রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৮:১৫

সময়কাল ১৯৭৫-১৯৭৭: আমার দেখা সিলেট শহর

সময়কাল ১৯৭৫-১৯৭৭: আমার দেখা সিলেট শহর

/ ১১১
প্রকাশ কাল: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সিলেট শহরের আমার পূর্বের ঠিকানা গোয়াইপাড়া থেকে নতুন আবাসস্থল চন্দনটুলা নামক বস্তিতে। সেই সময়কাল ছিলো ১৯৭৫ ইংরেজি সাল। চন্দন টুলার বাসাতে উঠলাম আমরা। এই বাসায় আমার মজার কিছু কাহিনী ছিল। আমরা শেয়ারে ভাড়া বাসায় উঠলাম। যে ভদ্রলোক প্রথম বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি ভাগ্য পরিবর্তন আশায় তার ছোট দুই ছেলে ও স্ত্রী রেখে লন্ডন চলে যাচ্ছেন। উনি পেশায় ছিলেন সিলেট জজকোর্টের একজন উকিল। যতদূর মনে পড়ে ভদ্রলোকের নাম এম. এ. খালেক খালেদ। উনার পরিবারের জন্য বাসাটা বড়। তাই তিনি খুজঁ করছিলেন একটা ভালো পরিবার। যদি পেয়ে যান তাহলে হয়তো বাসাটা পরিবর্তন করতে হবে না। আর তিনি যেহেতু দেশ ছেড়ে বিদেশে যাচ্ছেন তার অবর্তমানে পরিবারের নিরাপদে থাকতে ভালো হবে। আবার আমাদেরও তেমন বড় বাসার প্রয়োজন ছিল না। তাই দুই পরিবারের সম্মতিতে শেয়ারে একই বাসায় বসবাস শুরু হলো। এটি আম্বরখানা প্রাথমিক স্কুলের গলিটি। বাসা বাড়া ৬০০ টাকা ছিল। বাসার একেক পক্ষের একটা বড় ও একটা ছোট রুম নিয়ে আলাদা ব্যবস্তা। বাকি সব যেমন পাঁক ঘর, বাথ রুম, বসার ঘর শেয়ারে ব্যবহার হবে। আমাদের কাজের মেয়ে মনুও ছিল আমাদের সাথে। সে পাঁক ঘরে মেঝেতে ঘুমাত। আমার দেশের জীবনে সদা সর্বদাই দেখেছি ওদের শোয়ার স্থান সব সময় রান্না ঘরের মেজেতে দেয়া হতো। আমি দেখেছি, তারা সবার চেয়ে বেশি কষ্ট করে, দেরিতে ঘুমে যাওয়া এবং সবার আগে ঘুম থেকে উঠা। এই ধরনের একটা গদবাধিা নিয়ম দেখেছি দেখেছি এইসব খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে। এদের কথা মনে হলে জীবনটা যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়।  যাই হোক, আমরা একই বাসায় থাকছি, শেয়ারে চলছে অনেক কিছু। একটি দিনও কোন বিষয় নিয়ে কোন ধরনের মনমালিন্য পর্যন্ত হল না। কেমন উচ্চতর ছিল মানুষের মনন ও আচরণ। অথচ আজকাল সমাজে কি দেখি আমরা!

যাই হোক, চন্দন টুলার আরও একটা গলি আছে যেখানে মাজার অবস্থিত। এই গলিতে ঢুকতে বামে বিশাল মাঠ নিয়ে একটি বাড়ি। ঐ মাঠে ছিল বিশাল আম গাছ। পাড়ার ছেলেদের সাথে একদিন গিয়েছিলাম ডিল ছুড়ে আম খেতে কিন্তু মিশন সফল হয়নি। মুকিত ও নিপুদের বাসা হল একই গলিতে। আমাদের খেলার সাথীদের মধ্যে নিপুই ছিল বেশ বেটে। জানিনা এখন সে কেমন আছে। নিপুদের সমসাময়িক অবস্থা ও আমাদের মধ্যে পরিবেশটাই ছিল অন্যরকম। তাদের মধ্যে লেখা পড়ার আলো জ্বলছিল।

চন্দন টুলার দুই গলির মধ্যবর্তি কাল-ডি-সেক জায়গায় মধ্যে ৪/৫ টা বাসা ছিল এবং পিছনে সবুজে আচ্ছাদিত ফাঁকা জায়গা শেষ হয়েছে ছড়াতে। এই কাল-ডি-সেকে জাবেদ-আবেদ দুই ভাইদের বাসা ওরা পাইলট স্কুলে পড়ত। বাবলাদের বাসাও সেখানে, বাবলার আব্বা দিলশাদ সিনেমা হলের লাইট মেন ছিলেন (লাইট মেরে মানুষদের হলের সিটে বসাতেন)। উনি স্বাভাবিকের চেয়ে বেটে মানুষ ছিলেন। এই বাবলা শুনেছি পরবর্তীতে হারুনদের (হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সাহেবের ভাতিজা) বাগানে চাকুরি নিয়েছিল। এই কাল-ডি-সেক এর সামনে সুন্দর মাঠ ছিল। প্রায়ই এই মাঠে আমি, নিপু, জাবেদ-আবেদ (দুই ভাই), বাবলা, মুকিত এক সাথে পিং পং খেলতাম। ঠিক উল্টো দিকে রাস্তার অন্য প্রান্তে একটু দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দর পাম ট্রি সম্বলিত ”জান্স হাউস” নামক বিশাল বাড়ি ছিল। আসলে সিলেট একটা পরিপাটি মনোরম বসবাসের জায়গা ছিল। এই বাড়ীর দক্ষিনে পায়ে হাঁটার পশ্চিমমুখী রাস্তা সাথেই রশিদ মঞ্জিল। জাভেদ ও হারুনদের বাসা। তাদের বাসা রাস্তা সংলগ্ন দেওয়ালে বসে পড়ন্ত দুপুরে বা ছুটির দিনে আমি ও গনি (আমার ক্লাস সিক্সের সাথী) গাড়ি গণনা করতাম। আমি বলতাম বন্দর থেকে কোন গাড়ি আসলে আমার এবং আম্বরখানা থেকে আসলে তার। গাড়ি বলতে বেবি ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার বলতে কোন নাম নিশানাই ছিল না। হারুনদের মাজদা কার সব সময় বাসার সামনেই দাঁড়ানো থাকতো। ঘন্টায় একটা দুইটা বেবি ট্যাক্সিই চলা ফেরা করতো। এই প্রধান রাস্তায় এবং সেটাই ছিল সিলেটের প্রধান পরিবহন। প্রাইভেট গাড়ি গুটি কয়েক পরিবারের ছিল তারা কালে ভাদ্রে বের করতেন। ঐ সময় সিলেটে আমার জানামতে তাদের বাসাতে একমাত্র টিভি ছিল। আমি একবার তাদের বাসায় তৎকালীন সময়ে টিভিতে অনুষ্টান দেখেছিলাম। লম্বা বাশে এন্টিনা ও বোস্টার লাগিয়ে ঢাকা থেকে রিসিপসন ধরা হত। তখন সিলেটে টিভি ওয়ারলেস স্টেশন হয়নি। ৭৭ এর দিকে আমাদের বাসায় টিভি আসলো। এই টিভি এলো বিয়ের যৌতুক হয়ে। মজার ব্যপার হল টিভি প্রথম আনতে আমি গিয়েছিলাম। টিভিটা রাখা ছিল মুজিব ভাইয়ের শিবগঞ্জের বাসায়। নেশনেল সাদা কালো টিভি, ডাবল স্ক্রিন ও উপরে আড়া আড়ি দুটি এন্টিনা। পরিষ্কার মনে আছে বাসায় টিভি এনেই এক দৌড়ে আম্বরখানায় গিয়ে খবর পৌছে দিয়ে এসেছিলাম। সে দিন আমার কি দৌড় ও আনন্দ ছিল। আমরা দুজন লোক গিয়েছিলাম টিভি আনতে। রিকসায় দুজনের হাঁটুতে রেখে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে যেন এক বিশ্বের বিস্ময় নিয়ে আসছিলাম।

আমার পাড়ার গলিটা তেমন বড় নয় বা বসতি তেমন ছিল না। গলির ২/৪ টা বাড়াটি বাসা ছাড়া বাকি সবাই স্থানীয়। মুলত: তিনটি বাড়ি নিয়েই এই পাড়া। গলিতে ডুকে শফিক ভাই, কয়সর, আফসর ও মন্নাফদের বাড়ি। তারপর বামে চান মিয়া চাচার বাড়ি (দিলিপ কমিশনারের আব্বা), গলিতে বামে মোড় দিয়ে মন্নাফ চাচার বাড়ি (মানিক ভাই, লোকমান ভাই, নজরুল ভাই, ইকবাল ভাই, কামাল, কয়েস দের বাড়ি)। মন্নাফ চাচা ও চান মিয়া চাচা একই বংশের লোক। উনাদের বাড়ি ছেড়ে একটা উত্তর-দক্ষিনে লম্বা বাড়ি। আমার যতটুকু ধারণা তারা স্থানীয় হলেও একই গোষ্ঠির নয়। সইদ বক্স, মাসুক ভাই, সুয়েলদের বাড়ি।

গলির মুখটা ঢালু ও কাচা রাস্তা ছিল। এই ঢালু রাস্তাতেই বগ্লি মেরে সাইকেল চালানো রপ্ত করেছিলাম। গলিতে ঢুকে বামে স্কুল, ডানে দোকান পেড়িয়েই একটি ইন্দারা তার পরে একই ডিজাইনের পাশাপাশি চারটা বাসা। চুন সুরকির বাসাসমূহ। কি সুন্দর বিশাল সবুজে ঢাকা কম্পাউন্ড ছিল। এক বাসার সহিত আরেক বাসার মধ্যে অনেক জায়গা রেখে বাসাগুলি বানানো। বাসা সমুহের সামনে ঘন সবুজ ঘাসের দীর্ঘ বিছানার পর গলির পানি নিস্কাশনের নালা ও রাস্তা। সামনের সবুজ চত্বরের দুই প্রান্তে দুটি এক রুম বিশিষ্ট ঘর। এই সদৃশ বাসা সমূহের মধ্যে তৃতীয় বাসাটা আমাদের। প্রথম বাসাতে থাকতেন সিলেটের একমাত্র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। শামিম ভাইয়ের আব্বা। উনারা নন-সিলেটি ছিলেন। এই বাসার সাথে আজমেরী শরিফের দরবারের যোগাযোগ ছিল। সিলেটের শাহজালালের উরুসের সময় আজমেরী থেকে গানের ভক্ত দল উনাদের বাসায় আসত। এই সময় পাড়াসহ সারা দরগা মহল্লা এক আনন্দের আমেজে ডুবে যেত। স্কুলের মাঠে প্রতি সান্ধ্যকালীন সময়ে কাওয়ালি চলত। বসে বসে শুনতাম, একবার তো একটা ঘটনায় সবাইকে অবাক করে দিল। দমা দম গান চলতেছে একটার পর একটা। টাকার মালা নিয়ে লোকজন নেচে নেচে এসে গায়কদের ও বাদ্য বাদকদের গলায় পড়িয়ে দিচ্ছেন। মজলিশের উচ্চতা একেবারে তুঙে, তবলার বারি চলছেই, হারমানির জানটা যেন গায়কের সুরের সাথে আর পারছে না এমনি মুহূর্তে তবলা দম ছেড়ে দিল। তবলা বাদকের হাতের ঝংকারে তবলা ফেটে গেছে। আমরা সবাই অবাক! কি শক্তি ও জোশ এই আজমেরী বেটার। কিন্ত গানের জোশ থামছে না আবার গানও থামছে না। একই ফেটে যাওয়া তবলায় তাল দিতে দিতে সে তবলা ভেঙ্গেই ফেলল। যে সেটা দেখে নাই ঐ মুহূর্তের মোহ বা কাওয়ালি সংগীতের উচ্চতা তা ভাষায় বা লেখায় প্রকাশ করে বুঝাবার নয়। গায়ক যন্ত্রী সব যেন চলে যায় অন্য জগতে আর দর্শক হয়ে পড়েন মুগ্ধতায় বিভোর।

আমাদের এই সাদৃশ্য বাসাগুলির পূর্ব পাশে আমাদের বাসার মালিকের নিজস্ব বিশাল বাড়ি যার পূর্ব সীমান্ত গিয়ে শেষ হয়েছে স্থানীয় ছড়ায়। ছড়ার এই প্রান্তে সইদ বক্স সাহেবের জিপ গাড়ি পার্ক থাকত। এই বাড়ির ছেলেদের নাম কয়সর, আফসর ও মনাফ। সোজা কথা গলিতে ডুকে দোকানের সীমানা ছেড়ে পুরো ডান পাশ জুড়ে একই মালিকের। একবার মূল মালিকের নাম কানে এসেছিল। আমাদের পাড়ার মুরব্বী চান মিয়া (দিলিপ কমিশনারের পিতা) এই বাসাগুলোর শুরু যেখানে দোকান প্রান্তে, সেই খালের সীমানা থেকে এক খন্ড ইট তুলেছিলেন। কি ঝগড়া না লাগলো, তখন শুনলাম শফিক ভাই উদ্যত স্বরেই বলছেন এটা গাব্রু মিয়ার সম্পতি। আপনি এখান থেকে ইট তুলবেন কেন? চান মিয়া চাচাও একই গলির সম্পত্তিশালী সম্পন্ন একজন সম্মানিত লোক।

একটা খুবই মারাত্নক ব্যাপার ঘঠে ছিল এই পাড়ায় বসবাসকালীন সময়ে। আসলে দুটি ঘটনা গঠেছিল। পাড়ার সঈদ বক্স সাহেব যিনি কমিশনারে দাঁড়িয়েছেন। উনার প্রতীক ছিল লাঙ্গল। আমাদের পাড়ায় একটাই প্রাইভেট জিপ গাড়ি ছিল সেটা উনার। উনার প্রতিপক্ষ কাজিটুলার ধলা বারি সাহেব। উনার প্রতীক হাতি আমাদের পাড়ায় এসেছে। কামরানের বড় ভাই জুলু সে হাতিকে উত্যক্ত করায় এ নিয়ে কথা কাঁটা কাটির পর্যায়ে চলে যায়। এরপরে কাজিটুলার লোক লাঠি নিয়ে আমাদের গলির মুখে চলে আসে। আমরাও কম যাই না, মেয়ে ছেলে আবাল বৃদ্ধ সবাই তাদেরকে চরমভাবে অপমানিত করে ফিরিয়ে দেই। তবে কোন রক্তপাত হয়নি।

দ্বিতীয়টা হল কোন এক কারনে ডাকাডাকি শুরু হয়েছিল রাস্তার এপার ও অপারের মধ্যে। এপারে আমরা দিলিপ ভাইসহ আর অপর পাশে রাজন ভাইয়েরা। এই মারামারিও রক্তপাতহীন বা যখম ছাড়া শেষ হয়। আগের মারামারিগুলি মারাত্বক রুপ নিলে এতটুকই। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও হাঁক ডাক। তারপর সব শান্ত।

বাম দিকের স্কুল ছেড়ে পতিত মাঠ, পাড়ার ছেলে-মেয়েদের খেলার স্থান। এই মাঠে প্রথম খেলতে গিয়ে আমার পরিচয় হল চুতরা (স্থানীয় ভাষা) নামক উদ্ভিদের সাথে। দুষ্ট সাথীরা খুবই হাসা হাসি করছিল প্রথমে আমাকে নিয়ে। আমি বুজে উঠতে পারি নাই কেন হাতে চুলকাচ্ছিল। ওরা মিটি মিটি হাসতে ছিল। এই অবস্থা নিয়ে খেলা শেষ করে বাসায় এসে দেখি হাতের চামড়া একেবার লাল হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে নাম শিখে ফেলেছি। চুতরা লাগছে বলতেই চুন এনে লাগিয়ে দেওয়া হল। খালের পাড়ে বল আনতে গিয়ে এই গাছের পাতায় হাত লেগেছিল। একটা বড় ভিন্ন পরিবেশে পড়লাম। অনেকগুলি সমবয়সি ছেলে এই বস্তিতে। পাড়ার মধ্যে আমি সুয়েল, সালেক, শাহিন ও কামাল মিলে খেলতাম গাইয়াগুটি। বিকেলে চলে যেতাম সমস্মর সংঘের হইয়ে খেলতে মাদ্রাসা মাঠে। সমস্বর সংগ কিন্ত আমাদের পাড়ারই। মাসুক ভাই হর্তাকর্তা। পাড়ার খেলার মাঠের পরে বর্ডার ইন্সপেক্টারের বাসা, দুষ্ট শাহিনের বাসা। ও আমাকে খুব জ্বালাত। ওদের বাসার উল্টো দিকে মুন্নির মার বাসা ছিল। পাড়ার সবাই এই বাসাকে এই নামেই ডাকত। মুন্নির আব্বাকে দেখেছি কিন্তু উনি কি করতেন জানতাম না। তবে ওদের বাসাটা পুরু পুরি উঁচু দেয়াল ও গেইট পরিবেষ্টিত ছিল। বাহির থেকে গেইটের ফাঁকে সুন্দর পরিপাটি একটা আঙ্গিনা ও তাতে দুই একটা পেইন্ট করা ফুলের টব চোখে পড়ত। মুন্নিদের বাসা সম্পর্কে মুখরোচক কথা প্রচলিত ছিল যে, ওরা পাঁক শাক করে না। পাড়ার এক মহিলা ওদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। ওদের পাঁক ঘরের হাড়ি পাতিল ও পরিবেশ ঝক ঝক করত, তাই কথা রটল ওরা মনে হয় পাঁক করে না। পাঁক করলে হাড়ি পাতিল এতো পরিষ্কার থাকে কেমনে ?

মুন্নির মার মুন্নিকে কখনও দেখেননি। কোথাকার মানুষ কোথায়। বছর দশেক আগে জানতে পারলাম আমার হাই স্কুলের সাথী, মির্জাজাঙ্গালের এনাম এই মুন্নির স্বামী। এনামের সব বড় ভাই লন্ডনে আমার প্রতিবেশী। উনার বাসায় দেশ থেকে লোক এসেছেন শুনে বেড়াতে গেলাম। এনামের শ্বাশুড়ী ও শ্যালক এসেছেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসল এই সুত্রতা।

চন্দনটুলায় থাকাকালীন অবস্থায় দুটি জিনিষ নিত্তনৈমত্তিকভাবে ঘটতো। এক. আমরা ইন্দারা থেকে পানি তুলতে গেলে প্রায়ই বাল্টির দড়ি ছিড়ে যেত। বর্ডার ইন্সপেক্টরের বাসায় একটা উদ্ধার যন্ত্র ছিল। অনেকগুলি লোহার আংটা একত্রিত করে রশি দিয়ে বাঁধা। জিনিসটাকে ইন্দারাতে ফেলে দুই এক চক্কর ঘুরালেই বালটির হাতল আংটাতে আটকিয়ে যেত। তারপর রশি টেনে বালটি ঠেনে উপরে তুলে আনতাম।

দুই. আমাদের চার বাসার ফিউজ বোর্ড ছিল এক কাট হাউট দ্বারা। একদিন পরপর কাট আউট চলে যেত। আমাদের পাড়ারই ইলেক্টিশিয়ান ফারুক মামাকে ডেকে নিয়ে আসলে উনি কাট আউটে তার আড়া আড়ি লাগিয়ে দিতেন। অনেক সময় ছেড়া ইলেক্টিক ওয়্যার এনে দিতাম উনাকে এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য।

আমাদের পাড়ার একেবারে প্রাণবন্ত সুদর্শন যুবক ছিলেন নজরুল ভাই। উনি আমাদেরকে নিয়ে প্রান্তিক কচি কাচার আসর ও স্কাউট করেছিলেন। আমার মনে আছে, আমরা সবাই উনার নেতৃত্বে সুরমা মার্কেটের পাশে নিক্সন মার্কেট ভেঙে দিয়েছিলাম, আমরা শিশুরা সরকারের সহযোগিতায় সিলেটে প্রথম শিশুপার্ক করি। এতে তৎকালীন ডিসির সরাসরি উৎসাহ ও সমর্থন ছিল।

নজরুল ভাই সম্পর্কে পাড়ায় কথা প্রচলিত ছিল, উনাকে নাকি একটা মেয়ে চিঠি ছুড়ে মেরেছিল- নাকি উল্টোটা ঘটেছিল জানি না তবে এমনটাই রটে ছিল।

তৎকালীন সময়ে মানুষরা বেশ সংবেদনশীল ছিলেন। একদিন মুন্না নামক এক ছেলে সাইকেল নিয়ে রশিদ মঞ্জিলের সামনে পড়ে যায়। লোকজন তাকে টেনে তুলে এনে উল্টো পাশে প্রেসের বারন্দায় সেবা দেয়। আমি তার বাসা চিনতাম, সে সম্ভবত পাইলট স্কুলে পড়ত। তাদের বাসা ছিল খুব সরু গলিতে। ডাঃ শফিকুর রহমানের (চোখের ডাক্তার) চেম্বারের পাশেই। তার বাবা খুবই বিরক্ত হয়ে আমার সাথে আসলেন। উনার ছেলেকে নিয়ে সাইকেল ধরে ধরে চলে গেলেন। এরপর পাবলিক শুরু করে দিল কানা ঘুষা। উনি নিজেকে কি মনে করলেন? আমাদের একটু কিছু বললেন না, এইসব।

যাক তৎকালিন সময়ের সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য স্মৃতি হল- আমাদের পাশের বাসার আপা, মাসুম, মামুন ও ঝরনার আম্মা ও রাজ্জাক উকিল সাহেবের স্ত্রী দেদারছে পার্টিশন টিনের ঐ পাশ থেকে আপা আপা বলে ডাকছেন। আমি আমার আপাকে ডেকে নিয়ে আসলাম। সেটা অবশ্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। তাদের কথায় শুনলাম এইমাত্র খবরে প্রকাশ হয়েছে যে শেখ মুজিব সাহেবকে আর্মি মেরে ফেলেছে। বিকেলে মাদ্রাসা মাঠে খেলতে গিয়েছি। একটা নিরব নিস্তব্দ পরিবেশ বিরাজ করছিল আকাশে বাতাসে। আমার অবস্থা হয়েছিল- এইতো কলম থেমে যাচ্ছে— লিখে প্রকাশ করার মত না। এরপর থেকে আর উত্তোলন হল না, এমনিই থেকে গেলাম। ভাষাহীন স্তব্দ একটা ক্ষণ এখন থেমে আছে আমার মননে।

ফিরে আসি পাড়ায়, পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের চেয়ে একটা ছেলে ছিল একটু মেয়েলি। পাড়ার মধ্যে ডানপিটে মেয়ে ছিল ছালেহা ও আলেয়া দুই বোন। এক দুপুরে আমাদের বাসার ঠিক সামনে যে ব্যাচেলার রুম ছিল তার বারন্দায় এসে ফুল গুটি খেলা শুরু করেছে। আমি এগিয়ে গেলাম তাদের সাথে মিশে খেলবো বলে, কিন্তু মুখটা গুমারা করে সে আমাকে বলল আবাদি।

তখন সিলেটী পুরাতন বসতিদের কাছে বাড়াটিয়ারা আবাদি। ওদের ধারণা হয়ত আমরা নন-সিলেটি। নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে এসেছি।

সেই সব ক্ষন আজ স্মৃতি নাম ধারন করে বেঁচে আছে মননে। যা জীবনের সাথে একদা ছিল বহমান, তা নিয়ে এই বর্তমান অতীত হয়ে ভবিষ্যৎ হতে ধাবমান, জীবন নামক ঘটনা-রটনার পরিসমাপ্তিতে। আমার দীর্ঘ এই লেখার পরিসমাপ্তি টানলাম এখানে।

লেখক: মোহাম্মদ ছালিকুর রহমান, এডভোকেট, ২নং বার, জজ কোর্ট সিলেট (সাবেক কর্মস্থল), M.S.S (D.U), LLM. (U.E), LONDON)। বর্তমানে বিলেত প্রবাসী।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com