রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৬

অস্থিরতার প্রভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় সরকার

অস্থিরতার প্রভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব এবার দেশের বিদ্যুৎ খাতে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এবার বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

পাইকারির সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে তারা। দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। বিইআরসি সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি।

বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা বাড়লে বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হবে। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে অতিরিক্ত আয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। পাইকারি পর্যায়ের এ মূল্যবৃদ্ধি খুচরা পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে, মঙ্গলবার (৫ মে) নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে আনুপাতিক হারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসির কাছে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই চার্জ আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী, যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এ কারণে কম ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে মূলত ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়।

এ ছাড়া গত ৯ এপ্রিল পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

এতে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্টের চাপ তৈরি হয়ে সরকারের আর্থিক ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

২০২২ সালের শেষ দিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে সরকারের হাতে নেওয়া হয়। দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি দাম না বাড়িয়ে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয় এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা আবার বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেয়। তবে কিছু খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও তা সামগ্রিক সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট হয়নি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে রেকর্ড ৫৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, এ বিষয়ে বর্তমানে প্রাথমিক কাজ চলছে। দু-একদিন যাক, তারপর এ নিয়ে কথা বলা যাবে। আমরা পেপার ওয়ার্ক করছি। আমরা চাইবো, বিইআরসি একটি অবস্থানে আসুক, এরপর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।’

‘বিদ্যুতের দামের বিষয়ে বর্তমানে প্রাথমিক কাজ চলছে। দু-একদিন যাক, তারপর এ নিয়ে কথা বলা যাবে। আমরা পেপারওয়ার্ক করছি। আমরা চাইবো, বিইআরসি একটি অবস্থানে আসুক, এরপর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।’— পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম

অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে খাতটির অপচয় ও অনিয়ম কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, সিস্টেম লস এবং উচ্চ ব্যয়ের চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন না করে বারবার দাম বাড়ালে এর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই পড়বে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, সরকার ভর্তুকির দোহাই দিয়ে দাম বাড়াতে চায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশ বাড়তি খরচ আছে।

এসব খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানোর অজুহাত পুরোনো। দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি হলে আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো পার্থক্য থাকে না।

‘ভর্তুকির দোহাই দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশ বাড়তি খরচ আছে। এসব খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানো পুরোনো ধারা, যা স্থায়ী সমাধান নয় এবং এতে আগের ও বর্তমান সরকারের মধ্যে নীতিগত কোনো পার্থক্য থাকে না।’— ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের সংকট দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করা সম্ভব নয়। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চ ব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কাজটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি জমিয়ে রেখে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে ফেলেছে। আমি মনে করি এটা অন্যায়। তাহলেই ক্রাইসিসের সময় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হতো না, পরেও বাড়ানো যেত। আমরা যেভাবেই দেখি না কেন দাম বাড়ানোটা অপরিহার্য। ভর্তুকি দিতেই হচ্ছে। ভর্তুকির পরিমাণ আরও বড় হবে।

‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া উচিত ছিল। বিষয়টি দেরি করে এখন নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অনুচিত। তবে ভর্তুকির চাপ কমাতে দাম সমন্বয়কে এখন অপরিহার্য।’— বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন

তিনি বলেন, আমরা যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি তারাই এ ভর্তুকি ভোগ করছি। এক্ষেত্রে দেশের সব মানুষ-এর অংশীদার হচ্ছে এবং তাদের পেনাল্টি করা হচ্ছে। যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে তারা এ ভর্তুকির বেনিফিটটা বেশি পাচ্ছে। অ্যাডজাস্টমেন্ট ঠিক সময় না করলে এরকম অসুবিধা হয়ে যায়। এখন কথা হচ্ছে দাম না বাড়িয়ে কতদিন ফেলে রাখা যাবে?

একসঙ্গে দাম না বাড়িয়ে অল্প অল্প করে, ধীরে ধীরে পাঁচ বছর মেয়াদে দাম বাড়ানো যেতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার বলেছিল প্রতি তিন মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়াবে এবং তিন বছরে দাম সমন্বয় করবে। এখন বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা, খরচ ১২ টাকা। বাকিটা তো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রফেসর শামসুল আলম যথার্থই বলেন, বিদ্যুতের মধ্যে ভূত লুকিয়ে আছে। ভূত বের করতে পারলে ইউনিটপ্রতি এক টাকা সেভ করা যাবে। আমি আরেকটি কথা বলি, যারা আগে সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে এত এত পাওয়ার প্ল্যান্ট করেছে, ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে, ওখান থেকে যদি আর এক টাকা বের করতে পারি তাহলে দুই টাকা হয়ে গেলো। এতে প্রবলেমটা প্রায় অর্ধেক সলভ হয়ে যাবে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026