বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৪

হযরত শামুয়েল (আঃ) জীবনী

হযরত শামুয়েল (আঃ) জীবনী

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয় ‘হযরত শামুয়েল (আঃ) জীবনী’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান

জন্ম
১. আফরাহীমের পাহাড়ী এলাকায় রামাথয়িম-সোফীম শহরে ইল্‌কানা নামে একজন লোক আফরাহীম-গোষ্ঠীর লোকদের সংগে বাস করতেন। তাঁর পিতার নাম ছিল যিরোহম। যিরোহম ছিলেন ইলীহূর ছেলে, ইলীহূ ছিলেন তোহের ছেলে এবং তোহ ছিলেন সুফের ছেলে।

২. ইল্‌কানার দুইজন স্ত্রী ছিল; একজনের নাম হান্না আর অন্যজনের নাম পনিন্না। পনিন্নার ছেলেমেয়ে হয়েছিল কিন্তু হান্নার কোন ছেলেমেয়ে হয় নি।

৩. ইল্‌কানা প্রত্যেক বছর তাঁর শহর থেকে শীলোতে যেতেন। তিনি সেখানে গিয়ে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের এবাদত ও তাঁর উদ্দেশে পশু-কোরবানী দিতেন। তখন সেখানে ইমাম আলীর দুই ছেলে মাবুদের ইমাম ছিল। তাদের নাম ছিল হফ্‌নি ও পীনহস।

৪. পশু-কোরবানীর দিনে ইল্‌কানা তাঁর স্ত্রী পনিন্না ও তাঁর সব ছেলেমেয়েদের তাঁর কোরবানী করা গোশ্‌তের একটা করে ভাগ দিতেন।

৫. কিন্তু হান্নাকে দিতেন দুই ভাগ, কারণ তিনি হান্নাকে ভালবাসতেন। মাবুদ কিন্তু হান্নাকে বন্ধ্যা করে রেখেছিলেন।

৬. মাবুদ তা করেছিলেন বলে তাঁর সতীন তাঁকে খোঁচা মেরে কথা বলে তাঁর মন অস্থির করে তুলত।

৭. বছরের পর বছর এইভাবেই চলছিল। হান্না যখনই মাবুদের ঘরে যেতেন পনিন্না তাঁকে ঐভাবে খোঁচা মেরে কথা বলত। তাই তিনি কান্নাকাটি করতেন আর কিছুই খেতেন না।

৮. এ দেখে তাঁর স্বামী ইল্‌কানা তাঁকে বলতেন, হান্না, তুমি কেন কাঁদছ? কেন কিছু খা”ছ না? কেন তোমার এত দুঃখ? আমি কি তোমার কাছে দশটা ছেলের চেয়েও বেশী নই?

৯. এক সময় শীলোতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হান্না উঠে এবাদত-খানায় গেলেন। ইমাম আলী তখন মাবুদের সেই ঘরের দরজার কাছে একটা আসনে বসে ছিলেন।

১০. মনের কষ্টে হান্না মাবুদের কাছে খুব কেঁদে কেঁদে মুনাজাত করতে লাগলেন।

১১. তিনি মাবুদের কাছে মানত করে বললেন, হে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন, তুমি যদি তোমার এই বাঁদীর মনের কষ্টের দিকে চেয়ে দেখ এবং আমার প্রতি মনোযোগ দাও আর আমাকে ভুলে না গিয়ে যদি তোমার এই বাঁদীকে একটা ছেলে দাও তবে সারা জীবনের জন্য আমি তাকে তোমার উদ্দেশে দান করব। তার মাথায় কখনো ক্ষুর লাগানো হবে না।

১২. হান্না অনেকক্ষণ ধরে মাবুদের কাছে যখন মুনাজাত করছিলেন তখন আলী তাঁর মুখের দিকে লক্ষ্য করছিলেন।

১৩. হান্না মনে মনে মুনাজাত করছিলেন বলে তাঁর ঠোঁট নড়ছিল কিন্তু গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না। সেইজন্য আলী ভাবলেন স্ত্রীলোকটি মাতাল হয়েছে।

১৪. তিনি তাঁকে বললেন, তুমি মদ খেয়ে আর কতক্ষণ নিজেকে মাতাল করে রাখবে? মদ আর খেয়ো না।

১৫. জবাবে হান্না তাঁকে বললেন, হে হুজুর, তা নয়। আমি বড় দুঃখিনী; আমি আংগুর-রসও খাই নি, মদও খাই নি। আমি মাবুদের সামনে আমার অন্তর ঢেলে দিচ্ছিলাম।

১৬. আপনার এই বাঁদীকে আপনি একজন বাজে স্ত্রীলোক মনে করবেন না। গভীর দুশ্চিন্তা ও মনের কষ্টে আমি এতক্ষণ মুনাজাত করছিলাম।

১৭. তখন আলী বললেন, তোমার মন শান্ত হোক। বনি-ইসরাইলদের আল্লাহ্‌র কাছে তুমি যা চেয়েছ তা যেন তিনি তোমাকে দেন।

১৮. হান্না বললেন, এই বাঁদীর উপর আপনার দয়া থাকুক। এই বলে তিনি চলে গেলেন এবং খাওয়া-দাওয়া করলেন। তাঁর মুখে আর দুঃখের ছায়া রইল না।

১৯. পরের দিন খুব ভোরে তাঁরা ঘুম থেকে উঠে এবাদত-খানায় গিয়ে মাবুদের এবাদত করলেন। তারপর তাঁরা রামায় তাঁদের নিজেদের বাড়ীতে ফিরে গেলেন। পরে ইল্‌কানা তাঁর স্ত্রী হান্নার সংগে মিলিত হলেন আর মাবুদও হান্নার দিকে মনোযোগ দিলেন।

২০. তাতে হান্না গর্ভবতী হলেন এবং সময় হলে তাঁর একটি ছেলে হল। আমি মাবুদের কাছ থেকে তাকে চেয়ে নিয়েছি, এই বলে হান্না ছেলেটির নাম রাখলেন শামুয়েল।
আল্লাহ্‌র উদ্দেশে হযরত শামুয়েল (আঃ)-কে দান করা

২১.পরে ইল্‌কানা প্রতি বছরের মত আবার তাঁর পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাবুদের উদ্দেশে পশু-কোরবানী ও মানত পূরণ করতে গেলেন।

২২. কিন্তু হান্না গেলেন না। তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন, “ছেলেটিকে বুকের দুধ ছাড়ানোর পর আমি তাকে নিয়ে মাবুদের সামনে উপস্থিত হব যাতে সে সারা জীবন সেখানেই থাকতে পারে।”

২৩. তাঁর স্বামী ইল্‌কানা তাঁকে বললেন, “তোমার যা ভাল মনে হয় তা-ই কর। ছেলেটিকে দুধ না ছাড়ানো পর্যন্ত তুমি এখানে থাক। মাবুদ যেন তাঁর ওয়াদা পূরণ করেন।” কাজেই হান্না বাড়ীতেই রয়ে গেলেন এবং ছেলেটিকে দুধ না ছাড়ানো পর্যন্ত তার দেখাশোনা করতে থাকলেন।

২৪. ছেলেটিকে দুধ ছাড়ানোর পর হান্না তিনটা ষাঁড়, আঠারো কেজি ময়দা, চামড়ার থলিতে করে এক থলি আংগুর-রস এবং ছেলেটিকে সংগে নিয়ে শীলোতে মাবুদের ঘরে গেলেন। ছেলেটি তখনও ছোট ছিল।

২৫. তাঁরা সেখানে একটা ষাঁড় জবাই করে কোরবানী দিলেন এবং ছেলেটিকে আলীর কাছে নিয়ে গেলেন।

২৬. হান্না বললেন, “হে হুজুর, আপনাকে সাক্ষী রেখে আমি কসম খেয়ে বলছি, আমিই সেই স্ত্রীলোক, যে এখানে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে মাবুদের কাছে মুনাজাত করেছিল।

২৭. আমি এই ছেলেটিকে চেয়েই মুনাজাত করেছিলাম, আর মাবুদের কাছে যা চেয়েছিলাম তা তিনি আমাকে দিয়েছেন।

২৮. সেইজন্য ছেলেটিকে আমিও মাবুদকে দিলাম। সে যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন মাবুদেরই থাকবে। পরে তাঁরা সেখানে সেজদা করে মাবুদের এবাদত করলেন।

তিয়ার ময়দান থেকে বের হয়ে হযরত ইউসা (আঃ) বনি ইসরাইলদের কে নিয়ে সিরিয়া থেকে আরম্ভ করে বহু দেশ জয় করেন এবং এক বিশাল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বনি ইসরাইলরা ধীরে ধীরে চরম বিলাশিতা ভোগ ও দায়িত্বহীনতায় আক্রান্ত হয়। তারা নবীদের যাবতীয় আর্দশ ও শিক্ষা সম্পর্ণ ভুলে গিয়ে জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। এমন কি তাদের পিতা মাতা গুরুজন ও আলেম বোজর্গদের কোন উপদেশ প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা পর্যন্ত ত্যাগ করে। তখন তাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের ভাগ্যে নেমে এসে ধ্বংস ও অধপতন।

সিরিয়া বিজয়ের সময় সেখানের অধিবাসি এমেলেকা সম্প্রদায় বনি ইসরাইলদের আক্রমণের ফলে দেশ ছেড়ে অনেক পশ্চিম গিয়ে বসতি স্থাপন করে। তারা সেখানে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে এবং শিক্ষা দিক্ষা অর্জন করে। ফলে তারা এক সময় শক্তি শালী জাতিতে পরিণীত হয়। তখন তারা তাদের পূর্ব পুরুষের দেশ সিরিয়া পুনরুদ্ধারের সংকল্প গ্রহন করে। তারা অস্ত্র-সস্ত্র, ধন সম্পদ ও রসদ, সংগ্রহের অভিজান চালিয়ে এক বিরাট শক্তির অধিকারি হয়। অতপর একসময় তারা বনি ইসরাইলদের প্রতি ঝটিকা আক্রমণ চালায়।

বনি ইসরাইলরা এমেলেকা সম্প্রদায়ের আক্রমণ সম্বদ্ধে আদৌ কোন খবর রাখত না। তারা বিলাশ বহুল জীবন যাপনের নেশায় অচেতন ছিল। এমন সময় এমেলেকাদের আক্রমনে তারা যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে তারা আর সক্ষম হল না। ভাগ্যহতরা অতি সহজে পরাজয় বরণ করে। কতক বন্দি হল, কতক নিহত হল এবং কতক দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হল। তাদের দীর্ঘদিনের আয়েশ আরামের রাজ মহল চূর্ন বিচূর্ন হয়ে গেল। এমেলেকা সম্প্রদয়ের নিকট তারা দাস দাসিরুপে জীবন যাপনের অধিকার পেল।

বনি ইসরাইলদের আল্লাহ তায়ালা একটি নিয়ামত দান করে ছিল তার নাম ছিল তাবুত। তাবুত নামের জিনিস টি হল একটি লোহার সিন্ধুক যার ভিতরে ছিল নবীদের তোহফা। হযরত মুছা (আঃ) এর লাঠি হযরত হারুন (আঃ) পাগড়ি, তিয়া ময়দানে প্রাপ্ত মোনোয়া ছালোয়ার কিছু শুষ্ক খাদ্য ও পাথরে লিপিদ্ধ তৌরাত কিতাবের কিছু অংশ। এ তাবুত ছিল খুবই বরকতপূর্ণ। মানুষেরা যদি কোন নেক নিয়ত করে এটাকে প্রদক্ষিণ করে দোয়া করত তাহলে তা আল্লাহ কবুল করতেন।

কোন যুদ্ধ যাত্রার সময় যদি এটাকে প্রদক্ষিণ করে করে যাত্রা করা হত তাহলে বিজয় অবধারিত হত। এমেলেকাদের আক্রমণে বনি ইসরাইলরা এমন ভাবে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল যে তারা তাবুতের কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। আর যাদের এ কথা স্মরণ ছিল তারা তাবুতের নিকট গিয়ে দোয়া করার অবকাশ পাননি। ফলে জঘন্য পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিতে তারা বাধ্য হয়েছিল।

এমেলেকা সম্প্রদায় সিরিয়া বিজয়ের সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাষ্ট্র ও অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিল এবং সকল সঞ্চল থেকে বনি ইসরাইলদের বিতাড়িত করে দিল। এক কথায় বনি ইসরাইলদের বিশাল রাজ্য ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। তারা সর্বত্র অপদস্ত হল। পলায়ন করল এবং দাস-দাসি রুপে জীবন কাটাতে বাধ্য হল। বাকি কতক লোক পালিয়ে গিয়ে মিশরে আশ্রয় নিল। এ সময় বিধর্মীরা বনি ইসরাইলদের নিকট থেকে কুদরতি সিন্দুক টি ছিনিয়ে নেয়।

সূত্র: কুরআনের শ্রেষ্ঠ কাহিনী




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026