আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘ইসলামের দৃষ্টিতে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।
চন্দ্র-সূর্য মহান আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি সূর্যকে মাধ্যম বানিয়েছেন। চাঁদের মধ্যেও রেখেছেন মানুষের নানা উপকার। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই; সূর্য থেকে আলো গ্রহণ করেই পৃথিবীতে সে স্নিগ্ধ আলো বিতরণ করে। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সত্তা, যিনি সূর্যকে কিরণোজ্জ্বল ও চাঁদকে স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন।’ (সুরা-১০: ইউনুস, আয়াত: ৫)
চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত একটি প্রক্রিয়া। চাঁদ যখন পরিভ্রমণরত অবস্থায় কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোনো দর্শকের কাছে কিছু সময়ের জন্য সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই সূর্যগ্রহণ (ঝড়ষধৎ বপষরঢ়ংব) বা কুসুফ। আর পৃথিবী যখন তার পরিভ্রমণরত অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখনই পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই চন্দ্রগ্রহণ (খঁহধৎ বপষরঢ়ংব) বা খুসুফ।
পবিত্র কোরআনে সূর্য ও চন্দ্র প্রসঙ্গ
আমরা বাংলায় সূর্যালোক অথবা চন্দ্রালোক বলি। ইংরেজিতে বলি ঝঁহষরমযঃ এবং গড়ড়হষরমযঃ। কিন্তু পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সত্তা, যিনি সূর্যকে কিরণোজ্জ্বল ও চঁঁদকে স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫)
সূর্য সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আর আমি সৃষ্টি করেছি একটি প্রজ্বলিত বাতি।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ১৩)
চাঁদের ব্যাপারে বিজ্ঞান বলে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের প্রতিফলিত আলোই চাঁদের সম্বল। পবিত্র কোরআন আরও স্পষ্ট করে বলছে, ‘আল্লাহ চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে, আর সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১৬)
ইসলামের দৃষ্টিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ
সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণকে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এতদুয়ের ওপর একটি ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর সৃষ্টি। এর প্রমাণস্বরূপই আল্লাহ এ দুটোর ওপর ‘গ্রহণ’ দান করেন। আর এই দুটি আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন বৈ অন্য কিছুই নয়।
হাদিস বিশারদ ও ইসলামের গবেষকরা বলেছেন, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সতর্কবাণী পৌঁছে দেয় যে, অন্যান্য সৃষ্টির মতো চন্দ্র-সূর্যও আল্লাহর মাখলুক; এরা উপাসনার যোগ্য নয়। এ দুটি যেহেতু নিজেরাই বিপদাক্রান্ত হয়, তাই এগুলো উপাসনার যোগ্য হতে পারে না। বরং এ দুটিকে মহান আল্লাহকে চেনার মাধ্যম গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
আল্লাহ বলেছেন, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কোরো না, আর চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সিজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু তারই ইবাদত করে থাকো।’ (সুরা হা-মিম সিজদা, আয়াত : ৩৭)
জাহিলি যুগে মানুষের ধারণা ছিল, কোনো মহাপুরুষের জন্ম-মৃত্যু বা দুর্যোগ-দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির বার্তা দিতে সূর্য বা চন্দ্রগহণ হয়। ইসলাম এটাকে একটি ভ্রান্ত ধারণা আখ্যায়িত করেছে। ‘গ্রহণ’-কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় গণ্য করেছে।
এ কারণে সূর্য বা গ্রহণের সময় মুমিনদের অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা যেন এ সময়ে আল্লাহর তাসবিহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করে। দোয়া, নামাজ ও আমল ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকে।
হাদিসের আলোকে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ : ১. মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর দিনটিতেই সূর্য গ্রহণ হলো। তখন আমরা সবাই বলাবলি করছিলাম যে, নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই এমনটা ঘটেছে।
আমাদের কথাবার্তা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘সুর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শনের মধ্যে দুটি নিদর্শন। কারওর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ হয় না।’ [বোখারি : ১০৪৩; মুসলিম : ৯১৫]
২. আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এর জামানায় একবার সূর্যগ্রহণ হলো। গ্রহণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত মসজিদের দিকে ধাবিত হলেন এবং সবাইকে মসজিদে আসতে আহ্বান জানালেন। তিনি নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ করলেন যে, এই জামায়াতে আগে কখনও এমন করেননি।
এরপর রুকুতে গেলেন এবং রুকু এত দীর্ঘ করলেন যা আগে কখনও করেননি। এরপর দাঁড়ালেন; কিন্তু সেজদায় গেলেন না এবং দ্বিতীয় রাকায়াতেও কিরাত দীর্ঘ করলেন। এরপর আবার তিনি রুকুতে গেলেন এবং তা আগের চেয়ে আরও দীর্ঘ করলেন। রুকু সমাপ্ত হলে দাঁড়ালেন এবং এরপর সেজদায় গেলেন এবং তা এত দীর্ঘ করলেন যে, আগে কখনও এমনটা করেননি।
এরপর সেজদা থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম দু’রাকাতের ন্যায় দ্বিতীয়বারও ঠিক একইভাবে নামাজ আদায় করলেন। ততক্ষণে সূর্যগ্রহণ শেষ হয়ে গেছে। নামাজ সমাপ্ত হলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা পেশ করে খুতবা প্রদান করলেন।
তিনি বললেন, ‘সূর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শনগুলোর মধ্যে দু’টো নিদর্শন। কারও মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না। অতএব, যখনই তোমরা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করবে, তখনই আল্লাহকে ডাকবে, তার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশ করবে এবং নামাজে রত হবে। [বোখারি : ১০৪৪; মুসলিম : ৯০১]
হযরত আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমরা একবার বিশ্বনবী (সা.)-এর কাছে থাকাকালীন সূর্যগ্রহণ শুরু হলো। সেই সময় নবী উঠে দাঁড়ালেন এবং পরিহিত চাদর টানতে টানতে মসজিদে গেলেন। তার সঙ্গে আমরাও মসজিদে প্রবেশ করলাম। আমাদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়লেন তিনি এবং সূর্যগ্রহণ ছেড়ে গেল।
নবী বললেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কারো মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন (সূর্য/চন্দ্র) গ্রহণ দেখবে তখন অবস্থাটি থাকা পর্যন্ত নামাজ আদায় করবে এবং দোয়ায় মশগুল থাকবে। (বুখারি)

Leave a Reply