বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১৩

জট খুলছে না চট্টগ্রামের মাদ্রাসা বিস্ফোরণ ঘটনা

জট খুলছে না চট্টগ্রামের মাদ্রাসা বিস্ফোরণ ঘটনা

শীর্ষবিন্দু নিউজ: চট্টগ্রামের জামেয়াতুল উলূম আল ইসলামিয়া মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে ধূম্রজাল কাটছে না। এই ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে হেফাজতের নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী ও তার ছেলের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।

মুফতি ইজহার উল্লিখিত পরিচালক। শুরু থেকেই তিনি দাবি করে আসছেন কম্পিউটারের ইউপিএস থেকে বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গ্রেনেড উদ্ধারের দাবি করছে।  তারা বলছে, সেখানে একটি কক্ষে বসে মাদরাসার কয়েক ছাত্র ককটেল ও বোমা  তৈরি করছিল। এক পর্যায়ে সেগুলোর বিস্ফোরণ হয়। মুফতি ইজহার হেফাজতে ইসলামের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। পাশাপাশি বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি।

বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হয়ে গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম হাবিবুর রহমান (২০)। তিনি ওই মাদরাসার দারুল ইফতা (ফতুয়া) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে আরও ৫ ছাত্র হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জামেয়াতুল উলূম আল ইসলামিয়া মাদরাসার চার তলা ছাত্রাবাস ভবনের দোতলার একটি কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর ওই কক্ষের সব আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘরের সিলিং ফ্যান বাঁকা হয়ে গেছে। কক্ষের দেয়ালের একটি অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে।

মাদরাসা ছাত্ররা জানান, কক্ষের ভেতর কম্পিউটারের ইউপিএস ও ল্যাপটপ ছিল। ঘটনার দিন সোমবার সকাল ১১টায় ১০-১২ জন ছাত্র সেখানে বসে কথা বলছিল। এই সময় একজন ছাত্র কম্পিউটার অন করার পর হঠাৎ করেই ইউপিএস-এ বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ছিটকে পড়ে। আওয়াজ শুনে মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক ও ছাত্ররা দ্রুত ছুটে যান। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় দুই ছাত্রকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে একজনের শরীরের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। অন্যজনের একজনের বেশ কয়েকটি আঙুল উড়ে গেছে।

কর্তৃপক্ষ জানান, বিস্ফোরণের পরপরই রুমটিতে আগুন ধরে যাওয়ার পর তা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে লোকজন পানি ও বালি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হেফাজতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারের ছেলে মুফতি হারুন বলেন, আমরা সরকারের রোষানলে পড়েছি। পুলিশ হয়রানি করতে নাটক সাজাচ্ছে।

অন্যদিকে তার এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনাটি সত্যি। প্রথমে আমাদের বিশেষজ্ঞ দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। পরে মাদরাসার ভেতর থেকে বেশ কয়েকটি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।

মামলা-তল্লাশি: লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলূম আল ইসলামিয়া মাদরাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার খুলশী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ১২-১৫ জনের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করেছে। এদের মধ্যে প্রধান আসামি করা হয়েছে মুফতি ইজহারকে। দুই নম্বর আসামি হয়েছেন তার ছেলে হারুন ইজহার। থানার এসআই গোলাম নেওয়াজ বাদী হয়ে এসব মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক দ্রব্য তৈরি করা, প্রস্তুত ও সেগুলো সরবরাহ করার সময় অভিযুক্তরা জড়িত। তাই পুলিশ বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। অন্য মামলাটি করা হয়েছে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনে।

কেননা গত সোমবার রাতে মাদরাসায় বিস্ফোরণের ঘটনার পর মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজারের বাসায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। ওই সময় সেখান থেকে ১৮ বোতল এসিড জব্দ করে তারা। রাত সাড়ে সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে এসব এসিড জব্দ করা হয়। নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) হারুনুর রশিদ হাজারী এই বিষয়ে বলেন, মুফতি ইজহারের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে প্রথমে ৮ বোতল এসিড জাতীয় পদার্থ জব্দ করা হয়। পরে বাসার বিভিন্ন কক্ষ থেকে আরও ১০ বোতল এসিড জব্দ করা হয়। এই সময় মুফতি ইজহারের পরিবারের কোন সদস্যকে সেখানে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় অভিযুক্ত থাকার অপরাধে খুলশী থানা পুলিশ অপর মামলাটি দায়ের করে।

এই মামলাতেও মুফতি ইজহারুল ও তার  ছেলে হারুন ইজহারকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মামলা দু’টি দায়ের করা হয়। খুলশী থানার ওসি মাইনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, যেসব অপরাধে তাদেরকে মামলায় রাখা হয়েছে সেগুলো আইনত দণ্ডনীয়। মাদরাসায় রাখা বোমা বিস্ফোরকের আলামত হিসেবে পুলিশ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। তাছাড়া যে কক্ষে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে শক্তিশালী বোমার আলামত পাওয়া গেছে। বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।

তিনি আরও বলেন, যদি বোমা নাই বা তৈরি হতো তাহলে সেখানে হাতের কব্জি পড়ে থাকতো না। মামলা দায়েরের পর এখন অভিযুক্তদের ধরতে শিগগিরই অভিযানে নামবে পুলিশ। বিস্ফোরণের পর গতকাল মঙ্গলবারও পুলিশের কড়া নজরদারি দেখা গেছে লালখান বাজারের ওই মাদরাসায়। সেখানে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা গ্রেপ্তার কিংবা আটক আতঙ্কে রয়েছে। কয়েকজন ছাত্র আলাপকালে জানান, ঘটনার পর থেকেই তাদেরকে মাদরাসা থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না।

তবে হেফাজতে ইসলামের নেতারা মনে করছেন, দলীয় একজন শীর্ষ নেতার মাদরাসা হওয়াতে তাদের ওপর খড়গ চালাচ্ছে সরকার। আর এই কাজে তারা পুলিশকে দিয়ে হয়রানি করছে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এই বিষয়ে বলেন, মুফতি ইজহার হেফাজতের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তার মাদরাসায় কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেখানে গরিব, মেধাবী ছাত্রদের আর্থিক সহায়তায় পড়ানো হয়।

ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘কম্পিউটারের ইউপিএস থেকে বিস্ফোরণ হওয়া সম্ভব কিনা তা আপনারা যাচাই করে দেখুন। এখন একটা আওয়াজ হলে পুলিশ সেটাকে প্রথমে ককটেল, এরপর বোমা, শেষমেশ গ্রেনেড বলে চালিয়ে দিচ্ছে। হয়রানি করতে আবার মামলা দায়ের করেছে। নাটক কারা করছে তা সবার কাছেই পরিষ্কার। মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু: এদিকে সোমবার লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলূম আল ইসলামিয়া মাদরাসায় বিস্ফোরণে আহত হন সেখানকার ৫ ছাত্র।

এদের মধ্যে গুরুতরভাবে আহত হয়ে ভোর ৪টায় মারা গেছেন হাবিবুর রহমান। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও ৪ জন। তাদের বেশির ভাগেরই শরীর ঝলসে গেছে। এরা হলেন- আবদুল করিম, জব্বার, আবদুল মান্নান ও আমান উল্লাহ। এই ঘটনায় মাদরাসায় দেখা করতে আসা নুরুন্নবী নামের এক ছাত্রও গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান মৃণাল কান্তি দাস বলেন, একজন গুরুতরভাবে আহত আছেন। বাকিদের বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। তবে বেশির ভাগ ব্যক্তিরই শরীর পুড়ে গেছে। তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026