সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০২

দেনা শোধ করতে সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ ডিসিসি’র

দেনা শোধ করতে সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ ডিসিসি’র

আহমেদ জামাল: দেনায় জর্জরিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। এই দেনা শোধ করতে এবার নিজস্ব সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইছে সেবা সংস্থাটি। এজন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।

কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। দেনাও পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এ পর্যায়ে পাওনাদারের যন্ত্রণায় দিশাহারা এই সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিষয়টি স্বীকার করেন দক্ষিণ ডিসিসি’র প্রশাসক ইব্রাহীম হোসেন খান। তিনি বলেন, আপাতত সম্পত্তি (মার্কেট) বিক্রি ছাড়া এই আর্থিক সঙ্কট মেটানো সম্ভব নয়।

প্রশাসক আরও বলেন, নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে ১২০ কোটি টাকার বিল বকেয়া পড়ে আছে। এই বিল আদায়ে ঠিকাদাররা প্রতিনিয়ত ধর্না দিচ্ছেন। নানা মাধ্যমে দেন দরবার করছেন। বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল আজহার কারণে পাওনাদারদের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু তহবিল না থাকায় কিছুই করা যাচ্ছেনা। অন্তত একটি মার্কেট বিক্রি করতে পারলে এই মুহূর্তে ঠিকাদারদের কিছু দেনা পরিশোধ করে স্বস্তি পাওয়া যেতো।

ডিসিসি’র প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার দুলাল হোসেন বলেন, ২৬ বছর এই সংস্থার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছি। কখনও এমন আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়নি। ঠিকাদারী কাজে বেশ কিছু টাকা আটকা পড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাকিতে নির্মাণ সামগ্রী কিনে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করেছি। কিন্তু বিল না পাওয়ায় সেই টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। ডিসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, নতুন-পুরাতন মিলে ৩-৪টি মার্কেট বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। দু’একটি মার্কেট বিক্রি করতে পারলে এই দেনা পরিশোধ হয়ে যেতো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সংস্থার কর্মকর্তা কর্মচারিদের মাসিক বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে লাগে প্রায় ১১ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে কোন খাত থেকে ডিসিসি’র এই টাকা আয় হয় না। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বিভক্তির পর থেকে এই ব্যয় বাড়তে থাকায় মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাটি। ২০১২ সালের মে মাসের পর  থেকেই অর্থ সঙ্কটে ভুগছে। ক্রমাগত আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ সঙ্কট ঘণীভূত হয়েছে।

ডিসিসি’র দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ সিটির আওতায় আছে মন্ত্রী পাড়া। একাধিক পার্ক, সরকারি হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব কিছু থেকে তেমন কোন কর-খাজনা পাওয়া যায় না। আয়তনের দিক থেকেও উত্তর সিটির অর্ধেক দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। উত্তরে সম্পত্তি হস্তান্তর খাতে আয় হয় বছরে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে এ খাতে দক্ষিণের আয় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। ফলে স্বাভাবিক কারণে এখানে আর্থিক সঙ্কট ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭০ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই মাস থেকে এ বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ট্যাক্স আদায় হয়েছে মাত্র ৯০ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছে ৭৬০০ জন। এর মধ্যে ১৮০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। বাকি ৫৮০০ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তারা জানান, গত জানুয়ারি মাসে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হয়েছে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। এর আগের মাস ডিসেম্বরে আদায় হয়েছে ১০ কোটি টাকার বেশি। এর পর থেকে বরাবর হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ কমতে থাকে। এতে অনেকটা বাধ্য হয়ে অন্য খাতের টাকা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দেয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ সিটির প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ বেশ কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স পাওনা রয়েছে। এ কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দুই ভাগ হওয়ার পর ঢাকা সিটি কপোরেশনের পুরো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৩৪ একর বা ১০২ বিঘা জমি বেশি পড়েছে উত্তরে। এসব জমির দামও দক্ষিণ অংশের চেয়ে অনেক বেশি।

তাছাড়া আয়ের প্রধান প্রধান খাতগুলোই পড়েছে উত্তরে। নতুন নতুন বহুতল ভবনের এসব হোল্ডিংয়ের বিপরীতে রাজস্ব আদায়ও বেশি।  দক্ষিণ সিটিতে হোল্ডিং সংখ্যা এক লাখ ২২ হাজার ৭৯৮টি। গত অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য রাজস্ব খাত থেকে আদায় হয়েছে ৩২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে উত্তরে হোল্ডিং সংখ্যা এক লাখ ৪০ হাজার ৪৭৮টি। গত অর্থবছরে এসব হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য খাত থেকে এই সিটি রাজস্ব পেয়েছে ৫০৪ কোটি টাকা। রাজস্ব প্রাপ্তির ব্যবধান প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এছাড়া দক্ষিণ সিটিতে বেশ কিছু সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো পরিচালনায় সংস্থাকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। উত্তরের তুলনায় দক্ষিণের লোকসংখ্যাও বেশি।

আবার ঢাকা মহানগরীর প্রধান তিনটি বাস টার্মিনালের মধ্যে গাবতলী ও মহাখালী পড়েছে উত্তরে। এ খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পায় তারা। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণের মধ্যে পড়েছে সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান বাস টার্মিনাল। তাছাড়া প্রধান রাজস্ব আয়ের দু’টি খাত রূপসী বাংলা হোটেল ও বসুন্ধরা সিটি পড়েছে উত্তরে। আবার উত্তর সিটির ব্যয়ও কম। উন্নয়ন কাজও কম। তাই তাদের প্রতি মাসে অনেক অর্থই জমা থাকছে। আর দক্ষিণের সকল রাস্তাঘাটই পুরাতন। কোনটা মেরামত করতে হয়, আবার কোনটার সংস্কার করতে হয়। এদিকে, জ্বালানি বাবদই দক্ষিণের কাছে ফুয়েল পাম্প মালিকের প্রায় ১১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে এই সংস্থার জ্বালানি বাবদ খরচ লাগে ৮০ লাখ টাকার মতো। মাস শেষে সেটি কয়েক কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্যয়ের পাল্লা ভারি হওয়ায় প্রতি মাসেই আর্থিক অনটনে পড়ে হিমশিম খেতে হয়।

দক্ষিণ সিটির রাজস্ব বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশনের আয় ৭০ ভাগ হলেও ব্যয় ৩০ ভাগ। কিন্তু দক্ষিণের আয় ৩০ ভাগ এবং ব্যয় ৭০ ভাগ। এ কারণে সংস্থাটি দিন দিন লোকসানের দিকে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধের পাশাপাশি ঠিকাদারদের বিল পরিশোধেই হিমশিম খেতে হয় বেশি। কাজ শেষেই তাদের পাওনার জন্য বিল জমার পর তারা বিভিন্নভাবে দেন-দরবার শুরু করে প্রাপ্য বিলের জন্য। সময়মতো তাদের বিলও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিল দিতে না পারার কারণে কিছু কিছু ঠিকাদারদের কাছে সংশ্লিষ্টরা নাজেহালও হতে হয়েছে। কখনও বা লাঞ্ছিত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় ঠিকাদার ও কপোরেশনের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের জন্য দফায় দফায় তদবিরও করা হয়েছে।

এক পর্যায়ে গত অর্থবছরে তিন কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া যায়। সে বরাদ্দ থেকে ঠিকাদারদের পাওনার কিছু অংশ মেটানো হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় দফায় দেন-দরবার করে গত জানুয়ারির মাঝামাঝিতে বিশেষ বরাদ্দ বাবদ ১৫ কোটি টাকা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া যায়। সেটা দিয়েও ঠিকাদারদের বিলের কিছু পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও দেনার দায় থেকে নিস্তার মিলছে না তাদের। বর্তমানে উন্নয়নমূলক কাজের বিল বাবদ বকেয়া রয়েছে ১২০ কোটি টাকার মতো। ঈদ সামনে থাকায় এই পাওনা পরিশোধের জন্য ঠিকাদাররা ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিরুপায়। ঈদের আগে কোন মার্কেট বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়েছেন কর্মকর্তারা। ওদিকে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে বেশির ভাগ রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।  টাকার অভাবে ঠিকাদাররা কাজ করতে পারছেন না। তবে আর্থিক এই সঙ্কটের মাঝেও নগরীর রাস্তাঘাট উন্নয়নের জন্য আরও ১২০ কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। মার্কেট বিক্রি করতে পারলে এ কাজ শুরু হবে বলে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026