মিজানুর রহমান: সাগর পথে অবৈধভাবে থাইল্যান্ড ঢুকে পড়া বাংলাদেশীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে তারা উদ্বিগ্নও। গত কয়েক মাসে দালাল মারফত বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রায় ৬০০ বাংলাভাষী থাই পুলিশের হাতে আটকের প্রেক্ষিতে দেশটির সরকার তাদের উদ্বেগের বিষয়টি প্রকাশ করে। ব্যাংককে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন থাই সরকারের উদ্বেগের বিষয়ে সরকারকে জানিয়েছেন।
সমপ্রতি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মানব পাচারের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে দ্রুততার সঙ্গে এর লাগাম টেনে ধরতে অনুরোধ জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। ব্যাংককের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাভাষীদের অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে তাদের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বাংলাদেশী নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধও করেছেন তিনি। রাষ্ট্রদূত তার চিঠিতে স্পষ্টই বলেছেন, মানবপাচারের প্রবণতা বন্ধ করতে সরকার সক্ষম না হলে এবং আটক প্রকৃত বাংলাদেশীদের দ্রুত দেশে ফেরানোর উদ্যোগ না নেয়া হলে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গুরুতর হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া নতুন গ্রুপ বিষয়ক ওই চিঠিতে রাষ্ট্রদূত বলেন, সমপ্রতি থাই পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করেছে দেশটির রানোং (২৭ জন) ও ফাং এনগা (১৩০ জন) দু’টি ডিটেনশন সেন্টারে ১৫৭ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আটক রয়েছেন, যারা নিজেদের বাংলাদেশী বলে পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া, অতিরিক্ত আরও ২০০ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী থাই পুলিশের হাতে দু’মাস ধরে আটক রয়েছে বলেও জানিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। তারা বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে দেশটিতে প্রবেশ করেছে বলে জানানো হলেও তাদের নাম-ঠিকানা এখনও থাই সরকার সরবরাহ করতে পারেনি। রাষ্ট্রদূত জানান, রানোং ও ফাং এনগা ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশী পরিচয়দানকারী ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ গত ১১-১৩ই এপ্রিল দূতাবাসের কনস্যুলার টিম সেন্টার দু’টি পরিদর্শন করেছে। তিনি নিজেও ফাং এনগা সেন্টার পরিদর্শনে যাচ্ছেন। চিঠিতে কাজী ইমতিয়াজ উল্লেখ করেন বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক অতিরিক্ত ২০০ বাংলাভাষীর তালিকা সরবরাহে কথা দিয়েছে থাই পররাষ্ট্র দপ্তর। ওই তালিকা থেকে পাওয়ার পর তাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য দূতাবাস কনস্যুলার উদ্যোগ নেবে।
রাষ্ট্রদূতের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ঢাকায় চিঠিটি পৌঁছার বিষয়টি স্বীকার করে। সূত্র জানায়, ওই চিঠিতে দু’টি ডিটেনশন সেন্টারে থাকা ১৫৭ বাংলাদেশী এবং অতিরিক্ত প্রায় ২০০ বাংলাভাষী আটকের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এর আগে আরও ২১৪ বাংলাভাষাভাষী দেশটিতে ৬ মাস ধরে আটক রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তাদের ভেরিফিকেশন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এদের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম অঞ্চলের। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা থাকতে পারে- এমন আশঙ্কায় সতর্কতার সঙ্গে তালিকা ধরে যাচাই বাছাই চলছে। বেশ ক’জন এরই মধ্যে নিজ খরচে দেশে ফিরছেন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ২১৪ জনের মধ্যে প্রকৃত বাংলাদেশীদের দেশে ফেরত আনতে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, কনস্যুলার ও কল্যাণ) মুস্তাফা কামালের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সেখানে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়েছে। দালাল মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য তারা নৌপথে থাইল্যান্ড যায়। সেখানে তারা থাই পুলিশের হাতে আটক হয়। দালালদের সঙ্গে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জনপ্রতি চুক্তিতে তাদের নেয়া হয়েছে বলে দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে। পুরানো ২১৪ জনের ফেরত আনার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা এবং নতুন ৩৫৭ জনের যাচাই-বাছাই দ্রুত শুরুর বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে বলেও দাবি করেন দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তা।