শীর্ষবিন্দু নিউজ: একাত্তরে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের এই ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক। পলাতক থাকায় তাদের ক্ষেত্রে আপিল প্রযোজ্য হবে না।
এ আদালতের অপর দুই বিচারক বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও শাহিনুর ইসলামও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তারা ১৫৪ পৃষ্ঠার এই রায়ের ৪১ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্তসারের রায়ের দুটি অংশ পড়েন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি নবম রায়। আগের আটটি রায়ে জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান ছয়জন এবং বিএনপির দুই নেতাকে দণ্ডাদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনও এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দীন কীভাবে আল বদর সদস্যদের নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যার পর বধ্যভূমিতে লাশ গুম করেছিলেন, তা উঠে এসেছে এই রায়ে। আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন সেই হত্যাকাণ্ডের চিফ এক্সিকিউটর। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার অপারেশন ইনচার্জ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশরাফুজ্জামানের নাখালপাড়ার বাসা থেকে উদ্ধার করা তার ব্যক্তিগত দিনপঞ্জিতে এই হত্যা পরিকল্পনা ও একটি তালিকাও পাওয়া যায়।
তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. সিরাজুল হক খান, ড. মো. মর্তুজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, সৈয়দ নাজমুল হক, এএনএম গোলাম মুস্তাফা, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং চিকিৎসক মো. ফজলে রাব্বি ও আলিম চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগে এই মামলার রায় দিল আদালত।
আসামির অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে রায় হওয়া দ্বিতীয় মামলা এটি। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার হয় এবং বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার জনাকীর্ণ আদালতে এ মামলার রায় ঘোষণা করে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি অভিযোগের সবগুলোতেই দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় জন শিক্ষক, ছয় জন সাংবাদিক ও তিনজন চিকিৎসকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যা করেন। আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকার করার নির্দেশ দিয়ে বিচারক বলেন, আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ না দিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।
চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের বিবরণ: চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের জন্ম ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে, ফেনীর দাগনভূঞা থানার চানপুর গ্রামে। তার বাবার নাম দেলোয়ার হোসাইন। একাত্তরে মুঈনুদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র। দৈনিক পূর্বদেশের নিজস্ব প্রতিবেদক হিসাবেও তিনি কাজ করেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকার কথা নিজের ওয়েবসাইটে দেয়া বিবৃতিতে স্বীকারও করেছেন মুঈনুদ্দীন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে মুঈনুদ্দীন ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের একজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য। সেই হিসাবে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতার জন্য গড়ে তোলা আলবদর বাহিনীতেও তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দায়িত্ব দেয়া হয়। যুদ্ধের শেষভাগে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
মুঈনুদ্দীনের পরিবারের সদস্যরাও সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা নেয় বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুঈনুদ্দীন পালিয়ে পাকিস্তান চলে যান। সেখান থেকে যান যুক্তরাজ্যে। এখন পর্যন্ত তিনি লন্ডনেই অবস্থান করছেন। লন্ডনে জামায়াতের সংগঠন দাওয়াতুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক দাওয়াতের বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। মুঈনুদ্দীন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের একজন পরিচালক, মুসলিম এইডের ট্রাস্টি এবং টটেনহ্যাম মসজিদ পর্যদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
আশরাফুজ্জামান খান এর বিবরণ: আশরাজ্জামান খানের জন্ম ১৯৪৮ সালে গোপালগঞ্জের মকসুদপুরের চিলেরপাড় গ্রামে। বাবার নাম আজহার আলী খান। ১৯৬৭ সালে সিদ্ধেশ্বরী ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর আশরাফুজ্জামান ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী স্টাডিজ বিভাগে। ওই বিভিগ থেকেই ১৯৭০ সালে স্নাতক ডিগ্রি পান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুজ্জামান।
মক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা আল বদর বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়ার দাযিত্ব আশরাফুজ্জামানের ওপর বর্তায়। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারী নেতা হিসাবেও তাকে অভিযুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, আশরাফুজ্জামান ছিলেন আল বদর বাহিনীর গাজী সালাউদ্দিন কোম্পানির কনান্ডার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পালিয়ে পাকিস্তনে চলে যান এবং কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। পরে সেখান থেকৈ চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে আশরাজ্জামান খানের ঠিকানা নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা। ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।