শীর্ষবিন্দু নিউজ: পুরো দেশজুড়ে এক ধরনের হাহাকার পড়ে গেছে। আতংক, উত্তেজনা ও উদ্বেগের বাস করতে হচ্ছে বাংলার জনগণকে। নির্বাচনের দিন গণনার শুরুতে শুক্রবার দুই প্রধান দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। সহিংসতার আশঙ্কায় বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। যার প্রভাব পড়েছে পুরো দেশে।
রাজধানীতে যে কোনো মূল্যে শুক্রবার বিএনপির সমাবেশ করার ঘোষণায় বৃহস্পতিবার থেকেই নগরীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান করছে পুলিশ। অন্যান্য দিনের তুলনায় রাস্তায় গাড়ি চলাচল ছিল অনেক কম। সহিংসতার আশঙ্কায় কোথাও দোকানপাটও বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। রাজধানীর আসাদগেট, নিউমার্কেট, চানখারপুল, প্রেসক্লাব, বঙ্গবাজার, রায় সাহেব বাজার রোড, নর্থ সাউথ রোড, পল্টন, শান্তিনগর, মালিবাগ, মতিঝিল, মহাখালী এলাকা ঘুরে এমন দৃশ্য মিলেছে। বিভিন্ন সড়কের মোড়ে চলছে পুলিশের তল্লাশি। মোটরসাইকেল আরোহীদের ব্যাপক পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হতে হচ্ছে।
শর্তসাপেক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওই সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। একই দিন সমাবেশের অনুমতি চেয়ে তা না পেলেও রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ২৫ অক্টোবর নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই গত ১৮ অক্টোবর নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তাতে অংশ নিতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর দুদিনের মাথায় বিএনপি চেয়ারপারসন পাল্টা প্রস্তাবে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা তুলে ধরে তা নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান, যাকে ‘অবাস্তব’ অভিহিত করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
রাজধানীর নবাবগঞ্জ রোডের এক ব্যবসায়ী জানান, সহিংসতার আশঙ্কায় তিনি দোকান বন্ধ রেখেছেন। ২৫ অক্টোবর দেশে কী ঘটে, তা দেখে দোকান খুলবে। তার আগে দোকান খুলে কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। নর্থসাউথ রোডের স্টিলের দোকানের কর্মচারী মো. সেলিম জানান, সকালে দোকান খোলার পর বেলা ২টার মধ্যে তার মালিক দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন।
পল্টন থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক বজলুর রহমান বলেন, ২৫ অক্টোবর ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এ থানা এলাকায় মোট সাতটি অস্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি কাজ করছে। এদিকে বুধবার রাজধানীর দক্ষিণখান থানা ও টঙ্গী থানা এলাকার খুব কাছে কয়েকটি হাতবোমা বিস্ফোরণের পর রাজধানীর প্রত্যেকটি থানা এলাকায় পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের রমনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন। সত্যতা মিললো মতিঝিল থানাসহ বিভিন্ন থানায় গিয়ে। সেখানে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাতে সংসদে বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের সঙ্গে জড়িতদের দমনে রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দেশব্যাপী জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার প্রেক্ষাপটে ঢাকার পর চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, খুলনা, নাটোর, ফেনী, খাগড়াছড়িতে সভা সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও বিএনপি বলেছে, তাদের নির্ধারিত সমাবেশ হবে। এসব স্থানে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন রয়েছে দুপুরের পর থেকে। থানাগুলোতেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে পুলিশ সদস্যদের। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে লালদীঘি ময়দানেও পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বিএনপি। রাতে অবশ্য তাদের অনুমতি দেয়া হয়।
১৮ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে ২৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগরীর জনসভাসহ সারাদেশের সকল জেলা ও উপজেলায় ঘোষিত শান্তিপূর্ণ জনসভা-সমাবেশের কর্মসূচি সর্বাত্মকভাবে সফল করার জন্য রাজধানী ঢাকা মহানগরবাসীসহ সারাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেছে, সরকার রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জামায়াত-শিবির, বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের গণ গ্রেপ্তার করছে।
বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগ এবং ঢাকার দলীয় সাংসদের এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর বাইরেও ছাত্রলীগকে জুমার নামাজে অংশ নিতে বলা হয়েছে। ছুটির দিন হলেও এই ছাত্র সংগঠন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকবে।
এদিকে নাশকতার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার বগুড়া, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, বাগেরহাট ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে বগুড়ায় আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতিসহ তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জামায়াতের আমির, বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতিসহ তিন নেতা, বাগেরহাটে জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ও জেলা ছাত্র কল্যাণ সম্পাদক এবং নরসিংদীতে বিএনপি ও জামায়াতের চার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিএনপি কার্যালয়ে সমাবেশ করেছে বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ। বেলা ৪টার দিকে নগরীর নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয়ের সামনের মাঠে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করে তারা। সমাবেশে আনুমানিক ৩০ জন পেশাজীবী ছাড়াও বিএনপির প্রায় দুইশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাজধানীতেও জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপি সমর্থক শিক্ষকদের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে এক্ষেত্রে পুলিশের অনুমতি পেয়েছিল তারা। সমাবেশে নির্বাচনের দিন গণনার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাজোট সরকার ‘অবৈধ হয়ে যাবে দাবি করে তাদের হঠাতে দুর্বার আন্দোলনে নামার নির্দেশ দেন তিনি।