প্রাকৃতিক লীলা ভূমি ও নানা সৌন্দর্যে ভরপর ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ ক্রোয়েশিয়া। দেশটি ইউরোপ উপকুলের দক্ষিণ পূর্ব কেন্দ্রে অবস্থিত। ভৌগলিক ভাবে দেশটির উত্তর পূর্ব সীমান্তে রয়েছে হ্যাঙ্গেরি,পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণ পূর্বে বজনিয়া, হার্যগভিনা ও মান্টিনির্গ দশ অবস্থিত।
দেশটির সরকারি নাম রিপাবলিক অফ ক্রোয়েশিয়া। দেশটির তিন ভাগের এক ভাগ জুড়ে রয়েছে সৌন্দর্য ঘেরা প্রাকৃতিক বনভূমি। যা বিশ্বের পর্যটকদের দারুণ ভাবে আকর্ষণ করে। দেশটিতে অনেক বনভূমি রয়েছে,যেখানে এখনো মানুষের পা পড়েনি।
তাছাড়া দেশটির উপকুল জুড়ে হাজারো আকৃতির দ্বীপ রয়েছে। অপূর্ব এই দ্বীপে প্রচুর দর্শনার্থীরা ভিড় জমান। ক্রোয়েশিয়া বিশ্বের পর্যটকদের জন্য একটি উপযুক্ত দর্শনীয় স্থান। দেশটির অর্থনৈতিক আয়ের সিংহভাগ আসে পর্যটক খাত থেকে।

লেখক শিহাবুজ্জামান কামাল
এটি বিশ্বের শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্রের একটি দেশ। ক্রোয়েশিয়া ১৯৯১সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ৫৬ হাজার ৫৯৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটির জনসংখ্যা ৪০লাখ।
দেশের সরকারি ভাষা ক্রোয়েশিয়ান। যা ল্যাথিন ও রমান লিপিতে লিখা হয়। দেশটির সরকারি মুদ্রার নাম কুণে। এক পাউন্ড সমান প্রায় সাড়ে ৮ কুণে।
ক্রোয়েশিয়ার প্রায় ৮৬ ভাগ মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মানুলম্বী। দেশটিতে মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। জাগরেভ ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী।
এটি প্রধান ও ক্রোয়েশিয়ার বৃহত্তম শহর। শহরটি দেশের দক্ষিণ পশ্চিমে শাবা নদী তীরে অবস্থিত।
এই শহরে ১৮/১৯শতকের ঐতিহাসিক অসাধারণ কিছু স্থাপনা রয়েছে,যা দেখতে প্রতি বছর লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে সেখানে। ক্রোয়েশিয়ায় ৪টি ঋতু রয়েছে। শীতকালে তাপমাত্রা মায়নাস ৫ ডিগ্রী এবং গ্রীষ্মকালে থাকে প্রায় ২২ডিগ্রী সেলসিয়াস।
সেখানে রয়েছে মহাসাগরিয় আর্দতাপুর্ণ চমৎকার আবহাওয়া। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ক্রোয়েশিয়ায় রয়েছে ৮টি জাতীয় পার্ক।
আরো রয়েছে স্বচ্ছ পানির বৈচিত্র্য পূর্ণ লেক। মন জুড়ানো সাগর পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে সামদ্রিক মাছ দেখা যায়। এর মধ্যে প্রিভিচ লেক ক্রোয়েশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম লেক।
সেখানে দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রিটভাইসার সিন। সেখানে প্রবাহিত ১৬টি ছোট ঝর্ণা নিয়ে সাজানো লেক গুলোর দৃশ্য দারুণ চমৎকার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এই স্থান দেখতে বোটে করে ঘুরতে যান ভ্রমণ পিপাসুরা।
দেশটির জনপ্রিয় খেলা ফুটবল।
ক্রোয়েশিয়ায় ভবনকে বলা হয় ভিলা। বিমান বন্দরের সন্নিকটে ছিল আমাদের ভিলা। উবার ডেকে চলাচলে করতে হয়। অনেকেই ইংরেজি বলতে পারেনা।
প্রথমে আমরা ক্রোয়েশিয়ার ডাবরোভিংক বিমান বন্দরে অবতরন করি। পরে সেখান থেকে উবার ডেকে বিমান বন্দরের পাশে কেপিটনো এলাকার বাসায় গিয়ে উঠি। ঘরের মালিক ভদ্র মহিলা ইভানা সাদরে আমাদেরকে গ্রহণ করলেন।
তিনি আমাদের রুম এবং অন্যান্য আসবাব পত্র দেখিয়ে দিলেন। সুন্দর পরিপাটি বিছানা। ঘরের পাশে সুইমিংপুল। ঘরের বারান্দা থেকে রাতে দুরের দৃশ্য গুলো ছিল দারুণ উপভোগের। চারিদিকে নীরব ছিমছাম পরিবেশ। সাগরের মৃদু হিমেল হাওয়ার আমেজে হৃদয় ছোঁয়ে যায়।
উচু নীচু রাস্তা দিয়ে পাহাড়ি সুরু পথ। বেপরোয়া গাড়ি চালক। হাতে মোবাইল ধরে অন্যের সাথে কথা বলছে। এরা আধো আধো ইংরেজি বলে। রাস্তায় মানুষ চলাচল কম। নীচে তাকালে গা শিউরে উঠে। কেনাকাটার জন্য দুরে সুপার মার্কেট যেতে হয়। সেখানে স্থানীয় শাকসজ্বি,টাটকা ফল পাওয়া যায়।
পাহাড়ের কোণে কোণে পাকা বাড়ি। বাড়ির আঙ্গিনায় রয়েছে আঙ্গুর, জলপাই, ডালিম, লেবু, আপেল ও তিনের গাছ। ফলের সুমিষ্টি স্বাদ।
আমরা সেখান থেকে প্রথমে স্থানীয় ঐতিহাসিক শহর ‘অল্ড টাউন’ দেখতে যাই। সেখানে রয়েছে ঐতিহাসিক ক্যাসেল। সেখানে পর্যটকদের আনাগোনা। রয়েছে রকমারি দোকান, খাবারের রেস্তেরাঁ। পুরনো মার্কেট ভবনের ভেতরে রয়েছে একটি মসজিদ। আমরা মাগরিব ও এশার নামাজ সেখানে আদায় করি।
পাশেই রয়েছে পানিতে ভাসমান ছোট বড় বোট।বোট ভাড়া করে অনেকে বেড়াতে যান। আমরা আসপাশের এলাকা ঘূরে দেখি। পরের দিন আমরা একটি বড় বোটে করে সমূদ্র ভ্রমনে যাই। দুপুরে আমাদের খাবার ও পানিয় দেয়া হয়। খাবারের তালিকায় ছিল সামদ্রিক মাছ ও সালাদ। পরে আমরা তিনটি দ্বীপাঞ্চল দেখতে যাই।
দ্বীপ গুলোর মধ্যে ছিল: লপুত, ছদুরাধ এবং শীপান আয়ল্যান্ড।
উচূ পাহাড়ের স্থানে স্থানে রয়েছে পাকা ঘর বাড়ি। পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত ঐ দ্বীপ দুরে সাগরে মিলিত হয়েছে। সাগরের স্বচ্ছ পানিতে কেউ সাঁতার কাটছেন। পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কেউবা ঘুরে ঘুরে দেখছেন এবং মনোরম দৃশ্য গুলো ক্যামেরা বন্দি করছেন।
মহান আল্লাহপাকের সৃষ্টি কূলের অপরূপ সৌন্দর্য মহিমা ভাবুক মনকে কিন্তু সত্যি আবেগ আপ্লুত করে। তাই মহুর্তে মনে পড়ে গেল আল্লাহর সেই মহান বাণী ‘তোমরা মহান আল্লাহর কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?
আমাদের ৫ দিনের ক্রোয়েশিয়া সফর বেশ ভালো লাগে এবং দারুণ ভাবে উপভোগ করি। আমাদের সফর সাথী ছিলেন তোহা মোস্তফা ভাই, হাসান মঈনুদ্দিন ভাই, তালহা নূরের ফ্যামেলিসহ ২৫ জনের কাফেলা।
অবশেষে বিদায়ের পালা। আলহামদুলিল্লাহ্ আমরা ২৭ আগস্ট রাত ১০টায় ক্রোয়েশিয়ার ডাবরোভিংক বিমান বন্দর ত্যাগ করি। রাতে লুটন বিমান বন্দর অবতরন করি। দীর্ঘ সফরে সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ভোর চারটায় লন্ডন এসে পৌছি।
লেখক: শিহাবুজ্জামান কামাল। কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
Leave a Reply