শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:৩০

সূরা আন’আম

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১০৩
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয় ‘সূরা আন’আম’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

নামকরণ: এ সূরার ১৬ ও ১৭ রুকূতে কোন কোন আন’আমের (গৃহপালিত পশু) হারাম হওয়া এবং কোন কোনটির হালাল হওয়া সম্পর্কিত আরববাসিদের কাল্পনিক ও কুসংস্কারমূলক ধারণা বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে এ সূরাকে আল আন’আম নামকরণ করা হয়েছে।

নাযিল হওয়ার সময়-কালঃ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে এ সম্পূর্ণ সূরাটি একই সাথে মক্কায় নাযিল হয়েছিল। হযরত মূআয ইবনে জাবালের চাচাত বোন হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটনীর পিঠে সওয়ার থাকা অবস্থায় এ সূরাটি নাযিল হতে থাকে। তখন আমি তাঁর উটনীর লাগাম ধরে ছিলাম। বোঝার ভারে উটনীর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যেন মনে হচ্ছিল এই বুঝি তার হাড়গোড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। হাদীসে একথাও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, যে রাতে এ সূরাটি নাযিল হয় সে রাতেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে লিপিবদ্ধ করান।

এর বিষয় বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে সুস্পষ্টভাবে মনে হয়, এ সূরাটি মক্কী যুগের শেষের দিকে নাযিল হয়ে থাকবে। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদের রেওয়াতটিও একথার সত্যতা প্রমাণ করে। কারণ তিনি ছিলেন আনসারদের অন্তরভুক্ত। হিজরতের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। যদি ইসলাম গ্রহণ করার আগে তিনি নিছক ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণে মক্কায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবে হয়ে থাকবেন তাঁর মক্কায় অবস্থানের শেষ বছরে। এর আগে ইয়াসরেববাসীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এত বেশী ঘনিষ্ঠ হয়নি যার ফলে তাদের একটি মহিলা তার খেদমতে হাযির হয়ে যেতে পারে।

নাযিল হওয়ার উপলক্ষ: সূরাটির নাযিল হওয়ার সময়-কাল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর আমরা সহজেই এর প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পারি। আল্লাহর রসূল যখন মানুষকে ইসলামের দিকে দেওয়াত দেবার কাজ শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে বারোটি বছর অতীত হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশদের প্রতিবন্ধকতা, জুলুম ও নির্যাতন চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। ইসলাম গ্রহণকারীদের একটি অংশ তাদের অত্যাচার নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে দেশ ত্যাগ করেছিল। তারা হাবশায় (ইথিওপিয়া) অবস্থান করছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহায্য-সমর্থন করার জন্য আবু তালিব বা হযরত খাদীজা (রা) কেউই বেঁচে ছিলেন না।

ফলে সব রকমের পার্থিব সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি কঠোর প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে ইসলাম প্রচার ও রিসালতের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। তাঁর ইসলাম প্রচারের প্রভাবে মক্কায় ও চারপাশের গোত্রীয় উপজাতিদের মধ্য থেকে সৎ লোকেরা একের পর এক ইসলাম গ্রহণ করে চলছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমগ্র জাতি ইসলামের অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যানের ঝোঁক প্রকাশ করলেও তার পেছনে ধাওয়া করা হতো। তাকে তিরস্কার, গালিগালাজ করা হতো। শারীরিক দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক,সামাজিক নিপীড়নে তাকে জর্জরিত করা হতো। এ অন্ধকার বিভীষিকাময় পরিবেশে একমাত্র ইয়াসরবের দিক থেকে একটি হালকা আশার আলো দেখা দিয়েছিল। সেখানকার আওস ও খাযরাজ গোত্রের প্রভাবশালী লোকেরা এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাই’আত করে গিয়েছিলেন। সেখানে কোন প্রকার আভ্যন্তরীণ বাধা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হয়েই ইসলাম প্রসার লাভ করতে শুরু করেছিল।

কিন্তু এ ছোট্ট একটি প্রারম্ভিক বিন্দুর মধ্যে ভবিষ্যতের যে বিপুল সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল তা কোন স্থুলদর্শীর দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া সম্ভবপর ছিল না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতো, ইসলাম একটি দুর্বল আন্দোলন। এর পেছনে কোন বৈষয়িক ও বস্তুগত শক্তি নেই। এর আহবায়কের পেছনে তার পরিবারের ও বংশের দুর্বল ও ক্ষীণ সাহায্য-সমর্থন ছাড়া আর কিছুই নেই। মুষ্টিমেয় অসহায় ও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিই ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেন মনে হয় নিজেদের জাতির বিশ্বাস, মত ও পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে তারা সমাজ থেকে এমনভাবে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে যেমন গাছের মরা পাতা মাটির ওপর ঝরে পড়ে।

আলোচ্য বিষয়: এহেন পটভূমিতে এ ভাষণটি নাযিল হয়। এ হিসেবে এখানে আলোচ্য বিষয়গুলোকে প্রধান সাতটি শিরোনামে ভাগ করা যেতে পারে:

এক: শিরকের খণ্ডন করা ও তাওহীদ বিশ্বাসের দিকে আহবান জানানো।

দুই: আখেরাতে বিশ্বাসের প্রচার ও দুনিয়ার জীবনটাই সবকিছু এ ভুল চিন্তার অপনোদন।

তিন: জাহেলীয়াতের যে সমস্ত ভ্রান্ত কাল্পনিক বিশ্বাস ও কুসংস্কারে লোকেরা ডুবে ছিল তার প্রতিবাদ করা।

চার: যেসব বড় বড় নৈতিক বিধানের ভিত্তিতে ইসলাম তার সমাজ কাঠামো গড়ে তুলতে চায় সেগুলো শিক্ষা দেয়া।

পাঁচ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর দাওয়াতের বিরুদ্ধে উত্থাপিত লোকদের বিভিন্ন আপত্তি ও প্রশ্নের জবাব ।

ছয়: সুদীর্ঘ প্রচেষ্টা ও সাধনা সত্ত্বেও দাওয়াত ফলপ্রসূ না হবার কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যে অস্থিরতা ও হতাশাজনক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছিল সে জন্য তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া।

সাত: অস্বীকারকারী ও বিরোধী পক্ষকে তাদের গাফলতি, বিহ্বলতা ও অজ্ঞানতা প্রসূত আত্মহত্যার কারণে উপদেশ দেয়া, ভয় দখানো ও সতর্ক করা।

কিন্তু এখানে যে ভাষণ দেয়া হয়েছিল তাতে এক একটি শিরোনামের আওতায় আলাদা আলাদাভাবে একই জায়গায় পূর্ণাঙ্গরূপে আলোচনা করার রীতি অনুসৃত হয়নি। বরং ভাষণ এগিয়ে চলেছে নদীর স্রোতের মতো মুক্ত অবাধ বেগে আর তার মাঝখানে এ শিরোনামগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ভেসে উঠেছে এবং প্রতিবারেই নতুন নতুন ভংগীতে এর ওপর আলোচনা করা হয়েছে।

বিষয়বস্তু: সূরা আল-আন’আম মক্কা মুয়াম্মায় অবতীর্ণ হয়েছে। এতে ১৬৫ টি আয়াত ও ২০টি রুকূ’ রয়েছে। এ সূরায় সার হল কয়েকটি বিষয়। যথা- একত্ববাদের প্রমাণ, প্রেরিতত্বের প্রমাণ, তাওহীদ ও রিসালাতের পােষকতার জন্য কতিপয় আম্বিয়ায়ে কেরামের ঘটনাবলী বর্ণনা, কুরআনের প্রমাণ, হাশরের দিন পুনরুত্থানের প্রাণ, এ সমস্ত বিষয়ের অবিশ্বাসকারীদের শত্রুতামূলক আচরণ ও উক্তি, সেই অবিশ্বাসীদের প্রতি শাস্তির ভীতি প্রদর্শন, সেই ভীতি প্রদর্শনসমূহের পােষকতার জন্য প্রাচীন কালের কতিপয় কাফির সম্প্রদায়ের ধ্বংস প্রাপ্তির বর্ণনা, ঐ সমস্ত অবিশ্বাসকারীদের সাথে কথােপকথন ও বিতর্ক, তাদের কুপ্রথা ও বদ-অভ্যাস সমূহের নিন্দাবাদ, এদের সাথে আচরণে মধ্যম পন্থা বজায় রাখার শিক্ষা প্রদান, যেন তাবলীগেও শৈথিল্য না হয় এবং কঠোরতা করতে গিয়ে শরিয়তের সীমাও লঙ্ঘন না হয়; মিলামিশা করতে গিয়ে তােষামদ না হয়, তাদের মন রক্ষা করতে কিংবা হিদায়েত করবার চিন্তায় অতিশয্য না হয়, তাদের মূর্খতামূলক প্রথাসমূহের মােকাবেলায় কতিপয় ইসলামিক মহান চরিত্রের বর্ণনা ইত্যাদি। এ সমস্ত কথােপকথন মুশরিকদের সাথেই হয়েছে, মাত্র দুই তিন স্থানে নবুয়ত ও কুরআনের মাসআলা কিংবা বস্তুসমূহের হালাল ও হারাম হওয়ার আলােচনার সামঞ্জস্যের দরুন প্রাসঙ্গিকভাবে আহলে কিতাব, বিশেষ করে ইহুদিদের দুষ্কৃতির আলােচনা হয়েছে।

অবতীর্ণের সময়কাল: এ সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা আল-আন’আম মক্কা মুয়ামায় একরাত্রে অবতীর্ণ হয়েছে। তখন তার চতুর্দিকে ৭০ হজার নবী ফেরেশতা ঘিরে ছিলেন এবং তারা তাসবীহ পাঠ করছিলেন।

হযরত ইবনে ওমর (রা.) এ সম্পর্কে বলেন, কারীম (সা.) বলেছেন যে, সূরা আল-আন’আম একত্রে নাজেল হয়েছে। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রা.) বলেন যে, এ সূরাটি যখন রাসূলে কারীম (সা.) -এর ওপর নাজেল হচ্ছিল, তখন তিনি একটি উষ্ট্রীর পিঠে আরােহী অবস্থায় ছিলেন; আর আমি সে উষ্ট্ৰীর লাগাম ধরে দাড়িয়ে ছিলাম।

এমতাবস্থায় সওয়ারির দুর্বহ ওজনের কারণে উস্ত্রীর অবস্থা।অত্যন্ত শােচনীয় হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তার মেরুদণ্ড এই বুঝি ভেঙ্গে যাবে। মােট কথা, এ সূরার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে চিন্তা-ভাবনা করলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সূরাটি সম্ভবত নবী কারীম (সা.) -এর মক্কী জীবনের শেষভাগে নাজেল হয়েছে।

সূরা আনআম এর ফজিলত: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন ঃ সুরা আন’ আমের। একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, কয়েকখানি আয়াত বাদে গােটা সুরাটিই একযােগে। মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সত্তর হাজার ফেরেশতা তসবীহ পাঠ করতে। করতে এ সুরার সাথে অবতরণ করেছিলেন। তফসীরবিদগণের মধ্যে মুজাহিদ, কলবী, কাতাদাহ প্রমুখও প্রায় একথাই বলেন। আবু ইসহাক ইসকেরায়িনী বলেন: এ সুরাটিতে তওহীদের সমস্ত । মূলনীতি ও পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।

এ সূরাটিকে বাক্য দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে। এতে খবর দেওয়া হয়েছে যে, সর্ববিধ প্রশংসা আল্লাহর জন্যে। এ খবরের উদ্দেশ্য মানুষকে প্রশংসা শিক্ষা দেওয়া এবং এ বিশেষ পদ্ধতির শিক্ষাদানের মধ্যে এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি কারও হামদ বা প্রশংসার মুখাপেক্ষী নন। কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, তিনি স্বীয় ওজুদ বা সত্তার পরাকাষ্ঠার দিক দিয়ে নিজেই প্রশংসনীয়। এ বাক্যের পর নভােমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং অন্ধকার ও আলাে সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে তার প্রশংসনীয় হওয়ার প্রমাণও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যে সত্তা এ হেন মহান শক্তি-সামর্থ্য ও বিজ্ঞবান বাহক, তিনিই হামদ ও প্রশংসার যােগ্য হতে পারেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © shirshobindu.com 2022