আবহাওয়া ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০০৭ সালের পর বিশ্বের আবহাওয়া দিন দিন বৈরী হবে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আগেই আভাস দিয়েছিলেন। মিলে যাচ্ছে তাদের সেই পূর্বাভাস।
চরমভাবাপন্ন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের আবহাওয়া। শীতকালে গরম আর গরমকালে ঠাণ্ডার সঙ্গে এবার বলা যায় আনুষ্ঠানিক পরিচয় ঘটল দেশবাসীর। মাত্র তিনদিনের ব্যবধানেই গতকাল অস্বাভাবিক এক আবহাওয়ার মুখোমুখি হয় দেশবাসী।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই ঘেমে ভিজে উঠতে শুরু করেছে অনেকের ঘরের মেঝে , দেয়াল এমনকি চেয়ার-টেবিলও। হুট করে ঘরের মেঝে কিংবা দেয়াল ঘেমে যাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেকেই।
আকশে রোদ দেখা গেলেও কাপড় শুকাতে দেরি হচ্ছে। বৃষ্টি না হলেও প্রকৃতি কেমন জানি স্যাঁতসেঁতে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ (বিশেষ করে টিভি) চালু করলেই তা থেকে অস্বাভাবিক আওয়াজ বের হতে থাকে।
এর আগে গত রোববার বিকালে খালি চোখে দূরের কিছু দেখার ক্ষমতা সাময়িক হারিয়েছিল রাজধানীবাসী, যা জলবায়ুর এ এক ‘অস্বাভাবিক’ পরিণতি। কুয়াশাচ্ছন্ন এ আবহাওয়া সাধারণত শীতেই দেখা যায়। অথচ হঠাৎ করেই ওইদিন বিকালে রাজধানীজুড়ে দেখা যায় ঘনকুয়াশা।
এ নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে সোশাল মিডিয়া। ঘরের মেঝে ঘেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কেউ বলছেন সামনে বড় ধরনের বন্যা হবে, কারো মতে এটা ভূমিকম্পের আলামত কিংবা কেউ অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলে বেড়াচ্ছেন। দেশের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম টুইটার ঘরের মেঝে ঘেমে যাওয়ার ছবিতে সয়লাব হয়ে গেছে। তবে, আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন ঘরের মেঝে ঘামছে স্বাভাবিক নিয়মে আর এটা নিয়ে আতঙ্কিত হবার কিচ্ছু নেই।
বৈরী এই আবহাওয়ার কারণ নিয়ে সার্ক আবহাওয়া কেন্দ্রের পরিবেশ বিজ্ঞানী আব্দুল মান্নান জানান, বায়ুমন্ডলে আর্দ্রতা বেড়ে গেছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে মানুষ বদ্ধ ঘরে থাকায় বাইরের এবং ভেতরের জলীয় বাষ্পে সমতা আসেনি। আর গতরাতে যখন তাপমাত্রার পরিবর্তন হলো তখন ঘরবাড়ি বন্ধ থাকায় সে পরিবর্তনের ছোঁয়া পড়েনি। সকালে বাইরের ও ঘরের বায়ু সম্পৃক্ত হয়েই আর্দ্রতা বেড়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, এক দেশের আবহাওয়া বৈরী আচরণ করলে তার প্রভাব অন্য দেশেও পরোক্ষভাবে পড়ে। বৈশ্বিক কারণে ভবিষ্যতে আবহাওয়া আরও বৈরী হয়ে ওঠতে পারে। তাই বাংলাদেশকে এই বৈরী পরিবেশ উপযোগী কৃষি ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আবহাওয়া ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষ নিত্যনতুন অস্বাভাবিক আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে পারে। পরিবেশবাদীদের অভিমত মানবসৃষ্ট এ সমস্যা এ দেশের মানুষকেই মোকাবিলা করতে হবে, যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যা হচ্ছে তা বৈশ্বিক কারণে। এখনই সতর্ক না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলোয়।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে প্রকৃতি। সামনে আরও ভয়াবহ দিন আসতে পারে, যদি না আমরা এখনই সতর্ক হই।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক এলাকার মতো এ বছর বাংলাদেশেও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ ও বাড়তি তাপমাত্রা লক্ষ্য করা যাবে। এ সপ্তাহেই দেশজুড়ে দাবদাহের আভাস দিয়েছেন তারা। এ চিত্র তুলে ধরে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বৈশাখ শুরু হয়েছে এপ্রিলের মাঝে। এ মাসেই গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হলো। প্রথম সপ্তাহে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল।
একইভাবে তৃতীয় সপ্তাহের শেষে বেশি বৃষ্টি হলো এবং মাসের শেষ অর্থাৎ চতুর্থ ভাগে বাড়বে তাপমাত্রা। এভাবেই আবহাওয়ার সামঞ্জস্য ঘটে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাঝারি ও মৃদু তাপপ্রবাহের বিস্তার ঘটছে নতুন নতুন অঞ্চলে।
ফলে ঢাকা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং বগুড়া ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাবে, যা গত বছর এতটা বিস্তৃত ছিল না। বাংলাদেশে এপ্রিল ও মে মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এ সময় তীব্র গরমের পর পরই আধঘণ্টার ব্যবধানে ঝড়ো আবহাওয়া তৈরি হয়। তাপমাত্রা বেশি থাকায় কালবৈশাখীর দাপটও থাকে বেশি।
বর্তমানে পূবালী ও পশ্চিমা বাতাসের সংযোগ ঘটছে না। বাড়ছে সূর্যের কিরণ, সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ছে আমাদের অঞ্চলে। এসব কারণে কয়েক দিনেই দেশে দাবদাহ পরিস্থিতি চলবে। বিশ্ব উষ্ণায়নের পাশাপাশি বেশিসংখ্যক বহুতল ভবন, কাচের তৈরি ভবন, বন উজাড় ও গাছপালা না থাকাটাও দায়ী তীব্র তাপমাত্রার পেছনে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাঙামাটি ও সিলেট ছাড়া বৃষ্টিহীন ছিল সারা দেশ। বলতে গেলে ছিটেফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। তাই বাড়ছে গরম। আগামী কয়েক দিন দাপট দেখাতে পারে এই উষ্ণতা। প্রকৃতির এমন আচরণ হলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।