আমরা আমাদের চ্যানেল ব্যবহার করেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারব।’

এসএম রেজাউল করিম জানান, ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম ব্যবহার করে দেশের বাইরে কোনও লেনদেন সম্পন্ন করা যাবে না। সেক্ষেত্রে ভিসা বা মাস্টার কার্ডের সাহায্য নিয়েই করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম চালু হলে এর জন্য নতুন করে ডেবিট কার্ড ইস্যু করা হবে। সেই কার্ডে ভিসা বা মাস্টার কার্ডের মতো কোনও লোগো থাকতে পারে। সেই লোগো চিহ্নিত এটিএম মেশিন তথা বুথ থেকে কার্ড দিয়ে টাকা তোলা বা পণ্য ক্রয়ের সময় পিওএস মেশিনে সো-আপ করা যাবে।

পেমেন্ট গেটওয়ে সিস্টেম এসএসএল ওয়্যারলেসের চিফ অপারেটিং অফিসার আশীষ চক্রবর্তী বলেন, ‘বিভিন্ন কার্ডের চার্জ কাটা হয় অনেক ধরনের হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে। ফলে এক কথায় বলা যাবে না, কত শতাংশ হতে পারে। তবে তা প্রতি লেনদেনে দুই দশমিক পাঁচ থেকে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ এখনও প্রস্তুত নয়। আমরা এখনও ওই পর্যায়ে নেই। কারণ সবার হাতে হাতে এখনও কার্ড (এটিএম কার্ড) পৌঁছেনি। ফলে এটা এখনওই সম্ভব হবে না।

আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছর পর ন্যাশনাল পেমেন্ট স্কিম চালু করা সম্ভব হবে। এখন চালু করলে তা সেভাবে কাজ করবে না। আমরা নিজেদের ডিজিটাল দাবি করছি কিন্তু এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হতে পারিনি। ফলে এখনই কোনও সুফল পাওয়া যাবে না।

জানা গেছে, যেকোনও লেনদেনে (ভিসা, মাস্টার কার্ড, অ্যামেক্স ব্যবহার করে) চার্জ কাটে গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে চার্জ নিয়ে থাকে ভিসা, মাস্টার কার্ড, অ্যামেক্সসহ অন্যান্য কার্ড কোম্পানিগুলো।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রিয় শপ ডট কমের প্রধান নির্বাহী আশিকুল আলম খাঁন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান থেকে ভিসা, মাস্টার কার্ড ইত্যাদি দিয়ে কেনাকাটা করা যায়। প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানিগুলো আমাদের কাছে চার্জ করে। পেমেন্ট গেটওয়ের গ্রহণ করা চার্জ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও জন্য কার্ড কোম্পানিগুলো তাদের নির্ধারিত চার্জ নিয়ে থাকে।

একেক পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানি এবং কার্ড কোম্পানিগুলো একেক ধরনের চার্জ নিয়ে থাকে। এই হার প্রতিষ্ঠান ভেদে দুই দশমিক পাঁচ থেকে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026