গত ৩০ জানুয়ারী ছিল ‘কুলাউড়ার ভাসানী ‘ও ‘ বিদ্রাহী সৈয়দ ‘খ্যাত কৃষক শ্রমিক আন্দোলন ও মেহনতি জনতার নেতা সৈয়দ আকমল হোসেনের ৩৬তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৮৫ সালের ৩০ জানুয়ারী তিনি মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন ।
১৯২৭ সালে ৫ জুলাই কুলাউড়া উপজেলার বড়কাপন গ্রামে এই সংগ্রামী নেতা সৈয়দ আকমল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন সৈয়দ ফরজান আলী ও মাতা ছিলেন নুরুন্নেছা চৌধুরী। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। কুলাউড়ার নবীন চন্দ্র হাই স্কুল থেকে মেট্রিক ও সিলেট মদনমোহন কলেজে ইন্টার মিডিয়েট পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। রাজনৈতিক কারনে পরীক্ষা দিতে না পারায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করতে পারেন নি।
ছাত্র জীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে জডিয়ে পড়েন। তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। ১৯৪৬ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আসামের প্রথা বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে কুলাউড়া ও সিলেট কোতোয়ালী থানায় ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাকের পরিবর্তে মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। হবিগঞ্জে বৃটিশ বিচারককে বিচারের আসন থেকে সরিয়ে নিজে ঐ আসনে বসে পড়েন। এ সময় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে ও পরে ছাত্র থাকার কারনে মুক্তি লাভ করেন। তিনি ১৯৪৮ সালে পৃথিমপাশার জমিদার নবাব আলী আমজাদ খানের বাড়ির সম্মুখ দিয়ে ৬০ জন লোকের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে পায়ে জুতা ও মাথায় ছাতা দিয়ে কাচারী ঘরের সামনে দিয়ে পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন। এর আগে কোন লোক এমন ধরনের কাজ করার সাহস করতে পারেন নি। একই বছর কুলাউড়ার স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কুলাউড়ায় প্রতিবাদ সমাবেশ করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এ গ্রেফতারের প্রতিবাদে কুলাউডায় সকাল সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কুলাউড়ায় এলে তাঁকে নাজেহাল করার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে কুলাউডায় যে বিশাল জনসভা হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন- কমরেড আসদ্দর আলী, সৈয়দ আকমল হোসেন, তারা মিয়া, এম এ মজিদ প্রমুখ ।
মৌলভীবাজার জেলায় যত আন্দোলন ও সংগ্রাম হয়েছিল সৈয়দ আকমল হোসেন ছিলেন অগ্রভাগে। ১৯৫৩ সালে কুলাউড়ার বিজলীতে কৃষক সম্মেলন, ১৯৫৭ সালে কুলাউড়ার লস্করপুরে কৃষক সমিতির মহা সম্মেলন, শ্রীমঙ্গলের বালিশিরায় কৃষক আন্দোলন, ১৯৬৩ সালে পাট্টার জমি থেকে জোতদার ও জবর দখলকারীদের উচ্ছেদ অভিযান এবং ঐ বছর পুলিশের গুলিবর্ষন ও হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত ২০ হাজার লোকের বিক্ষোভ মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দেন। এই মিছিলটি ১৯ মাইল পথ পায়ে হেঁটে মৌলভীবাজার শহরে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তিনি ১৯৬৭ সালে বড়লেখার ধামাই চা বাগানে চা শ্রমিক আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে জন নিরাপত্তা আইন ভঙ্গ, ১৯৬৫ সালে রেল কর্মচারীদের আন্দোলনসহ ৮৭ টি চা বাগানের শ্রমিকদের স্বার্থে আন্দোলন করেন। তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রেরণার গুরু ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি জীবনের ১১টি বছর জেল ও আত্মগোপন করে কাটান।
তিনি আজীবন জেল জুলুম উপেক্ষা করে পাকিস্তানী স্বৈর শাসন, দেশীয় জমিদার ও জোতদারদের নির্যাতন, কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর কর্মময় জীবনের উপর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। আমরা আজ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। আল্লাহ মরহুমকে মাফ করে দিন ও বেহেশত নছিব করুন।
লেখক: সভাপতি- ইউকে বাংলা প্রেসক্লাব।