রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৬

ওমানের জেলে দুর্ভোগে বাংলাদেশীরা

ওমানের জেলে দুর্ভোগে বাংলাদেশীরা

: শহিদুল ইসলাম। আড়াই বছর আগে ৩ লাখ টাকা খরচ করে পাড়ি জমান ওমানে। আদম ব্যাপারীর মাধ্যমে মালিকানা ভিসা নিয়ে গেলেও কোন মালিকের অধীনে কাজ জোটেনি তার। প্রায় ৩ মাস বেকার থাকেন তিনি। এরপর এখানে-সেখানে কাজ করতে থাকেন।

একপর্যায়ে কাজ নেন একটি হোটেলে। বাড়িতে টাকা পাঠান ৪০ হাজার। ওই একবারই পাঠিয়েছেন। হোটেলে কাজ চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় কাজের সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু আশানুরূপ কাজ জোটেনি। এভাবে পার হয়ে যায় ২ বছর। ভিসার মেয়াদও শেষ হয়। প্রায় দু’মাস আগে তিনি ধরা পড়েন ওমানি পুলিশের কাছে। তখন থেকেই জেলের ঘানি টানছেন। শহিদুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার রুটি গ্রামে। তার মতো অনেকেই সে দেশে গিয়ে এ ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দিনের পর দিন তারা পড়ে আছেন জেলে।

শুক্রবার ওমান থেকে বহিষ্কৃত শতাধিক শ্রমিক দেশে ফেরেন। তাদের মাধ্যমেই শহিদুলের এ করুণ পরিণতির কথা জানতে পারেন তার স্বজনরা। শহিদুল তাদের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে টাকা ও টিকিট পাঠিয়ে যেন তাকে ফেরত আনা হয়। শহিদুলের স্বজনরা জানান, ঋণ করে তাকে ৩ লাখ টাকা দেয়া হয়েছিল ওমান যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওই ঋণ অপরিশোধিতই রয়েই গেছে। এখন তাকে ফিরিয়ে আনতে আরও টাকার প্রয়োজন। এ সব ভেবে তার পরিবার এখন দিশেহারা। ফিরে আসা বাংলাদেশীরা জানান, অন্যান্য দেশের লোকজন স্বচ্ছন্দে কাজ করলেও বেশ বিপদে রয়েছেন বাংলাদেশীরা। পাতাকার (কাজের অনুমতিপত্র) মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারছেন না।

বরং এক্ষেত্রে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। পাতাকার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য টাকা দিচ্ছেন কিন্তু মেয়াদ বাড়ছে না। আশায় আশায় থেকে অবশেষে ওমানি পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে জেল খাটছেন। তাদের দেয়া তথ্যমতে শুধু সুয়ার হাউজ জেলেই আছে ৫ শতাধিক বাংলাদেশী কর্মী। তবে আসলেই কতজন বাংলাদেশী সে দেশের জেলগুলোতে আটক রয়েছেন- তা জানা যায়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগও এর পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি। ফিরে আসা মুন্সিগঞ্জ উপজেলার সিরাজদিখান উপজেলার আরিফ জানান, তিনি ২২শে মে পুলিশের কাছে আটক হয়ে জেলে যান। এরপর থেকে প্রায় ২০-২৫ জনের কাছে বাড়ির যোগাযোগ নম্বর দিয়েছিলেন কিন্তু কোন কাজ হয়নি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দূতাবাস চাইলেই তাদেরকে আগেই পাঠিয়ে দিতে পারতো।

কিন্তু সে ধরনের কোন সহযোগিতা পাননি তারা। তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা আটক হওয়ার পরপরই সে দেশের দূতাবাস তাদের খোঁজ-খবর নিতে আসে। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ফিরে আসা নোয়াখালী উপজেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ভবানী জীবনপুর গ্রামের তাজউদ্দিন বলেন, ওমানে বাংলাদেশীরা বেশ আতঙ্কের মধ্যে আছে। যাদের ভিসার মেয়াদ আছে তাদেরকেও পুলিশ ধরছে। তবে কেন ধরছে তা কেউ বলতে পারছে না। সাড়ে ৩ বছর আগে তিনি ওমান যান। পাতাকার মেয়াদ বৃদ্ধি করতে তিনি টাকাও দিয়েছেন কিন্তু ফল পাননি। তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার পারভেজ ২ বছরের ভিসা নিয়ে সে দেশে গেছেন। কিন্তু দুই মাস কাজ করার পর সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে।

তিনি বলেন, পারভেজ কনস্ট্রাকশনের কাজ করতেন। একদিন সকালে হঠাৎ তাকে আটক করা হয়। পারভেজ জানেন না কেন তাকে আটক করা হয়েছে। অথচ তার ভিসার মেয়াদ রয়েছে এক বছরেরও বেশি। পারভেজকে প্রথমে সেদেশের ইসমাইল জেলে রাখা হয়। পরে তাকে সুয়ার হাউজ জেলে স্থানান্তর করা হয়। তিনি তাজউদ্দিনকে জানিয়েছেন, ওই জেলে প্রায় ৭০০ জনের মতো বাংলাদেশী রয়েছে। তাজউদ্দিন জানান, তার ভাইয়ের মাধ্যমে তিনি ওমান যান। কিন্তু পাতাকার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি ধরা পড়েন।

তবে তিনি বলেন, মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য পুলিশ টাকা নিলেও তা করেনি। তিনি আরও জানান, তার ভাইও সেখানে কাজ করছেন। তারও পাতাকার মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ১ বছর আগে। তিনিও টাকা দিয়েছেন মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য কিন্তু বৃদ্ধি করবে কিনা অনিশ্চিয়তায় রয়েছেন। এদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেউ চলে না এলে যতদিন সেখানে থাকবে ওই হিসেবে প্রতি মাসে ৩০ ওমানি রিয়েল দিতে হয়। অন্যদিকে যতদিন পাতাকা না পাবে ততদিনও একই পরিমাণ রিয়াল সংশ্লিষ্টদের দিতে হয়। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার হাসান জানান, তিনি ৪ লাখ টাকা খরচ করে ২ বছরের ফ্রি ভিসা নিয়ে সে দেশে যান।

কিন্তু ২ মাস কাজ করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে। কেন তাকে আটক করা হচ্ছে- এমন কথা বলারও সুযোগ দেয় না। পাসপোর্ট ভিসা ছিনিয়ে নেয়। তিনি জেলখানার দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, তাকে প্রায়ই মারধর করা হতো। দিনে একবার খাবার দিতো। মোবাইলে কথা বলারও সুযোগ নেই। বাড়িতে খবর পাঠাবো সে সুযোগও নেই। তিনি বলেন, দেশে এসে আমি গত ৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, দূতাবাসের লোকজনের কাছে দুর্ভোগের কথা বললে তারা গুরুত্ব দেন না। অনেকের কাছে টাকা থাকলেও সহযোগিতার অভাবে দেশে ফিরতে পারছেন না। আবার অনেকের কাছে টাকা নেই। এক্ষেত্রে দূতাবাস যদি সহযোগিতা করতো তাহলে দুর্ভোগ কমতো।

এদিকে ওমানে কতজন কর্মী বর্তমানে কারাভোগ করছেন তার কোন পরিসংখ্যান দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জনশক্তি রপ্তানি ব্যুুরো, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ শাখায় যোগাযোগ করেও এ সংক্রান্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসে ফোন করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026