বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৯

একটি ফুল ও ছোটদের প্রেম-ভালবাসা

একটি ফুল ও ছোটদের প্রেম-ভালবাসা

এইত ক’দিন আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সিএনএন একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। ছবিটিতে দেখা যায়- স্পেনের ভালডেনোসেডার একটি সমাধিতে ৫-৬ বছর বয়সী ছোট একটি ছেলে একটি ছোট মেয়েকে ফুল দিচ্ছে। এসময় আরেকটি ছোট মেয়েকে মন খারাপ করে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

জানি না, ওই তিন শিশুর প্রেক্ষাপট কী ছিল, তবে সেখানেও যে প্রেম-ভালবাসার একটা কাহিনী নিহিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরাও শিশুদের পছন্দ করি, ভালবাসি। ইসলামেও শিশুদের ভালবাসা সুন্নাত।অন্য ধর্মেও শিশুদের ভালবাসার কথা বলা আছে।

আল্লাহর রাসূল এবং অন্য ধর্মের মনিষীরাও শিশুদের ভালবাসতেন। শিশুরা দেখতে সুন্দর, তাদের হাসি-কান্না, কথা-বার্তা, চলাফেরা, খেলাধূলা সব কিছুতেই যেন সৌন্দর্য্যের অপূর্ব সমাহার। সব চেয়ে বেশি সুন্দর শিশুদের ভালবাসা। যেখানে নেই কোনো খাঁত, নেই কোনো কপটতা। ওই ভালবাসায় যেন পবিত্রতার ছুঁয়া।

প্রসঙ্গত, একটি শিশু জন্মের কিছুদিন পর যখন তার বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী কিংবা অন্য কোনো স্বজনকে সম্বোধন করে তখন যেন খুশিতে সবার হৃদয় বিগলিত হয়ে যায়। ছোট কচি খোকার এমন সম্বোধনের চেয়ে ভাল লাগার আর কী থাকতে পারে!

তাই কে না ভালবাসতে চায় শিশুদের!

তবে আমরা যে শিশুদেরকে ভালবাসি সে কথা কিন্তু বিভিন্নভাবে ফুটিয়ে তুলি। আর সব সময় বড়দের প্রেম-ভালবাসা নিয়ে ঘাটাঘাটি করি। আর তাই নাটক-সিনেমা, গল্প-কবিতায় সর্বত্রই বড়দের তথা তরুণ-তরুণীদের প্রেম-ভালবাসার ছাপ। এতে সহজেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে প্রেম-ভালবাসা কি শুধু বড়দেরই সম্পত্তি? ছোটরা শুধু বড়দের কাছ থেকে ভালবাসা পেয়ে থাকে, তাদের মাঝে এসব কোনো কিছু নেই?

প্রেম ভালবাসা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। মনিষীরা অনেক কথাই বলেছেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, আনন্দকে ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি হচ্ছে প্রেম।

আইরিশ অভিনেত্রী ম্যালানি ক্লার্ক বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই ভালোবাসার ওপর মূল্য নির্ধারণ করতে পারি না, কিন্তু ভালোবাসার জন্য দরকারি সব উপকরণের ওপর মূল্য নির্ধারণ করতেই

অস্কার ওয়াইল্ড বলেন, ‘আমি সেই নারীকে ভালবাসি যার অতীত আছে আর সেই পুরুষকে ভালবাসি যার ভবিষ্যত আছে।’

সমরেশ মজুমদারের ভাষায় ‘ছেলেরা ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে যে কখন সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলে তারা তা নিজেও জানে না। মেয়েরা সত্যিকার ভালোবাসতে বাসতে যে কখন অভিনয় শুরু করে তারা তা নিজেরাও জানে না।’

জর্জ বার্নাডশ বলেন, ‘ভালবাসার ব্যাপারে পুরুষরা চিরকালই শিকার, আর মেয়েরা শিকারী, একজন শিকারী যেমন শিকারের জন্য তার বন্দুককে ভালবাসে, একজন মেয়ে মানুষও তেমনি সৃষ্টির প্রয়োজনে পুরুষকে ভালবাসে। এ ভালবাসা বন্দুকের প্রতি শিকারীর প্রেম ভালবাসার সঙ্গেই একমাত্র তুলনীয়।’

মেরী বেকার হার্ডির মতে ‘যে গভীরভাবে ভালবাসতে জানে বয়স তার কাছে কোন বাধা নয়।’ ডেল কার্নেগীর ভাষায় ‘পৃথিবীতে ভালবাসার একটি মাত্র উপায় আছে, সেটা হল প্রতিদান পাওয়ার আশা না করে শুধু ভালবেসে যাওয়া।’

কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘যে ভালবাসা দুজনকে দুদিক থেকে আকর্ষন করে মিলিয়ে দেয়, সেটা ভালবাসা নয়, সেটা অন্য কিছু বা মোহ আর কামনা।’ অনেকের মতে, দু’জনের সখ্যতার আরেক নাম ভালবাসা। আর এই ভালবাসা মানুষের জন্মগত প্রবণতা। সব বয়সের সব মানুষের মাঝেই আছে।

সন্তানের প্রতি মাতার ভালবাসা, পিতার ভালবাসা, মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের ভালবাসা, ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের ভালবাসা, ভাইয়ের প্রতি বোনের ভালবাসা, বোনের প্রতি ভাইয়ের ভালবাসা, বোনের প্রতি বোনের ভালবাসা, মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা। প্রতিটি ভালবাসাই আলাদা স্বকীয়তার স্বাক্ষ্য বহন করে। আবার তরুণ-তরুণীর ভালবাসা, স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা ইত্যাদি।

তাই বলা হয়ে থাকে প্রেম-ভালবাসা মানুষের চিরন্তণ প্রবণতা। ফলে প্রেম যে শুধুই বড়দের বিষয় না, তা সহজেই বলা যায়।

প্রসঙ্গত, ছোটকালে আমরাও প্রেম-ভালবাসার বাইরে ছিলাম না। আজও স্মরণে আছে- আমার এক মামাতো বোন ছিল, তার আর আমার বয়সের ব্যবধান মাত্র ৭দিনের। ফলে সেই একেবারে ছোটকাল থেকেই লেখাপড়া, ঘুরাফেরা, খেলাধূলা, খাওয়া-ধাওয়া, ঘুমানো অর্থাৎ সব কিছুতেই আমরা পরস্পরের সাথী ছিলাম। একে অপরকে ছাড়া যেন আমাদের এক মুহূর্তও চলতো না। আমাদের এই সম্পর্ক দেখে অন্যদের ঈর্ষা হতো।

এছাড়া স্কুল জীবনেও সহপাঠীদের পরস্পরকে অনেক ভালবেসেছি। ক্লাশের ফাঁকে অনেক ঘুরাফেরা ও আড্ডা দিয়েছি। খেলাধূলার সাথি হয়েছি, পড়ার সাথি হয়েছি। কই কোনো দিন তো অন্য কোনো কিছু ভাবিনি, অসততা ও অপবিত্রতা আমাদের স্পর্শ করেনি কিংবা কারো পক্ষ থেকে কোনো আপত্তিও উঠেনি।

কিন্তু আজকাল প্রেম-ভালা নিয়ে কী হচ্ছে? আর সেসব প্রেম-ভালবাসার অবাধ প্রচার-প্রসার শিশুদের উপরও এর প্রভাব পড়ছে। এইত কিছু দিন আগে একটা নিউজটা পড়ে রীতিমত ভীমরি খেলাম। রাজধানীর রায়েরবাজারে প্রেম ঘটিত কারণে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রীর আত্মহত্যা। প্রেমঘটিত কারণে দিনাজপুরে ৫ম শ্রেণীর ছাত্রীর আত্মহত্যা।

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, কেন যেনো এমনটাই বাস্তব হচ্ছে প্রতিদিন। একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে আমাদের চারপাশটা। প্রেমের নাম করে যৌনতার অবাধ বানিজ্যিকরণের প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপরও। এর দায় কাদের?

শহর তো বটেই, পাল্টে যাচ্ছে আমাদের গ্রামবাংলার চিত্রও। আমাদের গ্রাম একেবারে অজপাড়া গাঁ ছিল। কয়েক বছর আগেও যেখানে বিদ্যুতের আলো ছিল না। কিন্তু আজ সেই গ্রামেই ঘরে ঘরে টেলিভিশন, হয়েছে বিউটিপারলার এবং আমাদের বোন-ভাবী, খালা-ফুফুরা সেখানে গিয়ে সিরিয়ালের নায়িকাদের মত সাজগোজ করছে। চলাফেরায় তাদের মধ্যে এখন আধুনিকতা।

আমার ই ভীমরি খাবার যোগার! এর সাথে সাথে আমাদের পুরনো কিছু সংস্কৃতির সমাধি! এবার শহরে আসুন। আমার মনে হয়না ঢাকাতে এমন কোন মহিলা বা মেয়ে আছে যারা ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের ভক্ত নয়। আমি নিজে্ও স্কুলের সামনে মহিলাদের এমন সিরিয়াল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুনেছি। এর ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরাও আলট্রা মডার্ন হয়ে উঠছে এবং ইন্ডিয়ান প্রতিটা দিবস, জাতীয়দিন, পূজা, ফ্যাশান সম্পর্কে রীতিমত বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে।

আমিও কয়েকটি সিরিয়াল দেখার চেষ্টা করেছি। আশ্চর্য হলেও সত্য যে প্রতিটা সিরিয়াল এর কাঠামো এবং কাহিনি খুব ই কাছাকাছি। পরকিয়া এবং অমুলক সন্দেহ হল এই সব সিরিয়াল এর আজকাল পত্রিকা গুলোতে স্বামীরহাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, ছেলেমেয়ের হাতে পিতা মাতা, ভাই বোন খুন হবার মেলা খবর দেখা যায়। আমি স্বীকার করি যে সমস্ত কিছুই সিরিয়ালের জন্য হয়না।

কিন্তু বাংলাদেশে পরকিয়া কে ব্যাধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে কিন্তু এই সিরিয়াল। সবার মনে সন্দেহ ঢুকিয়েছে এই সিরিয়াল। নৈতিকতার সর্বনাশ করেছে এই সিরিয়াল। কথায় কথায় ডিভোর্স, সম্পর্ক ভাঙ্গাও সিরিয়ালের অবদান। পারিবারিক হিংসাও এর ই সৃষ্টি। কেউ মানুক আর না মানুক, এগুলো সত্যি ও বাস্ত।

আমাদের দেশের চ্যানেল গুলোর ব্যর্থতাও এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। টি ভি চ্যানেল গুলো অতি মাত্রায় ব্যবসায়ী আচরন করে। বাঙলা চ্যানেল দেখতে বসলেই বিরক্ত লাগে। বিজ্ঞাপন আর ফালতু কাহিনীর নাটক দিয়ে চ্যানেল গুলো ভর্তি। খবর আর টক শো গুলো না থাকলে কি হত বলা মুশকিল। ইন্ডিয়ানদের চেয়ে আমাদের মেধা মনন কম নেই।

তবে কেন এই হাল! শিশুরা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছিলো বলে বিভিন্ন কার্টুন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হল। কিন্তু তাদের জন্য কি বিকল্প বিনোদন ব্যবস্থা হয়েছে? সেই তো কম্পিউটার গেম ই ভরসা। আজকাল তো বাচ্চারা মাঠেও খেলার সুযোগ পায়না পড়ালেখার প্রতিযোগিতা আর মাঠের অপ্রতুলতার জন্য। তাদের শৈশবের কি কোন মূল্যই নেই ! দোষ কি খালি শিশুদের। মা-বোনরাই তো তাদের পাশে বসিয়ে ওইসব আজগুবি পরকিয়ার সিরিয়াল দেখাচ্ছেন।

ঈদ-পূজার বাজারে খালি ইন্ডিয়ান পোশাক (নামও ইন্ডিয়ান সিরিয়াল, মুভির নামে!)। সব কিছুই ইন্ডিয়ান। আবার কিছু হলেই ইন্ডিয়ানদের দোষ। তারা আমাদের বাজার নিয়ে যাচ্ছে। আরে, আমরাই তো ডেকে ডেকে তাদেরকে দিচ্ছি!

কোথায় প্রেমের কচকচানি নেই ? নাটক, শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞাপন, গান, সিনেমা সব জায়গায় প্রেম। ছোটবেলা থেকেই যখন একটা শিশু এসব দেখে বড় হতে থাকে, তখন এই প্রেম জিনিসটার প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মায়। তাই দেখা যাচ্ছে টিনএজের শুরুর দিকেই বেশীরভাগ ছেলেমেয়ে জড়িয়ে পড়ছে প্রেমে। বয়ঃসন্ধির সময়টা এমনিতেই সবার জন্য একটি সঙ্কটকাল।

তাই প্রেম ঘটিত কারণে অতি আবেগের বশবর্তী হয়ে তারা আত্মহত্যার মত কাজ্ও করে ফেলছে। এর পিছনে যে জিনিসটা বেশী কাজ করছে, সেটা হলো টিভি চ্যানেলগুলো। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত টিভি চ্যানেল না থাকায়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত অনুষ্ঠাণগুলো দেখতে হচ্ছে শিশুদের। যার ফলে শিশুদের মনোজগতে এই বিষয়গুলো বেশী আগ্রহ তৈরী করছে।

অবাক লাগে, যখন দেখি শিশুদের জন্য নির্মিত রিয়েলিটি শো গুলোতে শিশুদের দিয়ে বড়দের গান গাওয়ানো হচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের গানে শিশুদের নাচানো হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে শিশুদের মনোজগতকে। আরেকটা বিষয় মোবাইল-ইন্টারনেট। যেটার ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হয় কিশোরীরা।

বেশীরভাগ বাবা-মাই এখন প্রাইমারী স্কুলে থাকা অবস্থাতেই শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। যার ফলে মোবাইলের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে অল্প বয়সেই। এ ক্ষেত্রে সমাধান কি? তা নিয়ে আমাদের ভাববার সময় এসেছে। আমাদের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তরা শিশু অধিকার নিয়ে অনেক গলাবাজিই করেন। কিন্তু তারা কি শিশুবান্ধব পরিবেশ নিয়ে একটু কখনো

ভেবে দেখেছেন?

সবশেষে, এ দেশের শিশুরা বেড়ে উঠুক শিশুবান্ধব পরিবেশে। সুস্থ সংস্কৃতি অর সুস্থ মননের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠুক। আর এক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং অভিভাবকদের সচেতনতাই পারে শিশুদের একটি সুন্দর পরিবেশ উপহার দিতে।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক এবং কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026