রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০:১১

আমাদের মতিন স্যার

আমাদের মতিন স্যার

যার ভয়ে প্রথম কেঁপেছিলাম, যাকে দেখে প্রথম পালিয়ে যেতে শিখেছিলাম জীবনের প্রথম সেই ভয়, প্রথম পলাতক অনুভূতি, আমাকে ছেড়ে আজ ছেড়ে দূরে চলে গেছে।

যাকে দেখলে ভয় জাগে কিংবা পালাবার ইচ্ছা তীব্র হয় তাকে কি ভালোবাসা যায় অথবা শ্রদ্ধা? ছেলেবেলার কঠিন প্রশ্ন, জটিল হিসাব। প্রথমবারের মতো বুঝতে শেখা, কাউকে ভয় পেলেই তার সঙ্গে সম্পর্কের ইতি ঘটে না, কখনো কখনো ভয় ছাপিয়ে শ্রদ্ধা বড় হয়ে আসে অথবা শ্রদ্ধাটাই ভয় হিসেবে প্রকাশ পায়।

সেই ভয়, সেই প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধাজাগানো প্রথম মানুষ, আমার পাঠশালা স্কুলের শিক্ষক, আমার পাগল পাগল ছেলেবেলার স্মৃতির ব্যাংকের মূল্যবান নোট, আমার/আমাদের মতিন স্যার মিটিয়ে দিলেন লেনা-দেনা, বন্ধ হলো তাঁর আনাগোনা।

মতিন স্যার। হাজার হৃদয়ের তারা হয়ে জ্বলজ্বল একটি নাম। ছিলেন সিলেটের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সহকারি শিক্ষক হিসেবেই বোধকরি তার যাত্রা শুরু। সিলেট তখনো সিটি কর্পোরেশন হয়নি। শহর বলতে বন্দর, জিন্দাবাজার কিংবা আম্বরখানা, পৌরসভার সীমানা।

এর থেকে একটু দূরে খাসদবীর, ইলাশকান্দি, বাদামবাগিচা তখন ৫নং টুলটিকর ইউনিয়ন, তখনও শান্ত-কোমল গাছের ছায়া। মালনিছড়া থেকে মজুমদারি, বাদামবাগিচা থেকে গোয়াইপাড়া স্কুল বলতে একটাই নাম, খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই স্কুলের সহকারি শিক্ষক হিসেবে মতিন স্যারের শিক্ষকতা জীবনের শুরু।

আর সব প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের মতো তারও হাতেগোনা, ছোটখাটো মাইনে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের পোশাকে-আশাকেও তাদের আর্থিক অসচ্ছলতার প্রমাণ থাকে, চেহারায়ও জীবনের ভার টেনে নেয়া ক্লান্তির ছাপ থাকে। কিন্তু মতিন স্যার ছিলেন ব্যতিক্রম।

সব সময় ফিটফাট। ইন করা শার্ট, ইস্ত্রি করা প্যান্ট, পরিপাটি আচড়নো চুল, যত্ন করে রাখা সরু গোঁফ, দেখে মনে হয় কোতায়ালি থানার বড় দারোগা। স্যার একটা পারফিউম ব্যবহার করতেন। শক্ত, তীব্র ঘ্রাণ। তিনি যখন স্কুলের বারান্দা দিয়ে হেঁটে যেতেন ক্লাস রুমে বসেও তার পারফিউমের ঘ্রাণ আমাদের নাকে লাগতো। তখন আমরা সম্মোহিত হতে শিখে গেছি। মতিন স্যারের পারফিউম আমাদের সম্মোহিত করে রাখতো ভয়ে অথবা শ্রদ্ধায়।

আমরা প্রাইমারি স্কুলে পা রাখার আগেই কানে আসে মতিন স্যারের নাম। আমরা জানতে পারি, গোটা অঞ্চলে ভয়ের অপর নাম হচ্ছে আবদুল মতিন।

প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের আমরা কোমলমতি বলি। কোমলমতির নামের আড়ালে অনেক অনেক দুর্মতিও কিন্তু প্রাইমারি স্কুলে যায়।

বিচ্ছুকে হার নামায় তারা। নিরীহ-সরল ছাত্রের প্যান্টের পেছন দিয়ে পেন্সিল ঢুকিয়ে তারা বিমলানন্দ লাভ করে। এসব বিচ্ছুরা ছোটবেলাতেই জানান দিয়ে দেয়, এলাকায় নতুন এক মাস্তানের জন্ম হচ্ছে। মাস্তান এখন ক্লাস টুতে বসে কাজী নজরুল ইসলামের সকালবেলার পাখি কবিতাটি মুখস্ত করছে।

প্রাইমারি স্কুলের এসব ত্যাদড় ছাত্রদের চিড়েচ্যাপ্টে সোজাসাপ্টা রাখেন মতিন স্যার। ৫ নং টুলটিকর ইউনিয়নের খাসদবীর ওয়ার্ডে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি ছেলেমেয়ের কাছে মতিন স্যারের ওপরে আর কোনো কথা নেই। পিচ্ছি সন্ত্রাসীরা তার ভয়ে গর্তে মাথা লুকোয়। এখন নাকি স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রের গায়ে হাত তুলেন না, এখন নাকি স্কুলের শিক্ষকরা বেত হাতে ক্লাশে আসেন না।

এটা নিশ্চয়ই ভালো একটি উদ্যোগ। কিন্তু আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, সেই সময়ে যদি মতিন স্যার এতটা কড়াকড়ির ভেতর দিয়ে না যেতেন তাহলে খাসদবীরের অনেক ছেলে সীমাহীন অন্ধকারে হারিয়ে যেতো। পরিবেশটা তেমনই ছিলো। চারপাশে অশুভ বলয়।

এর ভেতরে সুতীব্র ঘ্রাণযুক্ত পারফিউম গায়ে মেখে মতিন স্যার শিশুদের আগলে রাখেন পাখির মায়ের মতো। ভয় দেখিয়ে তিনি ভয়ের পথ থেকে আমাদের চিরস্থায়ী দূরে রাখার বন্দোবস্ত নেন। মতিন স্যার ছিলেন জাঁদরেল জমিদার। আমাদের হৃদয় তার চাষের জমিন। তাতে তিনি সোনা ফলানোর স্বপ্ন দেখেছেন সব সময়।

দেখবেনইতো। একদিন বাংলাদেশ সোনার দেশ, সোনার মানুষের দেশ হবে এই স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মতিন স্যার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। আমাদের মতিন স্যার বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মতিন স্যার জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন।

যুদ্ধ শেষে নিজের জীবনকে না গড়ে মতিন স্যার গড়তে চেয়েছেন শিশুদের জীবন, তারা যাতে সোনার মানুষ হয় এই ছিলো তার ধ্যান এই ছিলো সাধনা। তাই বেছে নিলেন শিক্ষকতার পেশা।

বেছে নিলেন খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন এই স্কুলের মাঠে, বারান্দায়, ক্লাসে, ক্লাসে। সহকারি শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক।

সব রূপেই মতিন স্যার ছিলেন অনন্য-অসাধারণ। প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে আসার বয়স হয়েছে তিরিশ বছর। কতশত স্মৃতি ঝাপসা হয়েছে এই সময়। হাতের ফাঁক গেলে সময় গেছে, সময়ের তালে দুলে বহু স্মৃতি চলে গেছে বহু বহু দূরে।

বয়স মানুষকে মৃত্যু মানতে শেখায়। ছেলেবেলায় পাড়ার বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে যেভাবে ডাক ছেড়ে কাঁদা যায়, বড় বেলায় নিজের সবচেয়ে আপনজনের মৃত্যুতেও এমন কান্না করা যায় না। কেননা, বড় হলেই আমরা জানি, মৃত্যু অমোঘ নিয়তি। চলে যেতে হয়। সবাই চলে যায়।

এভাবেই চলে গেছেন আমাদের মতিন স্যার। আমি জানি এখন, মৃত্যু অমোঘ নিয়তি। আমি জানি এখন মৃত্যুতে কান্না করতে নেই। তবুও কেনো চোখ ভিজে আসে, তবু কেনো তিরিশ বছর আগেকার জীবনের এক শিক্ষকের জন্য মন উতাল-পাতাল হয়।

মতিন স্যারের মৃত্যু চোখ ভিজিয়ে দিয়ে আজ বহুদিন পর আমাকে জানান দিয়ে যায়, যে শিশু মনকে বহু আগের স্মৃতি ভেবে আমি ভুলে বসে আছি সেই শিশু-মন আমাকে ভুলে যায় নি। সে আমার অব্যবহৃত স্মৃতির ফোল্ডারে নীরবে বাস করেছিলো।

আজ মতিন স্যার এসে তাকে জাগিয়ে দিলেন। মতিন স্যারের জন্য আমি কাঁদি না। ভেতরে ভেতরে কেবল আমার শিশু মনটা কাঁদে। হু হু করে কাঁদে!

লেখক: সাঈম চৌধুরী, এক্সিকিউটিভ এডিটর, সাপ্তাহিক জনমত।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026