মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১১

জাহান্নামের পরিচয়

জাহান্নামের পরিচয়

আজ শুক্রবার! পবিত্র জুমাবার! ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে না পারলে জাহান্নামে বাসিন্দা হবেন। যেখানে চরমভাবে কষ্ট ভোগ করতে হবে। এই বিষয়ে পাঠকদের জন্য বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন শীর্ষবিন্দু নিউজের ইসলাম বিভাগের প্রধান- ইমাম মাওলানা এম নুরুর রহমান।
বিশ্বনবীর [সা] চল্লিশটি হাদীস:

১. জাহান্নামের ৭০টি লাগাম। প্রতিটি লাগামে ৭০ হাজার ফেরেস্তা থাকবে জাহান্নামকে টেনে আনার জন্য [মুসলিম: ইবনে মাসউদ রা.]

২. দুনিয়ার আগুনের উত্তাপ জাহান্নামের আগুনের ৭০ ভাগের একভাগ মাত্র [বুখারী, মুসলিম: আবু হুরায়রা রা.]

৩. জাহান্নামের সবচেয়ে কম শাস্তি হচ্ছে: আগুনের জুতা পরিয়ে দেয়ায় মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে [বুখারী, মুসলিম]

৪. জাহান্নাম ৪টি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রত্যেক প্রাচীর ৪০ বছরের দূরত্ব পরিমাণ পুরু বা মোটা [তিরমিজী]

৫. সম্পদ সঞ্চয়কারী ধনীদের জাহান্নামের আগুনে ঢুকিয়ে আবার বের করে বলা হবে: তুমি কি দুনিয়ায় কখনো সুখ ভোগ করেছিলে? সে জবাব দিবে: না.. আমি কখনো সুখ ভোগ করিনি [মুসলিম]

৬. জাহান্নামে সবচেয়ে কম ও সহজ শাস্তি পাওয়া কারও পৃথিবী পরিমাণও সম্পদ থাকলেও, সব দিয়ে আযাব থেকে মুক্তির চেষ্টা করতো [বুখারী, মুসলিম]

৭. জাহান্নামের আগুনকে ১ হাজার বছর তাপ দিয়ে লাল, ১ হাজার বছর তাপ দিয়ে সাদা আর ১হাজার বছর তাপ দিয় কালো করা হয়েছে। এখন তা ঘোর কালো অন্ধকার অবস্থায় রয়েছে [তিরমিজী: আবু হুরায়রা রা.]

৮. শাস্তি অনুভবের জন্য কুফরে জড়িতদের একেকটি দাঁত ওহুদ পাহাড় ও গায়ের চামড়া ৩দিন সফরের সমান পুরু করে দেয়া হবে [বুখারী, মুসলিম]

৯. জাহান্নামের আগুন কারও টাখনু, কারও হাটু, কারও কোমর, কারও গর্দান পর্যন্ত পৌঁছবে [বুখারী, মুসলিম]

১০. কাফেরের বসার স্থান হবে মাক্কা-মাদীনার দূরত্বের সমান [তিরমিজী]।

১১. জাহান্নামীর জিহবা ১/২ ক্রস পর্যন্ত বেরিয়ে হেঁচড়িয়ে চলবে, আর লোকেরা তা মাড়িয়ে চলবে [আহমাদ]

১২. ততাদের মুখের কাছে যায়তুন তেলের নীচের তপ্ত গাদ আনা হবে, যার উত্তাপে মুখের চামড়া-গোশত খসে পড়বে [তিরমিজী:আবু সাঈদ রা.]

১৩. জাহান্নামের সাউদ পাহাড়ে কাফেরদের ওঠানো হবে ৭০ বছর পরিমাণ সময়ে, এরপরই আবার নিক্ষেপ করা হবে। এটা অনবরত চলবে। [তিরমিজী]

১৪. জাহান্নামীদের মাথায় ফুটন্ত পানি ঢালা হবে, যা তার পেটে ঢুকে সবকিছু গলিয়ে পায়ের দিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। আবার আগের অবস্থায় ফিরবে ও ফুটন্ত পানি ঢালা হবে [তিরমিজী]

১৫. জাহান্নামীদের তাদের রক্ত-পুুঁজ পান করানো হবে। এসব মুখের কাছে আনলে তারা অপছন্দ করবে। যখন চেহারা দগ্ধ হয়ে মাথার চামড়া খসে পড়বে, তখন বাধ্য হয়ে তা পান করবে। এতে নাড়িভুড়ি খন্ড খন্ড হয়ে মলদ্বার দিয়ে নির্গত হবে। [তিরমিজী: আবু উমামা রা.]

১৬. জাহান্নামীদের সবচেয়ে কম শাস্তি আগুনের জুতা পরানো হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবকে [বুখারী]

১৭. জাহান্নামীদের এক বালতি পুঁজ দুনিয়ায় ফেলা হলে, সেটা সকল দুনিয়াবাসীকে দুর্গন্ধময় করে দিবে [তিরমিজী]

১৮. যদি জাক্কুম গাছের একটি ফোটা পৃথিবীতে পড়ে, তবে দুনিয়াবাসীর জীবন ধারনের সব উপকরণ নষ্ট হয়ে যাবে। আর সেই জাক্কুমই হবে জাহান্নামীদের খাবার। [তিরমিজী ইবনে আব্বাস রা.]

১৯. জাহান্নামীদের মুখ আগুনের তাপে ভাজাপোড়া হয়ে উপরের ঠোট সংকুচিত হয়ে মাথার মধ্যস্থলে এবং নিচের ঠোঁট ঝুলে নাভির সাথে লাগবে। [তিরমিজী:আবু সাঈদ খুদরী রা.]

২০. জাহান্নামীদের চোখের পানি কাঁদতে কাঁদতে প্রবাহিত হবে। একসময় অশ্রু শেষ হয়ে চোখ দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। ফলে চোখে এমন ক্ষতের সৃষ্টি হবে যে, যদি তাতে নৌকা চালাতে চাও তবে তাও চলবে [শরহে সুন্নাহ, আনাস রা.]

২১. জাহান্নামীরা সরাসরি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবে, তাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে। আল্লাহ বলবেন: হে হতভাগার দল! দূর হও.. আর জাহান্নামেই পড়ে থাক। তোমরা আমার সাথে আর কথা বলবে না। এরপর হতাশ হয়ে তারা বিকট চিৎকার, হাহুতাশ করে নিজেদের ধিক্কার দিতে থাকবে। [তিরমিজী: আবু দারদা রা.]

২২. রাসূলকে [সা.] বলতে শুনেছি, “আমি তোমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে ভয় প্রদর্শন করছি”- কথা গুলো উচ্চস্বরে বলতে থাকলেন [দারেমী, সুনান, ইবনে বশীর রা.]

২৩. আসমান থেকে কোন পাথর যমীনের দিকে ফেললে তা একটি রাত শেষ হবার আগেই যমীনে পৌঁছাবে। কিন্তু জাহান্নামের কিনার থেকে নিচ দিকে কোন পাথর ছেড়ে দিলে ৪০ বছরেও তা তার তলদেশে পৌঁছতে পারবেনা। [তিরমিজী: আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.]

২৪. জাহান্নামের হাবহাব নামক গর্তে প্রত্যেক স্বৈরাচারী অহংকারীকে রাখা হবে। [দারেমী, আবু বুরদাহ রা.]

২৫. জাহান্নামের সাপ [যা খোরাসানী উটের মতো বিরাট] একবার দংশন করলে তার বিষ ব্যথা জাহান্নামীরা ৪০ বছর পর্যন্ত অনুভবকরবে। [আহমদ, আবদুল্লাহ ইবনে হারেস রা.]

২৬. কিয়ামতের দিন সূর্য ও চাঁদ দু’টোকে পনীরের আকৃতি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ জিজ্ঞেস করলে আবু হুরায়রা [রা] বলেন, নবী রাসূলের [সা.] কাছে যা শুনেছি তাই বর্ণনা করলাম। এর অধিক কিছু জানি না। এতে হাসান বাসরী (রহ.) নিরব হয়ে গেলেন। [বায়হাকি, হাসান বসরী রা.]

২৭. হতভাগ্য ব্যক্তি ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না। হতভাগ্যের সংজ্ঞায় বলা হলো যে, যে আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের জন্য আনুগত্য করে না এবং তার নাফরমানীর কাজপরিত্যাগ করে না। [ইবেন মাজাহ, আবু হুরায়রা রা.]

২৮. কুরআন যাদেরকে আটকিয়ে রাখবে তাদের জন্য জাহান্নাম চিরস্থায়ী হয়েগেছে। তারা ছাড়া জাহান্নামে আরকেউ থাকবেন না। [বুখারী মুসলিম: আনাস রা.]

২৯. যখন কিয়ামত সংঘঠিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে। প্রত্যেক উম্মত (দল) যে যার ইবাদাত (গোলামী) করত সে যেন তার অনুসরণ করে। তখন যারা আল্লাহ ছাড়া মুর্তি প্রতিমার ইবাদাত করত, তাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবেনা বরং সবাই জাহান্নামের মধ্যে গিয়ে পড়বে। [বুখারী মুসলিম: আবুসাঈদ খুদরী রা.]

৩০.আল্লাহ বলবেন, যার অন্তরে সরিষারদানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। তাদের এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা (জাহান্নামের আগুনে) পুড়ে কালো কয়লায় পরিণত হয়ে গেছে। [বুখারী, মুসলিম: আবুসাঈদ খুদরী রা.]

৩১. কিছুলোক তাদের গুনাহর কারণে তার শাস্তি স্বরূপ জাহান্নামের আগুনে ঝলসিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তার রহমত ও করুণায় তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তবে সেখানে তাদেরকে জাহান্নামী বলে ডাকা হবে। [বুখারী: আনাস রা.]

৩২.একদল লোককে রাসূল (সা) এর সুপারিশে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। অতঃপর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের নাম রাখা হবে জাহান্নামী [বুখারী: ইমরান ইবনে হুসাইন রা.]

৩৩. শাস্তি ভোগ করে সর্বশেষ যে জাহান্নামী জান্নাতে প্রবেশের অনুমিত পাবে, তাকে বলা হবে- তোমার প্রতিটি গুনাহের স্থলে একটি করে নেকী দেয়া হলো। তখন সে বলবে: হে রব! আমিতো অনেক বড় বড় গুনাহও করেছিলাম, যা এখানে দেখতে পাচ্ছিনা!
আবুযর রা. বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনভাবে হাসতে দেখি যে তাঁর মাড়ির দাঁতও বেরিয়ে পড়েছিল [মুসলিম, আবু যর [রা.]

৩৪. তারপর আল্লাহ্ বলবেন: এবার জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমাকে জান্নাতে দুনিয়ার চেয়ে দশগুন বেশী জায়গা দেয়া হলো। তার মর্যাদাই জান্নাতীদের মধ্যে সর্বনিম্ন [বুখারী ও মুসলিম- আবদুল্লাহ ইবেন মাসউদ রা.]

৩৫. চার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করে আবার জাহান্নামে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হবে। তাদের একজন পিছন ফিরে বলবে: হে রব! আমিতো আশায় ছিলাম যে, যখন তুমি একবার আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছ, তখন সেখানে আর ফেরৎ পাঠাবে না। তখন আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিয়ে দিবেন। [মুসলিম, আনাস রা.]

৩৬. জান্নাত না দেখা পর্যন্ত কাউকে জাহান্নােম পাঠানো হবেনা। যাতে পাপকাজের জন্য তার অনুশোচনা ও আফসোস বৃদ্ধি পায়। [বুখারী: আবু হুরায়রা রা.]

৩৭. সারিবদ্ধভাবে দাড়ানো জাহান্নামীদের একজন এক জান্নাতীকে দেখে বলবে, হে অমুক! আমিতো তোমাকে পানি খেতে দিয়েছিলাম। একজন বলবে, আমি সেই ব্যক্তি যে তোমাকে ওজুর পানি দিয়েছিলাম। তখন জান্নাতী তারজন্য সুপারিশ করে তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে [ইবনে মাযাহ- আনাস রা.]

৩৮. পুলসিরাত পার হবার সময় সবাই জাহান্নামে উপস্থিত হবে ও আমলের অনুপাতে নাযাত পাবে। [তিরমিযী- আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা]

৩৯. যে এমন কথা আমার উপর আরোপ করে যা আমি বলিনি, সে তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়। [বুখারী: সালাম বিন আমর রা.]

৪০. কাফেরের মৃত্যুর পর কবরে তার রুহ ফিরিয়ে দেয়া হয়। দু’জন ফেরেস্তা তাকে উঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন: তোমার রব কে? সে বলে, হায় হায়! আমি জানি না। তারা জিজ্ঞেস করবেন, কে তোমাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন? সে বলবে, হায় হায়! আমি জানি না!! তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষণা দিবে: সে মিথ্যা বলেছে। তাকে জাহান্নামে একটি বিছানা বিছিয়ে দাও, জাহান্নামের পোশাক পরিয়ে জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও। রাসূল (সা.) বলেন, এরফলে তার দিকে জাহান্নামের ভীষণ তাপ, উত্তপ্ত বায়ূ আসতে থাকে [আহমদ, আবু দাউদ- বারা বিন আযেব রা.]

জাহান্নাম থেকে বাঁচার একমাত্র পথ “শিরকমুক্ত ঈমান ও বিদাতমুক্ত আমল”, অর্থাৎ রাসূলকে (সা.) আদর্শ মেনে তাঁর দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করা। এছাড়া মাগিরব ও ফজরের সময় সাতবার পড়া: আল্লাহুম্মা আজরিনী মিনান্নার। অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও [আহমদ ও আবু দাউদ]।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন: রাব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়াক্বিনা আযাবান নার। [সূরা বাকারা: ২০১]




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026