ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একের পর এক সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তে বিরক্ত দেশটির সাধারণ মানুষ। এই বাস্তবতায় নতুন বছর ২০২৪ সালে বিলেতের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য আপাতত কোনও সুখবর নেই।
অর্থনৈতিক সংকট শুধু ব্রিটেনে নয়, বিশ্বজুড়েই। করোনাভাইরাস মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। আগামী বছরে আর্থিক মন্দার ঝুঁকি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কোন ধরনের সুখকর সংবাদ নেই এমনটি মনে করছেন স্থানীয় কমিউনিটির মানুষেরা।
ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঘরের মালিকদের মাসিক মর্টগেজ পেমেন্ট অনেক বেড়ে গেছে। যারা নতুন বাড়ি কিনতে চাচ্ছেন তাদের আগের মতো কম জামানতে মর্টগেজ দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। দ্রব্যমূল্য, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ আনুষঙ্গিক বিলের লাগামহীন বৃদ্ধিতে সংকটে আছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক লাখ মানুষ ব্রিটেনে আসায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যারা আসছেন তারা সবাই লন্ডনে, বিশেষ করে বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনে থাকতে চাওয়ায় আবাসন সংকট ও বাড়ি ভাড়া বেড়েছে বহুগুণ।
ইতোমধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কোনও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় ব্রিটেনের অর্থনীতি তৃতীয় ত্রৈমাসিকে অপ্রত্যাশিতভাবে সংকুচিত হয়েছে। আগামী বছরের নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য মন্দার আশঙ্কা বেড়েছে বলে সরকারি জরিপ তথ্যে উঠে এসেছে।
ভুয়া কেয়ার কোম্পানির নামে গত দুই বছরে যারা ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ করে ব্রিটেনে এসেছেন তাদের শতকরা ৯০ জন কাজ পাননি। নতুন আসা বাংলাদেশিরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে রয়েছেন। কাজের অনুমতি নেই এমন কর্মীকে কাজ দিলে জরিমানা বাড়ানো হয়েছে।
অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকায় কাজের বৈধতা না থাকা ব্যক্তিরা কোথাও কাজ পাচ্ছেন না। ব্রিটেনের রাজনীতিতে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির যে নীতিগত দূরত্ব ছিল, এখন তা কার্যত হারিয়ে গেছে।
অভিবাসনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই দলের ইশেতেহারে এখন আর কোনও অর্থবহ পার্থক্য নেই। আসন্ন নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি পরাজিত হবে সেটি উপলব্ধি করতে পারছেন দলের নেতারা। এমন অবস্থায় তাদের এখন লক্ষ্য দুটি। কম আসন হারানোর পাশাপাশি উগ্রডানপন্থি ভোটার শ্রেণিটিকে নিজেদের বাক্সে ধরে রাখা।
ইউরোপের দেশে দেশে জনতোষণবাদী উগ্র-জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান হয়েছে। ব্রিটেনের উগ্র-ডানপন্থি অভিবাসন-বিরোধী দলগুলো চাইছে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী হতে। এই দলগুলো জনমত টানতে সমর্থ হলে ভোট ও জনমত আরও হারাবে কনজারভেটিভ পার্টি।
তাই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অভিবাসন-বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সেই উগ্র-ডানপন্থি ভোটার শ্রেণিকে সন্তুষ্ট রাখতে চাইছে ক্ষমতাসীনরা। বৈশ্বিকভাবে কঠিন এ সময়ে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশি অভিবাসীরা ব্রিটেনের বহুজাতিক সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছেন। স্বাস্থ্যসেবা খাত, হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোতে বাংলাদেশিদের অবদানের কথা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিতে নিম্ন আয়ের মানুষ, অভিবাসী কমিউনিটির স্বার্থ রক্ষার চেয়ে আসন্ন নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া নিয়ে তাগিদ বেশি। অভিবাসী ও অভিবাসন নীতি নিয়ে একের পর এক পরিবর্তনে পুরো অভিবাসী সম্প্রদায়ের মতো ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরাও বিরক্ত।
কয়েক হাজার বাংলাদেশি কেয়ার ভিসায় গত দেড় বছরে এলেও কাজ না পেয়ে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবাসন সংকট চরমে। ২০২৪ সালে তাদের জন্য আপাতত কোনও সুখবর নেই।
ব্রিটিশ সরকার জনমতের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল সেটির সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো স্পাউস ভিসার প্রস্তাবিত আয়সীমা জনদাবির মুখে কমিয়ে আনা। সরকার জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করে।
Leave a Reply