খোশ আমদেদ মাহে রমজান! শুরু হলো মহিমান্বিত মাস রমজান। বিশ্ব মুসলিমের কাছে সবচেয়ে মর্যদাপূর্ণ মাস এটি।
এমাসেই মহান আল্লাহ তায়ালা বিশ্ব মানবতার মুক্তি পথনির্দেশক হিসেবে নাযিল করেছেন আল কুরআন। কুরআন হলো মানুষেরজন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো সর্বশেষ হেদায়াতের গ্রন্থ। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য আর কোনো আসমানী কিতাবআসবে না। আর তাই কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে সুন্দরভাবে তার জীবন চালাবার জন্য যা দরকার তার সবই আল্লাহ কুরআনেবলে দিয়েছেন। কুরআন নাযিলের কারণে এ মাসের এতো মর্যাদা।
রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। রমজানকে ধৈর্য ও সংযম সাধনার মাস বলা হয়। কারণ এ মাসে সকল পাপ কার্য থেকে মুক্ত থাকার জন্য ধৈর্য, সংযম ও সহিষ্ণুতার কঠোর প্রশিক্ষন নিতে হয়। রমজানের এই এক মাসের সিয়াম সাধনা অর্থাৎ অন্যায়অপকর্ম তথা সব ধরণের গোনাহর কাজ থেকে বিরত থাকার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত প্রশিক্ষণ বছরের বাকী ১১ মাসসঠিক পথে চলতে সবাইকে অনুপ্রাণিত করে থাকে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্থ পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ এবং ইন্দ্রিয়জ সুখ আস্বাদনথেকে বিরত থাকাই হচ্ছে সিয়াম বা রোজার প্রধান বৈশিষ্ট্য। শুধু মহানবী (সাঃ) এর মাধ্যমে প্রেরিত ইসলাম ধর্মেই যে সিয়ামসাধনা রয়েছে তা নয়, মহান আল্লাহ পাক অতীতে অন্যান্য নবী রসুলদের মাধ্যমে প্রেরিত ধর্মেও রোজার বিধান ছিলো।
আল্লাহ তায়ালা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষকে মুত্তাকী হওয়ার কথা বলেছেন। মুত্তাকী হওয়ার মানে তাকওয়া বা খোদাভীরুতাঅর্জন। কারণ একজন খোদাভীরু মানুষ অন্যায় বা গোনাহর কাজ থেকে বিরত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৎকর্মশীল পূণ্যবান মানুষ হিসেবে নিজেকে গঠনের হাতিয়ার হিসেবে সিয়াম অর্থাৎ রোজা অনুশীলনের বিধানবাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় আমাদের উচিত, যথাযথভাবে এই ঐশী বিধান পালন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এইপবিত্র মাসেও একশ্রেণীর মানুষকে দেশ ও জাতির তথা মানুষের জন্য ক্ষতিকর কর্ম থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে দেখা যায়না। বরং অনেককে এই পবিত্র মাসকে পুঁজি করে অধিক মুনাফা অর্জনের লোভ লালসায় জড়িত হতে দেখা যায়। অসৎ আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের বিভিন্ন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধি করে সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষকে সীমাহীন আর্থিক কষ্টে ফেলতে দেখা যায়।
সুরা বাকারাহ ১৮৫
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍفَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থহবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আরযাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতেতোমরা শোকর কর।
মজান মাস রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। রমজান পেয়েও যে ব্যক্তি এই রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মহা সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, তাকে দুর্ভাগা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহর দরবারে অতীতের গোনাহ মাফ করিয়ে নেওয়াএবং অসীম পূণ্যলাভের সুযোগ এনে দেয় এই পবিত্র মাস। এই মাসে মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজেল হয়। শবে ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ হয় এই ঐশীগ্রন্থ, মহান দিক নির্দেশক ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আল্লাহ পাক শবে ক্বদরের রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন। এই মহান রাতকে ধারণ করে আছে রমজান মাস। সিয়াম সাধনার পাশাপাশি এই মহান রাতে ইবাদত বন্দেগীর সুযোগকে কাজে লাগানো সকল বিশ্বাসী মুসলমানের একান্ত কর্তব্য।
মানব জাতির ইতিহাসকে বদলে দিয়ে সঠিক ও সভ্যতার সঠিক পথে পরিচালনাকারী ঐশীগ্রন্থ আল কোরআনের মাস রমজান যেনো আমরা সত্য ও সঠিক পথে নিজেদের চালিত করার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি মহান আল্লাহর দরবারে রমজানের শুরুতে এই প্রার্থনা।
রোজা সম্পর্কে ৫ হাদিস
১) হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সো:) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবসহ রমজানমাসের সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুণাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারী: ৩৮, সহীহ মুসলিম:৭৬০)
২) হযরত সাহল বিন সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সো:)ইরশাদ করেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে, একেরাইয়ান বলা হয়, এই দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন একমাত্র সায়িম ব্যক্তিই জান্নাত প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ এইপথে প্রবেশ করবে না। সেদিন এই বলে আহবান করা হবে সায়িমগণ কোথায়? তারা যেন এই পথে প্রবেশ করে। এভাবে সকলসায়িম ভেতরে প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। অত:পর এ পথে আর কেউ প্রবেশ করেবে না।
(সহীহ বুখারী:১৮৯৬, সহীহ মুসলিম: ১১৫২)
৩) হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেন, সিয়াম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ কোনোদিন সিয়াম পালন করলে তার মুখ থেকে যেন অশ্লীল কথা বের না হয়। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে অথবা ঝগড়ায় প্ররোচিত করতে চায় সে যেন বলে, আমি সায়িম।
(সহীহ বুখারী: ১৮৯৪, সহীহ মুসলিম:১১৫১)
৪) হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সো:) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সিয়াম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব। সিয়াম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।
যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবাতার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি সায়িম (রোজাদার)। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার শপ! অবশ্যই সায়িমেরমুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধি। সায়িমের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি, যা তাকে খুশি করে। যখন যেইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।
(সহীহ বুখারী: ১৯০৪, সহীহ মুসলিম:১১৫১)
৫) হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেন, তোমাদের নিকট রমজান মাস উপস্থিত। এটা এক অত্যন্ত বারাকতময় মাস। আল্লাহ তা’য়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি সাওম ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়, এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এ মাসে বড় বড় শাইতানগুলোকে আটকরাখা হয়। আল্লাহর জন্যে এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও অনেক উত্তম। যে লোক এ রাত্রির মহা কল্যাণলাভহতে বঞ্চিত থাকল, সে সত্যিই বঞ্চিত ব্যক্তি।
(সুনানুন নাসায়ী:২১০৬)
যে কারণে রমজান মাস বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত
ক. এই মাসে কোরআনে কারিম নাজিল হয়েছে।
খ. এই মাসে লাইলাতুল কদর আছে।
গ. এই মাসে ইসলামের প্রথম জিহাদ বদর যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছে।
ঘ. এই মাসে মক্কা বিজয় হয়েছে।
ঙ. রমজান মাসে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।
চ. রমজান মাসে শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়।
ছ. রমজান মাসে নফল ইবাদতের ফরজ ইবাদতের মর্যাদা আর ফরজ ইবাদতে সত্তর গুণ অধিক মর্যাদা।
রমজানের শিক্ষা
১. নিজেকে আল্লাহর একজন একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে গণ্য করার চেষ্টা করা।
২. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ছাড়া জীবনের দ্বিতীয় কোনো লক্ষ্য থাকবে না।
৩. যে কোনো পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় আল্লাহর হুকুম মেনে চলার জন্য প্রস্তুত থাকা।
৪. আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সবকিছু শুনেন, দেখেন ও জানেন এই অনুভূতি সর্বদাই অন্তরে জাগ্রত রাখা।
৫. আল্লাহ ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর কৃতিত্ব অস্বীকার করা এবং নিজের ও আশেপাশের সবকিছুর ওপর আল্লাহর হুকুমের কৃতিত্বপ্রতিষ্ঠা করা।
৬. বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে একটি একনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রপাত হয়।
তাই আসুন, আমরা যারা নিজেদেরকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল (সা.)-এর উম্মত দাবি করি আমাদের উচিত রোজার মাসে যেভাবে আল্লাহকে ভয় করে দিনের বেলায় সকল খাবার ও পানীয় থেকে বিরত ছিলাম।
আগামী এগারটি মাসও সেই আল্লাহকে ভয় করে জীবন অতিবাহিত করি। সকল কাজে ও কথায় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধকে প্রাধান্য দেই এবং নিজেকে সমাজে মুত্তাকি হিসেবে পেশ করি তাহলে এই রোজা থেকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হবে এবং মোবারক হবে এই রমজান। আমিন!
লেখক: ইমাম মাও: এম.নুরুর রহমান, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, সেক্রেটারি- শারীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোরড ও মিডল্যনড ইউকে, ইমাম ও খতিব-মসজিদুল উম্মাহ লুটন ইউকে, সত্যায়নকারী চেয়ারম্যান- নিকাহ নামা সার্টিফিকেট ইউকে, প্রিন্সিপাল- আর রাহমান একাডেমি ইউকে, পরিচালক- আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে।
ইমেইল: nrahmansky@googlemail.com, Arrahmaneducationtust@gmail.com