শীর্ষবিন্দু নিউজ: যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা বন্ধের দাবিতে লন্ডনে আয়োজিত চার দিনব্যাপী এন্ড সেক্সুয়েল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট শীর্ষক গ্লোবাল সামিটে আবারও উঠে এলো ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কালের যৌন সহিংসতার কথা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের কাহিনী এক ব্যতিক্রমী নাগরিক মৌন সমাবেশের মাধ্যমে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো বিশ্ববাসীকে।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ইন্টারন্যাশনেল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ) ও গণজাগরণ মঞ্চসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে এক্সেল লন্ডনে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কালো শাড়ি পরে ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে ব্রিটেনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত নারী মুখের অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন এই মৌন সমাবেশে।
শীর্ষ সম্মেলনটি শুরু হয় গত ১০ জুন। শুক্রবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম হেগ ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়। একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের কথা না থাকার অভিযোগ মৌন সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ, ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি উইলিয়াম হেগ ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক বিশেষ দূত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই গ্লোবাল সামিটের মূল ডকুমেন্টে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষিত ও নির্যাতিত বাঙালি নারীদের কথা স্থান পায়নি।
বিশ্বের ৪৮টি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, ১১৩টি দেশের ৬০০ সরকারি ডেলিগেটস ও ১০০ এনজিও প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই কনফারেন্স প্রাঙ্গণে ‘হোয়ার আর বাংলাদেশ’স রেইপ সারভাইভার্স অ্যাট দিস সামিট?’ লেখা প্লাকার্ড হাতে উপস্থিত তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে মৌন সমাবেশে বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষও অংশ নেন। সম্মেলন শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কনফারেন্সে আগত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে লিফলেট ও প্রচারপত্র বিলি করতে থাকেন প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা। তাদের সঙ্গে ভিন্ন বর্ণের অনেক মানুষও অংশ নেন এই ক্যাম্পেইনে। তৃতীয় দিনের নির্ধারিত মিনিস্টেরিয়াল সেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলীসহ অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন।
এদিন বিশেষ কড়াকড়ির কারণে একপর্যায়ে মৌন সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে সব পোস্টার ও লিফলেট বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায় নিরাপত্তারক্ষীরা। কিন্তু মৌন সমাবেশের প্রতি সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন বর্ণের মানুষের আকর্ষণ, উদ্যোক্তাদের আবেগ ও অনুভূতি দেখে নিরাপত্তাকর্মীরা আবার সেসব ফিরিয়ে দেয়। পরে আবারো লিফলেট বিলি শুরু করেন। একপর্যায়ে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিশেষ উদ্যোগে এসব প্রচারপত্রের একটি অংশ কনফারেন্স স্থলের ভেতরে ডেলিগেটদের হাতেও পৌঁছে দেওয়া হয়।
মৌন সমাবেশের একপর্যায়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র অজন্তা দেব রায় সুযোগ পেয়ে একটি প্রচারপত্র তুলে দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলির হাতেও। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে নির্মিত নাটক প্রদর্শিত হলো না একাত্তরের বীরঙ্গনাদের নিয়ে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত আলোড়ন সৃষ্টিকারী থিয়েটার নাটকের মূল কর্ণধার লীসা গাজী যখন তার সহকর্মীদের নিয়ে কালো শাড়ি পরে ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্লাকার্ড হাতে মৌন সমাবেশে দাঁড়িয়ে যান তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি পড়তে শুরু করে মৌন সমাবেশের প্রতি।
বিশ্ব নাগরিকরা কৌতুহলী হয়ে ওঠেন একাত্তরের বাংলাদেশ নিয়ে। লিসার এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী থিয়েটার নাটক এন্ড সেক্সুয়েল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট শীর্ষক গ্লোবাল সামিটে উপস্থাপন করার কথা থাকলেও কোন এক রহস্যময় কারণে তা আর হয়ে উঠেনি বলে আলোচনা রয়েছে লন্ডনে। সামিটে অংশ নেয়া ৮৫ ভাগই জানেন না একাত্তরের গণহত্যার কথা একাত্তরের বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক নাগরিক তাদের অনুভূতিও ব্যক্ত করেছেন মানববন্ধন ও মৌন সমাবেশের উদ্যোক্তাদের কাছে।
মূলত চারটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হয় এন্ড সেক্সুয়েল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট শীর্ষক গ্লোবাল সামিট। এই লক্ষ্যগুলো হলো দায় মুক্তির সংষ্কৃতি বন্ধ, যুদ্ধ আক্রান্ত অঞ্চলের নারীদের বিপদ ঝুঁকি কমাতে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ, বেঁচে যাওয়া আক্রান্তদের সহযোগিতা দেয়া এবং যুদ্ধাবস্থায় যৌন সহিংসতায় আগ্রহীদের মনোভাব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা।