বৃহস্পতিবার, ১৮ অগাস্ট ২০২২, ০৯:০০

সূরা ফাতিহা (শেষ পর্ব)

সূরা ফাতিহা (শেষ পর্ব)

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১৪৪
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয়সূরা ফাতিহা (শেষ পর্ব)’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান

বিভিন্ন হাদীছ, আছার ও বিদ্বানগণের নামকরণের মাধ্যমে অন্যূন ৩০টি নাম বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে ছহীহ হাদীছসমূহে এসেছে ৮টি।

যেমন: (১) উম্মুল কুরআন (কুরআনের মূল)। (২) উম্মুল কিতাব (কিতাবের মূল)। (৩) আস-সাব‘উল মাছানী (সাতটি বারবার পঠিতব্য আয়াত)। (৪) আল-কুরআনুল ‘আযীম (মহান কুরআন)। (৫) আল-হামদু (যাবতীয় প্রশংসা)।(৬) ছালাত। (৭) রুক্বিয়াহ (ফুঁকদান)। (৮) ফাতিহাতুল কিতাব (কুরআনের মুখবন্ধ)। এ নামে সকল বিদ্বান একমত।কারণ এ সূরা দিয়েই কুরআন পাঠ শুরু হয়। কুরআনুল কারীম লেখা শুরু হয় এবং এটা দিয়েই ছালাত শুরু হয় (কুরতুবী)।

এতদ্ব্যতীত অন্য নামগুলি যেমন: (৯) শিফা (আরোগ্য), (১০) আসাসুল কুরআন (কুরআনের ভিত্তি)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) এ নামকরণ করেছেন (ইবনু কাছীর)। (১১) কাফিয়াহ (যথেষ্ট)। ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর এ নামকরণ করেছেন।কারণ এটুকুতেই ছালাত যথেষ্ট এবং এটি ব্যতীত ছালাত হয় না (কুরতুবী)। (১২) ওয়াফিয়াহ (পূর্ণ)। সুফিয়ান বিন উয়ায়না এ নামকরণ করেছেন।

কারণ এ সূরাটি সর্বদা পূর্ণভাবে পড়তে হয়। আধাআধি করে দু’রাক‘আতে পড়া যায় না (কুরতুবী)। (১৩) ওয়াক্বিয়াহ (হেফাযতকারী)। (১৪) কান্‌য (খনি)। এছাড়াও ফাতিহাতুল কুরআন, সূরাতুল হাম্‌দ, শুক্‌র, ফাতিহাহ, মিন্নাহ, দো‘আ, সওয়াল, মুনাজাত, তাফভীয, মাসআলাহ, রা-ক্বিয়াহ, নূর,আল-হামদুলিল্লাহ, ইলমুল ইয়াক্বীন, সূরাতুল হাম্‌দিল ঊলা, সূরাতুল হাম্‌দিল কুছরা’।

এইভাবে নাম বৃদ্ধির ফলে সূরা ফাতিহার মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকাশ থাকে যে,পবিত্র কুরআনের সূরা সমূহের এক বা একাধিক নামকরণ,মাক্কী ও মাদানী সূরার আগে-পিছে সংযোজন ও আয়াত সমূহের বিন্যস্তকরণ সবকিছু ‘তাওক্বীফী’ অর্থাৎ আল্লাহর ‘অহি’ কর্তৃক প্রত্যাদিষ্ট ও রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক সন্নিবেশিত,যা অপরিবর্তনীয়।এর মধ্যে গূঢ় তত্ত্বসমূহ নিহিত রয়েছে।

সূরা ফাতিহার বৈশিষ্ট্য:

১) সূরা ফাতিহা কুরআনের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সূরা। তাওরাত, জবুর, ইনজিল, কুরআন কোনো কিতাবে এই সূরার তুলনীয় কোন সূরা নেই। (বুখারি, মিশকাত : ২১৪২)

২) সূরা আল ফাতিহা এবং সূরায়ে বাকারা’র শেষ তিনটি আয়াত হল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত বিশেষ নূর, যা ইতিপূর্বে কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। (মুসলিম শরীফ : ৮০৬)

৩) যে ব্যক্তি নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার ছালাত অপূর্ণাঙ্গ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ কথাটি তিনবার বললেন। (মিশকাত : ৮২৩)

৪) আবু সা‘ঈদ খুদরী রা. বলেন, একবার এক সফরে আমাদের এক সাথী জনৈক গোত্রপতিকে শুধুমাত্র সূরায়ে ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়ে সাপের বিষ ঝাড়েন এবং তিনি সুস্থ হন। (বুখারি শরীফ : ৫৪০৫)

সুরা ফাতিহার বিশেষ মর্যাদা হলো, আল্লাহ এটিকে নিজের ও নিজের বান্দার মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। একে বাদ দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। সেজন্যই এর নাম দেয়া হয়েছে ‘উম্মুল কুরআন’। পবিত্র কুরআন মূলত তিনটি বিষয়ে বিন্যস্ত। তাওহীদ, আহকাম ও নছীহত। সূরায়ে ইখলাছে ‘তাওহীদ’ পূর্ণাঙ্গভাবে থাকার কারণে তা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু সূরায়ে ফাতিহায় তিনটি বিষয় একত্রে থাকার কারণে তা ‘উম্মুল কুরআন’ হওয়ার মহত্তম মর্যাদা লাভে ধন্য হয়েছে। (তাফসীরে কুরতুবী : ১৪৮)

দারসুল কুরআন: সুরা ফাতিহা। রুক সংখ্যা -১। আয়াত সংখ্যা-৭।

নামকরনঃ এ সূরার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে ‘ফাতিহা’ বলা হয়। তাছাড়া নামাজের মধ্যে এর দ্বারা কিরায়াত আরম্ভ হয় বলে একে এই সূরাতুল ফাতিহা নামে অভিহিত করা হয় (তাফহীমুল কোরআন,তাফসিরে ইবনে কাসির)

শানে নূযুল- একদিন নবী করিম (স) নভোমন্ডলে একজন জ্যোর্তিমান পুরুষকে অবলোকন করলেন। তিনি মহানবী (স) কে নাম ধরে ডাকলেন, তিনি লাব্বায়েক বলে উত্তর দিলেন। স্বর্ণ সিংহাসনে উপবিষ্ট সেই পুরুষটি কলেমা শাহাদাত পাঠ করে বললেন, আমাকে ভয় পাবেন না, আমি আপনার বন্ধু জিব্রাঈল। তারপর সেই মহান পুরুষ এই সূরা সম্পুর্ণ পাঠ করলেন এবং মহানবী (স) কে তা শিক্ষা দিলেন। (ফাতহুল আজিজ, সনদ সম্পর্কে কোন ধারনা পাওয়া যায়নি)

নাযিলের সময় কাল- যদিও এর নাযিল কাল নিয়ে হালকা কিছু মতবিরোধ রয়েছে কিন্তু জমহুর ওলামাদের দৃষ্টিতে এবং হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা পরিস্কার ভাবে জানা যায় যে, এটি হুজুর স এর নবুওয়াত সময়ের প্রথম দিকের সূরা। এর আগে অন্য কোন পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল মাত্র কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিল। সেগুলো হলো সুরা ইকরা, সূরা মুজাম্মিলের এবং মুদাস্সিরের কয়েকটি আয়াত।

মর্যাদা- মর্যাদার দিক থেকে সুরা ফাতেহা অন্যান্য বৈশিষ্টের অধিকারী। এটি প্রথম অবর্তিন পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর তেলাওয়াত ব্যতিত নামাজ আদায় হয় না। এই সূরার বৈশিষ্ট সম্পর্কে কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক নিজেই প্রশংসামুলক আয়াত নাযিল করে বলেন- আমি তোমাকে সাবআ’ মাসানী (বার বার আবৃত্তি যোগ্য সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি। সূরা আল হিজর-৮৭।

হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা) থেকে দির্ঘ এক হাদিস থেকে জানা যায় যে, হুজুর (স) সবাআ’ মাসানী বলে সুরা ফাহেতা কে বুঝিয়েছেন। সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত ছাড়া নামাজ আদায় হবে না বলে হাদিসে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে। এ রকম মর্যাদা সম্পন্ন কোন সূরা পুর্ববর্তি কোন আসমানী কিতাব সমূহে দেওয়া হয়নি বলে সহিহ সনদে বর্ণনা রয়েছে।

নামগত বৈশিষ্ঠ সমূহ- সূরা ফাতেহার একাধিক নাম রয়েছে। আমরা তার কিছু বিবরন দিচ্ছি। উম্মুল কুরআন,.উম্মুল কিতাব, আল-কুরআনুল আযীম, আল ওয়াফিয়া, আল-কাফিয়া (যথেষ্ট), আল-আসাস (মূল), আশ্ শাফিয়া বা আশ্ শিফা। এর বাইরেও সূরা ফাতিহার আরো বিশটিরও বেশি নাম রয়েছে যা এই সূরা ক্ষেত্রে আলাদা বৈশিষ্ঠ।

মুল বিষয়বস্তুঃ অধিকাংশ তাফসিকারকরা এই সূরাকে একটি দোয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জমহুর ওলামাদের মতে সূরা ফাতেহা মুলত একটি মুনাজাত। বান্দা তার মনিবের কাছে হেদায়েত চেয়ে দোয়া করে, মনিবের তরফ থেকে গোটা কোরআন কে তুলে দিয়ে বলা হয়, এই নাও, যেই হেদায়েত তুমি চেয়েছ তার বিবরন।

প্রাসঙ্গিক আলোচণা- এই সূরাটির একটি নাম হচ্ছে উম্মুল কোরআন। ইবনে আব্বাস রা একে পরিপুর্ণ কোরআন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যে কারণেই এই সূরাটির ব্যাখ্যা বা আলোচণা কেয়ামত পর্যন্ত লিখে শেষ করা যাবে না। এ কারনে আমরা কেবল শিক্ষনীয় কিছু নির্দেশনা নিয়ে আলোচণা সিমিত করে দিয়েছি।

আমরা প্রথমেই জেনেছি যে, এটি মুলত একটি দোয়া। বান্দা তার রবের কাছে হেদায়েতের জন্য দোয়া বা মুনাজাত করছে। আল্লাহ পাক তার বান্দাদের কে দোয়া করার পদ্ধতি শিখানোর সাথে সাথে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে স্পষ্ট ইংগিত দিয়েছেন। এই বিষয়গুলো কেই মুলত আমরা সামনে আনার চেষ্টা করছি।

আনুসাঙ্গিক আলোচনা: এই সূরাটি কে আমরা একটি মানপত্রের সাথে তুলনা করে শিক্ষা নিতে চাচ্ছি। প্রথমে চিন্তা করুন আপনারা মানপত্র কিভাবে লিখেন। মানপত্র লেখা হয় বিশেষ কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের উদ্ধেশ্যে তার কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করে। এই মানপত্রের তিনটি দিক থাকে। প্রথম দিক- বিশেষ ব্যক্তির বা অতিথীর উদ্ধেশ্যে প্রশংসা মুলক বাক্য। দ্বিতীয় দিক- যারা প্রশংসা করে মানপত্র রচণা করেন তাদের সাথে অতিথীর সম্পর্ক বিষয়ক বর্ণনা। তৃতীয় দিক-কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু কামনা করা বা প্রত্যাশা মুলক বাক্য দিয়ে শেষ করা।

মানপত্রের তিনটি দিক কে মাথায় নিয়ে সূরা ফাতিহাকে অধ্যায়ণ করুন। সূরা ফাতেহারও তিনটি পর্ব রয়েছে। নিচে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।

প্রথম পর্ব হচ্ছে আল্লাহ পাকের প্রশংসা মুলক বাক্য দিয়ে প্রার্থনা শুরু করা। প্রথম তিনটি আয়াতে আমরা আল্লাহ পাকের প্রশংসা করি। আল্লাহ পাক সম্পর্কে আমাদের আকীদা বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত ঘোষনা প্রদাণ করি। আপনি আল্লাহ পাকের কাছে কিছু চাইবেন কিন্তু তার সম্পর্কে নিজের আকীদা বিশ্বাসের স্পষ্ট ঘোষণা দিবেন না তা হতে পারে না।

কোন দোয়া করার আগে বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ পাকের প্রশংসা করুন, অতপর নিজের গোলামীর পরিচয় দিয়ে দোয়া করুন। কিভাবে করবেন, কোন ভাষায় করবেন সেটা বলে দেওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ পাক নিজের পরিচয় তুলে ধরে আকীদা বিশ্বাসের প্রাথমিক একটি ছক একে দিলেন খুবই নিপুণ ভাবে।

এবার খেয়াল করুন আপনি প্রতিনিয়ত কি কি আকীদা বিশ্বাসের ঘোষণা দিচ্ছেন। এটা জেনে নিলে নিজের জীবনের প্রতিটি দিকে, চিন্তা চেতণায় সূরা ফাতিহার শিক্ষা বিরোধী কিছু থাকলে সেটা দুর করতে পারবেন। الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি নিখল বিশ্ব –জাহানের রব।

প্রশংসা কেবল মাত্র আল্লাহ পাকের। এই আয়াতের মাধ্যমে সৃষ্টি পুজার সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষ বা মানুষ নামধারী শয়তানের আনুগত্যের প্রথম ধাপ হচ্ছে তার অনৈতিক প্রশংসার ফূরঝুরী ছাড়ানো। ইসলাম এর পথ বন্ধ করে দিয়েছে কোরআনের প্রথম আয়াত দিয়ে। আপনি দুনিয়ার কোন প্রান্তরে যেখানে বা যে বস্তুর মধ্যে যে আকৃতিতেই কোন সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট ও শ্রেষ্ঠত্ব বিরাজমান দেখুন না কেন, তার উৎস হিসেবে আল্লাহর পাকের সত্তাকেই মেনে নিবেন। এ কারনে দুনিয়ার কোন সৃষ্টিই মানুষের পুজা, উপাসনা বা আনুগত্যের হকদার হতে পারে না, কেবল মাত্র আল্লাহ পাক ছাড়া। হুজুর স বলেন, ফাসেকের প্রশংসা করলে আল্লাহর আরশ প্রকম্পিত হয়। অথচ আমরা ফাসেকের প্রশংসা করতে সিদ্ধ হস্ত। ফাসেক ছাড়া যেন আমাদের দুনিয়া চলেই না।

আল্লাহ পাককে আপনি বিশ্ব জাহানের রব বলে ঘোষণা দিয়ে তার সার্বভৌমত্বকে মেনে নিয়েছেন। তিনি শুধু আপনার রব নন, বরং তিনি গোটা বিশ্বজাহানেরও রব। অর্থ্যাৎ এই বিশ্বজাহানে সুশৃংখল ব্যবস্থাপনার যে প্রদর্শনী আপনি প্রতক্ষ্য করছেন তার নিয়ন্ত্রন এবং মালিকান একমাত্র আল্লাহ পাকের। তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অংশ হিসেবে তারই আইন বিধানের নির্ভেজাল আনুগত্যের কারণে বিশ্বজাহানে এতটা সূশৃংখলা ও কল্যাণময় অবস্থা বিরাজ করছে। রব শব্দের মধ্যে বিশাল ক্ষমতা, মালিকানা এবং বড়ত্বের অর্থ রয়েছে। রয়েছে লালনকারী, পালনকারী, সংরক্ষনকারী এবং অভিভাবক অর্থও। এই অর্থে সাধারণ কোন মানুষ মানুষের জন্য আইন বিধান দাতা হতে পারে না।

আল্লাহকে রব বলে স্বিকার করার পরে অন্যের আইন বা হুকুমের আনুগত্য কারীর অবস্থা সেই চাকরের মতো যে, নিজের মনিবকে রব বলে স্বিকার করে কিন্তু হুকুম মানে অন্যের। রব মানে একজন কে কিন্তু কর্মের দ্বারা সন্তুষ্টি তালাশ করে অন্যের কাছে। হুজুর স এর দোয়ার ভাষা ছিলো এরকম। আপনি আমার রব, আমি আপনার গোলাম, গোলামের ঘরের গোলাম। গোলাম মনিবের হুকুমের অনুগত থাকবে। একজনের টা খাবে, হুকুম মানবে অন্য জনের এটা তো বিদ্রোহ মুলক আচরণ। এ কারনেই আল্লাহ পাককে রব হিসেবে গ্রহণ করলে দুনিয়ার কোন ব্যক্তির হুকুমের আনুগত্য করা যায় না।

পরম দয়ালু দাতা। الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
তিনি শুধু ক্ষমতা আর কতৃত্বের কারনেই বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনা করছেন বা করতে বাধ্য এমনটি নয়। বরং তিনি তার অসীম রহমত দিয়ে গোটা বিশ্বজাহানকে লালন পালন করে চলছেন। বাধ্য, অবাধ্য সকল সৃষ্টিকে তিনি পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন তার রহমতের কারণে। তার দয়ার আধিক্য এত বড় যে, শুধুমাত্র রহমান বলে খ্যান্ত হয়ে যাননি, সাথে সাথে রহিম শব্দও যোগ করে দিয়েছেন। রহমান ও রহিম শব্দটির ব্যাখ্যা আমরা বিসমিল্লাহর দারসে করেছি বিধায় এখানে তা করা হলো না।

বিচার দিবসের মালিক مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
যেদিন গোটা মানব জাতির কর্মকান্ডের হিসেবে নেওয়া হবে এবং নির্ভূল জ্ঞান এবং আইনের ভিত্তিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালণা করা হবে, সেদিনের সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিকও তিনি। কেবল দয়া মায়ার ওয়াজ শুনার সাথে সাথে বান্দা যাতে বেপরওয়া না হয়ে যায় এই বিষয়কে সামনের রেখে জানিয়ে দেওয়া হলো, তিনি কেবল দয়ার সাগরই নন, বরং শেষ বিচারের দিনের বিচারকও।

তিনি প্রত্যেককে তার কর্মের ভিত্তিতে পুরস্কৃত করবেন অথবা শাস্তি দিবেন। সেখানে তার জ্ঞান ও আইনের অধিনে বিচার পক্রিয়া কাউকে শাস্তি দিলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। কেউ সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে পারবে না। তেমনি কাউকে ক্ষমা করে দিলেও কেউ কৈফিয়াত চাইতেও পারবে না। সকল ক্ষমতার মালিকানা কেবল তারই হবে।

এই বিষয়ে সুরা নাবার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে- প্রতিদান ও যথেষ্ট পুরস্কার তোমাদের রবের পক্ষ থেকে, সেই পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি পৃথিবী ও আকাশসমূহের এবং তাদের মধ্যবর্তী প্রত্যেকটি জিনিসের মালিক , যার সামনে কারো কথা বলার শক্তি থাকবে না। সুরা নাবা-৩৬-৩৭।

যারা দুনিয়ার সমসাময়িক মানব রচিত আইন কানুনকে ভালো মন্দের মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিয়ে ভালো আর মন্দের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিয়েছেন তাদের জানা উচিত যে, পরকালে বিচার কিন্তু আল্লাহ পাকের নাযিল করা আইন ও বিধাণ দিয়ে করা হবে। দুনিয়ায় মানুষের আইনে অপরাধী ব্যক্তিরা খুশির সাথে পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে সেখানে। তেমনি বর্তমান সময়ের বিধানে যারা সম্মানিত বা পুরস্কারের হকদার সেজেছেন পরকালের বিচারে তাদের কে চরম বিচারের মুখো মুখী দাড় হতে হবে এই শিক্ষা সূরা ফাতেহা প্রতিনিয়ত দিচ্ছে এভাবে যে তিনি বিচার দিনের বাদশাহ।

দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে, বান্দার নিজের পরিচয়। আমরা তোমারই ইবাদত করি, এবং তোমরাই কাছে সাহায্য চাই إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ আমরা তোমাকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছি বিধায় আমরা তোমার গোলাম। আমরা তোমারই গোলামী করি এবং তোমার কাছে নিজেদের হাজত পেশ করি। আমরা কেবল তোমার আনুগত্য করি এবং তোমার কাছেই প্রতিদান আশা করি। ইবাদত শব্দটির কয়েকটি অর্থ আছে। এক-পুজা, আরাধনা, স্তুতি প্রকাশ করে কারো কাছে হাজত পুরনের জন্য দোয়া করা।

হাদিস শরীফে এসেছে, দুয়াই ইবাদতের মুল। অন্য এক রেওয়াতে রয়েছে, দুয়াই ইবাদত। দুই-আইন বিধান বা হুকুমের আনুগত্য করা। কারো নির্দেশ মেনে নিয়ে তার আনুগত্য গ্রহণ করা। কেয়ামতের ময়দানের বান্দাদের কে শয়তানের গোলামী করার অপরাধে যখন গ্রেফতার করা হবে তখন তারা অবাক হয়ে ভাববে যে, আমরা কোথায় শয়তানের ইবাদত করেছি, আমরা তো প্রতিদিন শয়তানের ওপর লানত করেছি। তখন তাদের কে জবাব দেওয়া হবে যে, শয়তানের দেখানো আইন বিধানের নির্ভেজাল আনুগত্য করার নামেই হচ্ছে শয়তানের ইবাদত।

এই বিষয়ে সূরা ইয়াসিনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তিন- বন্দেগী, দাসত্ব করা। আল্লাহর হুকুম মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করে তার কাছেই প্রার্থনা করা সব কিছুই ইবাদতের মধ্যে শামিল রয়েছে। আল্লাহর কোন গোলাম অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে পারে না। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চায় তাহলে সে শিরক করে। হাদিসে এসেছে নবী করিম (স) বলেন, যখন কিছু চাইবে আল্লাহর কাছই চাইবে।

এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। আমরা দুনিয়ার জীবনে বহু মানুষের কাছেই বিভিন্ন জিনিস চেয়ে নিই। জাগতিক জীবনে কেউ কারো কাছে কিছু চাওয়া কিভাবে শিরক হতে পারে ? উত্তর হচ্ছে, ধরুন আপনার পিপাসা লাগলো। আপনি আপনার চাকরের কাছে পানি চাইলেন, এটা শিরক হলো না কারণ আপনি জানেন পানি কোথা থেকে দেওয়া হবে বা কিভাবে দেবে। পানি দেওয়ার সকল পক্রিয়া বা কার্যকরন আপনার সম্মুখে ঘটছে।

অথচ পানি যদি চাকরের কাছে না চেয়ে মৃত বা দুরের কোন বুজুর্গ ব্যক্তির কাছে প্রার্থনা করে ডেকে বলেন, ওহে অমুক.., আমার পিপাসা লেগেছে, আমাকে পানি দাও, তাহলে নিশ্চিত শিরক করলেন। কারণ এমন ব্যক্তির কাছে আপনি পানি চাইলেন যিনি কার্যকরন পক্রিয়ায় আপনার সম্মুখে নন। এমন অবস্থায় আপনাকের পানি দেওয়ার কোন ক্ষমতাও তার নেই।

আজকাল কোন কোন লোকজন কে দেখা যায় বিভিন্ন মাজারে বা পীরের দরবারে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে দোয়া করেন। তারা পীর, মুর্শিদের দরবারে বা কোন দরগায় গিয়ে সন্তান চেয়ে দোয়া করে। চাকুরী দেওয়ার জন্য কবরের বা জীবিত কোন বুজুর্গের পায়ে ভেট প্রদাণ করে। তারা জানে না যে, এগুলো স্পষ্ট শিরক। কারণ মৃত বা জীবিত কোন ব্যক্তিরই ক্ষমতা নেই কাউকে সন্তানের মালিক বানিয়ে দেওয়া।

তারা আবার যুক্তিও তুলে ধরেন যে, আমরা তাদের কাছে প্রার্থনা করি কারণ তারা আল্লাহ পাকের কাছে আমাদের দোয়া নিয়ে যাবেন, আমরা গোনাহগার আমাদের দোয়া কবুল হবে না। এই কথাটি কিন্তু মক্কার মুশরিকরাও বলতো। তারা দাবি করতো আমরা মুর্তিগুলো কে খোদা মনে করে তাদের কাছে প্রার্থনা করি না, আমরা মনে করি তারা আমাদের কে বা আমাদের দোয়া গুলো কে আল্লাহ পাকের নিকটে নিয়ে যাবে। এই কারনে আল্লাহ পাক বলেন, তাদের কে বলে দাও, তোমরা ডাকলে তিনি সাড়া দেন। তিনি তোমাদের অতি নিকটে।

তৃতীয় ধাপ হচ্ছে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসটি কামণা করা, প্রার্থনা করা। আমরা বলছি- اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ মানুষের জীবনে সব থেকে বড় চাওয়া পাওয়া হচেছ হেদায়েতের রাস্তার সন্ধান চাওয়া এবং তার ওপর কায়েম থাকার তৌফিক কামনা করা। এই কারণে অনেক মুফাস্সিরগন হেদায়েত শব্দের অর্থ করেছেন সহজ সরল পথে দাড়িয়ে থাকার তৌফিক দেওয়া। এই কাজটি অত্যান্ত কঠিন। হেদায়েত পেয়ে গেলেই নাজাত পাওয়া সহজ নয়, বরং হেদায়েতের ওপর টিকে থাকাই আসল ব্যাপার।

জাগতিক সকল সামগ্রি দুনিয়ার বুকে পাওয়া যায় যেতে পারে কিন্তু হেদায়েত বা সহজ সরল পথ পাওয়া যেতে পারে না। হেদায়েত পেতে হলে তার জন্য উদগ্রিব হতে হবে, চিন্তা ফিকির করতে হবে, আল্লাহর কাছে হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে হবে।

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি করুনার চরম নিদর্শন যে, তিনি তার বান্দাদের কে অন্ধকারে হাতরে মরার হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। তাদের কে ভুল কর্মপন্থা গ্রহণের হাত থেকে উদ্ধার করে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখাতে নবী রাসুল (আ) প্রেরণ করেছেন। এই খানে দুটি বিষয় আছে। অত্যান্ত গুরুত্ব্যের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

এক-আল্লাহ রব্বুল আলামী কেবল সিরাতুল মুস্তাকিমের কথা বলেই থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে সিরাতুল মুস্তাকিমের একটি নমুনাও দিয়েছেন। শেষ নবীর (স) উম্মাত হিসেবে আমাদের জন্য সিরাতুল মুস্তাকিম বা সহজ সরল পথের সন্ধান করতে হবে প্রতিনিয়ত, প্রতি যুগে কিন্তু নবী প্রেরনের সিলসিলা বন্দ হয়ে গেছে।

এই অবস্থায় তিনি সহজ সরল পথ তথা হেদায়েতের একটি নমুনা প্রদর্শন করেছেন এভাবে যে, যাদের ওপর করুনা বা অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে। অনুগ্রহ প্রাপ্ত কারা কারা এই প্রশ্নের জবাবও আল্লাহ পাক নিজেই অন্য আয়াতে দিয়েছেন এভাবে- “য ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে সে তাদের সহযোগী হবে,যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। মানুষ যাদের সংগ লাভ করতে পারে তাদের মধ্যে এরা কতই না চমৎকার সংগী। সুরা নিসা-৭০।

এই কারনে সহজ ও সরল পথের ওপর টিকে থাকতে হলে আলেম তথা নবী সত্যিকারের ওয়ারিশদের দলভুক্ত হতে হবে। কোন জালেম, ফাসেকের নেতৃত্বে জীবন যাপন করে সারাদিন হেদায়েতের দোয়া করলে কোন লাভ হবে না। কল্যান এবং নাজাতের পথ হচ্ছে হক্কানী আলেম ওলামা এবং কোরআনের ধারক বাহকগনের পথ। তাদের সাথেই থাকতে হবে।

দুই-সহজ সরল পথের বর্ণনা দেওয়ার সাথে সাথে গোমরাহী, অভিশপ্ত পথের পরিচয়ও তুলে ধরেছেন। এখান থেকে আপনি দাওয়াতী কাজের নমুনা গ্রহণ করতে পারেন। এটা একটি স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতি যে, আপনি কাউকে হেদায়েতের বয়ান শুনাবেন কিন্তু তার সামনের গোমরাহীতে লিপ্ত হওয়ার পথটি চিনিয়ে দিবেন না তাহলে তার হেদায়েতের পথে আসা কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না। কারণ কেউ হয়তো হেদায়েত পেয়ে সামান্য দ্বীনদারী শিখলো কিন্তু গোমরাহী না চেনার কারণে জীবনের কোন না কোন অংশে গোমরাহীকে লালন করতে থাকলো। এ অবস্থায় সেই ব্যক্তিটির হেদায়েতের ওপর চলার কোন ফল আখেরাতে পাবে না।

কারণ গোমরাহী, তথা শিরক বেদয়াতের সহায়ক কর্মকান্ড মানুষের আমল গুলো কে এমন করে ছাই করে দেয় যে সে নিজেও টের পায় না। এই কারণে আল্লাহ পাক হেদায়েতের বয়ান করার সাথে সাথে গোমরাহী থেকে দুরে থাকার জন্য গোমরাহ দলগুলোর বৈশিষ্ঠ ও পরিচয়ও তুলে ধরেছন সংক্ষিপ্ত করে। এই অভিশপ্ত গোমরাহ জাতিগুলোর ব্যাখ্যা কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া হয়েছে। গোমরাহ জাতিগুলো হচ্ছে, ইয়াহুদী,মুশরিক এবং খৃষ্টান সম্প্রদায় বা আহলে কিতাব। মুফাস্সিরদের মতে অভিশপ্ত হলো ইয়াহুদীরা, আর পথভ্রষ্ট হলো খৃষ্টানরা।

অন্যদিকে মুশরিকরা হচ্ছে উভয়দোষে দোষি। এদের চিন্তা চেতণা ধারণ করে কেউ যদি নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করে তাহলে ধরে নিতে হবে সে হয়তো কিছুটা হেদায়েত ধারণ করে নিয়েছে পাশাপাশি গোমরাহীকেও কাধে করে বেড়াচেছ। এরা একদিকে বিশাল বিশাল আমল করবে, অন্যদিকে শিরক আর বেদয়াতের সমর্থক হয়ে আমল গুলো কে ফানুশের মতো করে উড়িয়ে দেবে। এই সকল লোকেরা দুনিয়ায় সাময়িক কল্যাণ ভোগ করলেও আখেরাতে নিঃস্ব হয়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

অভিশপ্ত জাতির রসম রেওয়াজ, আইন বিধাণ ধারণ করা, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা, তাদের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া হারাম। তাদের কে যারা বন্ধু বানায় তারা মুনাফেক। এই বিষযে বিভিন্ন্ আয়াতে কঠোর হুশিয়ারী আছে। আমরা মাত্র কয়েকটি আয়াত তুলে ধরছি।

১। হে মুমিনগণ, আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে। সূরা মুমতাহিনা-১৩।

২। বলুনঃ হে আহলে কিতাবগণ, আমাদের সাথে তোমাদের এছাড়া কি শত্রুতা যে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি আল্লাহর প্রতি, আমাদের উপর অবতীর্ণ গ্রন্থের প্রতি এবং পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থের প্রতি। আর তোমাদের অধিকাংশই নাফরমান।

বলুনঃ আমি তোমাদেরকে বলি, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধাম্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শুকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের আরাধনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে। সুরা মায়েদা-৫৯-৬০।

৩। বনী-ইসলাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়মতনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা একারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমা লংঘন করত। সূরা মায়েদা-৭৮।

সার্বিক শিক্ষা: করনীয়- সূরা ফাতেহার শিক্ষা ধারণ করে পথ চলা। আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা করার স্পষ্ট নিয়ম হচ্ছে সূরা ফাতেহা। হুট করে মুখে যা আসে তাই না বলে ফাতিহার নিয়ম অনুশরন করে দোয়া করা। হুজুর স এই পদ্ধতি অবলম্বন করে দোয়া করতেন। তিনি বলতে, হে আল্লাহ আপনি আমার মনিব, আমি আপনার গোলাম, আমাকে সাহায্য করুন।-মুসলিম। সর্বদা হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করা। নিজের জীবনে হেদায়েতের ওপর টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত আল্লাহ পাকের সাহায্য কামণা করে দোয়া করা। মানুষকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করার সাথে সাথে গোমরাহীর সুস্পষ্ট পরিচয় তুলে ধরে সুস্পষ্ঠ ধারণা পেশ করে সেখান থেকে দুরে থাকার নসিহাত দেওয়া।

বর্জনীয়- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রাথী হওয়া, কোন ব্যক্তি বা বুজুর্গের কবল বা দরগার উদ্ধেশ্যে প্রার্থনা বা দোয়া না করা। মৃত কোন ব্যক্তিকে উসিলা করে দোয়া না করা। ইয়াহুদী, খৃষ্টাণ আর মুশরিকদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব্যস্থাপণ না করে তাদের পথ থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করা। চলনে বলনে, কথনে তাদের রসম রেওয়াজ তথা স্টাইল পরিত্যাগ করা। কোন ইয়াহুদি, খৃষ্টান অথবা মুশরিককে নিজের নেতা, অভিভাবক, দায়িত্ব্যশীল নির্বাচণ না করা। অভিসপ্ত ইয়াহুদী, খৃষ্টান আর মুশরিকদের রচিত মতবাদ থেকে দুরে থেকে আল্লাহ দ্বীন কায়েমের মেহনতে শরীক হওয়া।

আল্লাহ পাক আমাদের কে তেফিক এনায়েত করুন। দির্ঘক্ষণ ধৈর্য ধরে দারসটি পাঠ করার জন্য অফুরন্ত ধন্যবাদ।

সূরা ফাতিহার ফজিলত: সুরা ফাতিহার ফজিলত অপরিসীম। এর ফযীলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:-

১) আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা সূরা ফাতিহা পড়। কোন বান্দা যখন বলে, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। যখন বলে, আর-রহমা-নির রহীম, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুন বর্ণনা করেছে।
বান্দা যখন বলে, মালিকি ইয়াউমিদ্দীন। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। বান্দা যখন বলে, ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া ইয়্যা কানাস্তাইন, আল্লাহ বলেন, এ হচ্ছে আমার ও আমার বান্দার মাঝের কথা। আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চায়।
বান্দা যখন বলে, ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম.. (শেষ পর্যন্ত)। আল্লাহ বলেন, এসব হচ্ছে আমার বান্দার জন্য। আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চায়। (মুসলিম শরীফ : ৩৯৫)

২) ইবনে আববাস (রা.) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে জিবরাঈল (আ.) উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ জিবরাঈল (আ.) ওপর দিকে এক শব্দ শুনতে পেলেন এবং চোখ আকাশের দিকে করে বললেন, এ হচ্ছে আকাশের একটি দরজা যা পূর্বে কোনদিন খোলা হয়নি। সে দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ‘আপনি দু’টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন যা আপনাকে প্রদান করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি। তা হচ্ছে সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ দু’আয়াত।’ (মুসলিম শরীফ : ৮০৬)

৩) উবাই ইবনু কা’ব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ উম্মুল কুরআনের মত তাওরাত ও ইনজিলে কিছু নাজিল করেননি। এটিকেই বলা হয়, ‘আস-সাবউল মাছানী’ (বারবার পঠিত সাতটি আয়াত), যাকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, সে যা চাইবে’। (নাসায়ী শরীফ : ৩১৯) আল্লাহ যেন আমাদের সকলকেই সূরা ফাতিহার প্রতি আমল করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দান করেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2022